দীর্ঘশ্বাস

বিষধর ৩৭০টি সাপ নিয়ে বিপদে আছে দেশের একমাত্র ভেনম রিসার্চ সেন্টার। সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরির এ গবেষণা কেন্দ্রটি অর্থের অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে। একসঙ্গে এতগুলো সাপ মেরে ফেলাও বেআইনি। তাই গবেষকদের কাছে একটি পথই খোলা আছে— মারাত্মক বিষধর সাপগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া। তবে সেটি নাকি মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
ছোট্ট দুটি প্রশ্ন আছে এ মুহূর্তে।
প্রথম প্রশ্ন, আমাদের দেশে কতটুকু প্রকৃতি আছে? আর সে প্রকৃতি ছেড়ে সাপগুলো যদি লোকালয়ে এসে পড়ে, তাহলে মানুষ মারা পড়বে? না সাপগুলোই মারা পড়বে? স্রষ্টার সৃষ্টির মধ্যে এ জগতে কারা সবচেয়ে বিষধর এখন, এই সময়ে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাপ না হয়ে যদি ওগুলো হরিণ অথবা ছাগল কিংবা গরু-ভেড়া হতো?
একটা একটা করে উধাও হয়ে যেত, একটু একটু করে। চুরি হয়ে গেছে, মারা গেছে কিংবা সন্ত্রাসীরা কেড়ে নিয়ে গেছে বলে প্রচারণা চালানো হতো অবলীলায়। কিন্তু একটু পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যেত— ওসব পশুর মাংসের স্তূপ জমাট বেঁধে আছে গবেষক কর্মকর্তাদের বাসার ফ্রিজে। তার আগে কিছু মাংস যেত স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বাসায়, থানার উচ্চপদস্থ স্যারের বাসায়, কিছুটা শালি, ভায়রা অথবা শ্বশুরের বাসায়!
মারামারি করল সাত বছর আর পাঁচ বছরের দুই শিশু— বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটের ছেলেমেয়ে। পিকনিক করছিল দুই পরিবার। খেলাধুলা করতে করতে একপর্যায়ে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে তারা। পরক্ষণে মীমাংসাও করে ফেলে উভয় শিশুর মা। কিন্তু পরদিন সকালে বাড়িওয়ালার ছেলেটাকে জোর করে নিজের রুমে নিয়ে যান মেয়েটার বাবা। তারপর ধারালো বঁটি দিয়ে তার শাহাদাত আঙুলটি কেটে ফেলেন তিনি।
জানেন— মেয়েটার বাবা কে?
পুলিশ; নাটোর সদর থানার একজন কনস্টেবল, নাম শাকিল।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়নের রাজাদিয়া অভয় পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির দুজন শিক্ষার্থী— আতিকুর আর হাবিব। ঝগড়া হয় তাদের মধ্যে। মীমাংসাও করে দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
সকাল সোয়া ১০টার দিকে আতিকুরের ফুপাতো ভাই নাহিদ শেখ ক্লাসে প্রবেশ করেন। হাবিবকে বেঞ্চ থেকে তুলে এনে ঘাড় ধরে মারধর করেন এবং আছাড় দেন কয়েকবার।
পৃথিবীতে এখন বড় বড় দেশ যুদ্ধ করে না সরাসরি। যুদ্ধ করে ছোট ছোট দেশ। নাক গলায় বড় দেশগুলো। এসব দেখতে দেখতে আমাদের শিশুদের অভিভাবকরা একেকজন ট্রাম্প হয়ে ওঠেন, একেকজন পুতিন!
খারাপ না।
শুনতে অবাকই লাগে— আমেরিকার ৫০ অঙ্গরাজ্যের ৩২টিতেই বাল্যবিয়ে বৈধ এখনো! স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা চাইলেই বিয়ে করতে পারবেন যে কেউ। কোনো আইনি বাধা নেই। অথচ নারীবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার, নারীনেতৃত্ব, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী অধিকার ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর নাকি এই আমেরিকা!
আমেরিকাকে আমরা অনেকেই কমবেশি ঘৃণা করি; কিন্তু আমেরিকার মুভি পছন্দ করি, চকলেট পছন্দ করি, বেড়াতে যেতে পছন্দ করি; গোপন ও বলতে দ্বিধাগ্রস্ত কথা হচ্ছে— আমেরিকায় আমরা স্থায়ীভাবে থাকতে পছন্দ করি। সেই আমেরিকাকে আমরা অনুসরণ করব না, তা কি হয়?
পঞ্চগড় জেলার মুসলিম নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার সমিতির সদস্যরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে, প্রধানমন্ত্রী বরাবর। তারা আট দফা দাবি জানিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছর আর ছেলেদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা তারা কেন চাচ্ছেন? দেশে কি বিয়ে-শাদি কমে গেছে? ফলে কামাই-কাজিও কমে গেছে তাদের? ১৮ বছরে একটা ছেলে তো তার শিক্ষাজীবনই শেষ করতে পারবে না, নিজে খাবে কী, বউকে খাওয়াবে কী? গুণিজনরা বলেন— যেকোনো কাজ শুরু করতে হয় আগে নিজেদের দিয়ে। তাই পঞ্চগড়ের নিকাহ-তালাক রেজিস্ট্রার সমিতির সদস্যরা যদি নিজেদের ছেলেদের ১৮ বছরে বিয়ে দিতেন, তাহলে জাতি একটা যথাযথ পথনির্দেশনা পেত!
রুমা রোকসানা ১৯৭৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ৭৭ সালে হলি ক্রস থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সেখানে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন।
কী চমৎকার একটা শিক্ষা সফর, কী নিদারুণ এক উচ্চপদস্থ হওয়ার যোগ্যতা! তারপর কেটে গেছে অতিপরিচিত সব ঘটনা, যা আমাদের চেনা, সবাই জানি আমরা। বলাবাহুল্য, বলা হচ্ছে না তাই।
সবশেষে রুমা রোকসানা এখন বৃদ্ধাশ্রমে, বরিশাল নগরীর কাউনিয়ার এক বৃদ্ধাশ্রমে! ‘শিক্ষিত সমাজেই আমি বড় হয়েছি। শিক্ষিত সমাজ থেকে এই বৃদ্ধাশ্রমে আমি ভালো আছি, এরা খাবার, ওষুধ— সবকিছু দেয়। এখন মৃত্যুর চিন্তা করি। কবে মৃত্যু হবে।’ রুমা রোকসানার চোখে জল নেই, নেই কোনো আক্ষেপ। বোঝা গেল— এখন বোঝাপড়া শুধু তার স্রষ্টার সঙ্গে, মৃত্যুর পর। এখন এই অপেক্ষা তার, এই বেদনার প্রহর।
মিশন আচার্য শেষ পর্যন্ত চাকরিটা পেতে যাচ্ছেন!
বাসাবাড়িতে গৃহসহকারীর কাজ করে মা ময়না আচার্য লেখাপড়া শিখিয়েছেন ছেলেকে। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদের জন্য পরীক্ষা দেন, নির্বাচিতও হন। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানায় কোনো বাড়ি না থাকায় আটকে যায় তার নিয়োগপত্র। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানের কল্যাণে নিয়োগপত্র পাচ্ছেন মিশন।
‘পরিবারের হাল ধরতে এ চাকরিটা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ আশা আর স্বপ্নপূরণের ভাবালুতায় কথাটা বললেন মিশন আচার্য।
১৪ কোটি টাকা খরচ করে একটা সেতু বানানো হয়েছে জামালপুরের হাটচন্দ্রার মিয়াবাজার এলাকায়। কিন্তু তার আশপাশে কোনো সড়ক নেই, নেই তেমন কোনো জনবসতি। কিন্তু বেশ আনন্দিত বানু বেগম। মাথার ঘোমটাটা আরও একটু টেনে নিয়ে ধান শুকাতে শুকাতে তিনি বললেন, ‘রোদে ধান শুকানোর জন্য এই সেতুটি খুব কাজে লাগছে আমাদের!’
জামালপুরের হাটচন্দ্রার বানু বেগমের মতোই আমরাও আনন্দিত। সরকার আসে সরকার যায়, দুর্নীতি কমে না, চিকিৎসা পায় না মানুষ, খাবারে ভেজাল থাকে যথারীতি, সম্পদের পাহাড় হয় একেকটা শ্রেণির। সবকিছু দেখি আমরা, মেনেও নেই অপারগতায়, তারপর নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে বলি, ‘যাক, বেঁচে তো আছি। এসব দেখার জন্য এই বেঁচে থাকাটা খুব কাজে লাগছে আমাদের!



