মনোবল ভেঙে পড়া বিলিয়নিয়ারদের পাশে কি রাষ্ট্র দাঁড়াবে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চ্যাটজিপিটির মতে, বিলিয়নিয়ার হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যার মোট সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে)। গুগল সার্চ ইঞ্জিনে বাংলাদেশের মাত্র চারজন বিলিয়নিয়ারের নাম মিললেও, বাস্তবে এ সংখ্যা বহুগুণ বেশি। বাংলাদেশে তাদের সম্পদের বড় অংশ বেসরকারিভাবে রাখা হয় বলে, তাদের ‘শ্যাডো বিলিয়নিয়ার’ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশে এখন বিলিয়নিয়ারের প্রকৃত সংখ্যা সার্চ ইঞ্জিনের দেওয়া তথ্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হবে।
কীভাবে তারা এত টাকার বা অর্থের মালিক হলেন? খাত বিবেচনায়— বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রিয়েল এস্টেট, সিমেন্ট, ওষুধ, টেক্সটাইল, ব্যাংকিং, স্টিল, শিপিং, ভোগ্যপণ্য, গার্মেন্টস, খাদ্য ও জনশক্তি এরকম বহুমুখী ও বহুমাত্রিক ব্যবসায় যুক্ত থেকেই তারা এ অবস্থানে। শুধু কি টাকা কামানোর আকাঙ্ক্ষা তাদের এমন অবস্থানে নিয়ে এলো? এর অনেক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে বাড়াতে এমন এক আস্থার জায়গায় পৌঁছান, তখন নতুন শিল্প করার নেশা চেপে বসে তাদের মধ্যে। আবার একমুখী ব্যবসার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতেও নতুন উইন্ডো খুলতে বাধ্য হন। এর সহজ-সরল পরিণাম দেশে ‘বেকারের কর্মসংস্থান’।
কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মনোজগতে এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালে আগস্ট থেকে এ প্রবণতা দৃশ্যমান। সেটি চলে প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত। অভিযোগ উঠেছে, এ সময়ে শিল্পোদ্যোক্তারা বিভিন্ন ফরম্যাটে হয়রানির শিকার হয়েছেন; দেওয়া হয়েছে মানসিক যন্ত্রণা, পরানো হয়েছে ভিত্তিহীন গণমামলার মালা। ‘করপোরেট হিসাব’ তদন্তের নামে অপদস্থ করা বা বিমানে উঠে যাওয়ার পর নামিয়ে আনার ঘটনাও ঘটেছে।
ক্ষোভ ও অসন্তোষ থাকলেও ভয়ে তারা প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। আড়ালে উঠে আসছে মনোবল ভেঙে পড়ার বেদনাদায়ক কাহিনি। এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বললেন, ‘মনোবল ভেঙে পড়ার কোনো মূল্য নেই। এ দেশে ব্যবসা করে ইজ্জত পাওয়া যায় না।’ আরেকজন বলেছেন, ‘কিছু না করলেই মনে হয় ভালো থাকা যায়। কিন্তু যারা অনিয়ম করে টাকা কামিয়েছে তারা এখন বিদেশে আরামেই আছে।’
এ দুজনের ব্যবসার পরিধি বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা। শুধু সরকারকেই ভ্যাট-ট্যাক্স দেন দুই হাজার কোটি টাকার কমবেশি। তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা ৫০ হাজারের ওপর। এরকম উচ্চমানের শিল্পোদ্যোক্তাদের মনের ক্ষোভ যখন এ পর্যায়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে— তাদের জ্বালা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছাবে তো?
একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন ব্যবসায়ী নেতার এমন মন্তব্যে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য কতটা তৎপর। তাহলে কি ধরে নেব, শিল্পোদ্যোক্তা বিলিয়নিয়ারদের মনের কষ্ট বুঝতে পেরেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা?
ব্যবসায়ীদের সুনাম যেমন আছে, তেমনই সমালোচনাও কম নয়। পরিবেশ দূষণ, ব্যাংক দখল, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি ও টাকা পাচারের মতো অনিয়ম জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। রাজনৈতিক চাপে বা সুবিধা পেতে দলীয় আনুগত্যের ঘটনাও সমাজ-রাষ্ট্রে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। তবে এসব সুবিধালোভী ব্যবসায়ী সংখ্যায় কম। সরকারের তদারকির অভাবে সেবা পেতে গিয়ে পদে পদে ‘স্পিডমানি’ বা ‘গ্রিস পেমেন্ট’ দিতে বাধ্য হন তারা। বিদ্যুতের লাইন টানতে, গ্যাসের সংযোগ আনতে, পানি পেতে, লাইসেন্স নবায়ন করতে, পণ্য ছাড় করানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কাজের পদে পদেই চলে এ স্পিডমানির খেলা। কিছু ব্যবসায়ী, কিছু সরকারি কর্মকর্তার দুষ্ট-দুর্নীতির চক্র এটি। এর সঙ্গে সৎ ব্যবসায়ীদের মিলিয়ে গোল পাকানো যাবে না।
সুসংবাদ হলো, নীতিনির্ধারকদের মনোভাব বদলাচ্ছে। সরকারের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, উদ্যোক্তারা যেন বাড়তি ঝামেলায় না পড়েন এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ আন্তরিক। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তির এ বক্তব্য অর্থনীতির নায়কদের অর্থাৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার একটি সক্রিয় ও গতিশীল উদ্যোগের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ আমিরুল হক জানালেন, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বসছেন এবং মন্ত্রীরাও সরাসরি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। মোহাম্মদ আমিরুল বলেছেন, “কোথায় কোন সংকট সেটি চিহ্নিত ও সমাধান করতে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই চার-পাঁচটি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সঙ্গে বসে কথা বলছেন। পাঁচ-ছয়জন মন্ত্রী প্রায় প্রতিদিনই আমাদের স্বেচ্ছায় জিজ্ঞাসা করছেন, ‘কী করতে হবে, কোন ধরনের সহযোগিতা দরকার আপনাদের।’ লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানোর জন্য এটি একটি বড় মেসেজ।”
একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন ব্যবসায়ী নেতার এমন মন্তব্যে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য কতটা তৎপর। তাহলে কি ধরে নেব, শিল্পোদ্যোক্তা বিলিয়নিয়ারদের মনের কষ্ট বুঝতে পেরেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা?
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন মডেল কেমন হবে, অর্থনীতির কোন সূচকে নিজেদের উন্নীত করবে সেই রোডম্যাপ আমাদের জেনে রাখা দরকার। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় বার্ষিক ৩ হাজার মার্কিন ডলার। দক্ষিণ কোরিয়া ছোট্ট দেশ। আয়তন ৩৯ হাজার বর্গমাইল। জনসংখ্যা ৫ কোটি ১৬ লাখ। গড় আয় ৩৯ হাজার মার্কিন ডলার। ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া তিনটি সাগর পরিবেষ্টিত। আর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরে। ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থানে। আমাদের কেন্দ্র করে চীন ও ভারতের মতো অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশের ব্যাপক আগ্রহ। প্রভাব বিস্তার করতে চায় বিশ্বের সুপারপাওয়ার আমেরিকাও।
দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু তথ্যে বোঝা যাচ্ছে তারা কতটা ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে তার শিল্পোদ্যোক্তাদের মনে। যোগ্য ব্যবসায়ীদের সাত বছর পর্যন্ত কর ছাড়ের সুযোগ দিয়ে থাকে তারা। গবেষণা, উন্নয়ন ও কর্মী নিয়োগের জন্য আর্থিক অনুদান দেয় সরকার। দ্রুত কাস্টমস ও প্রশাসনিক কাজের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা পায় তারা।
স্যামসাং, হুন্দাই বা এলজির মতো বিশ্ববিখ্যাত করপোরেট গ্রুপগুলো কম সুদে ঋণ ও রাষ্ট্রীয় বড় প্রজেক্টে অগ্রাধিকার পায়। সরকার ও ব্যাংকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই গ্রুপগুলো সহজে বিশাল মূলধন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। করপোরেট গ্রুপগুলো বৈশ্বিক মন্দা বা অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে সরকার এদের টিকিয়ে রাখতে বিশেষ উদ্ধার তহবিল বা বেইলআউট সুবিধা দেয়।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান আমলের ড. মাহবুব উল হকের ‘২২ পরিবার’ তত্ত্বের কথা মনে করা যায়, যা দেশের ৬৬ শতাংশ শিল্পসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করত। তবে সেই সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছিল প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানে। আশার কথা হলো, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর অবহেলিত এই বাংলাদেশে নিজস্ব মেধা ও শ্রমে গড়ে উঠেছে অন্তত ২২টি বিলিয়নিয়ার পরিবার।
আমাদের অর্থনীতির ভিত তৈরি করা এ ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মনোবল ভাঙার মতো ঘটনা খুবই দুঃখ ও হতাশার। তারা কেন অকারণে অবহেলায় মনোবেদনা নিয়ে শিল্প গড়বেন? কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন? করবেন এ কারণে— বিত্তের সঙ্গে দরকার চিত্তের সুসমন্বয়। চিত্ত বা মন হলো মানবতা। দেশ-অর্থনীতির স্বার্থে এ জায়গাটায় এখন দূরদর্শী সৃজনশীল অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। দেশকে এগিয়ে নিতে নিশ্চয়ই রাষ্ট্র মনোযোগী হবে। রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হয়ে প্রিয় বিলিয়নিয়ারদের শান্তিতে ব্যবসা করার পরিবেশ ও নতুন দিগন্ত তৈরি করে দিতে হবে।
লেখক: জয়েন্ট এডিটর, আগামীর সময়





