পে স্কেলের নানান মাত্রা

মন্ত্রিসভায় নবম পে স্কেলের অনুমোদন সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সুবাতাস বয়ে আনলেও সাধারণ মানুষের মনে সৃষ্টি করেছে গভীর উদ্বেগ। বেতন কমিশনের সুপারিশ ও সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয়ের সংস্থান করা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এত বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে, সরকার নতুন করে টাকা ছাপাবে নাকি? টাকা ছাপালে তো নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। আবার কেউ বলছেন, ২৩ লাখ মানুষের (চাকরিরত ও অবসরভোগীসহ) সুবিধা হলেও বাকি ১৮ কোটির কী হবে।
আমাদের দেশে মোট শ্রমশক্তির অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত। দেশের বিশাল জনসংখ্যা বেসরকারি চাকরি, অনানুষ্ঠানিক খাত, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাজারে যখন সরকারি পে স্কেল ঘোষণার অজুহাতে কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ে, তখন এই ২৩ লাখের বাইরে থাকা ১৮ কোটি সাধারণ মানুষ ও সীমিত আয়ের গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক, ক্ষেতমজুর কিংবা বেসরকারি সাধারণ কর্মচারীদের আয় রাতারাতি বাড়ে না অথচ তাদের বাজার করতে হয় একই মূল্যে।
একটি বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবসম্মত পে স্কেল যেমন সরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও কর্মস্পৃহা বাড়াতে পারে, তেমনই সরকারের দায়িত্ব হলো এর পরোক্ষ অভিঘাতে যেন কোটি কোটি সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ পিষ্ট না হয়
আধুনিক পে স্কেলের ধারণা মূলত শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমের মূল্য ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার তাগিদ থেকে শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে (১৯৭৭, ১৯৮৫, ১৯৯১, ১৯৯৭, ২০০৫, ২০০৯ এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে) আটটি পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বিগত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজার পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। একটি বিজ্ঞানসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ পে স্কেল গঠনের জন্য কয়েকটি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করা জরুরি:
১. মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় (CPI): চাল, ডাল, তেল, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার সমসাময়িক বাজারদর পর্যালোচনা করে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা।
২. পারিবারিক আকার: চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের পুষ্টি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের ন্যূনতম খরচকে স্কেলের ভিত্তি হিসাবে ধরা।
৩. স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় (Auto-Indexation): প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন কিছুটা সমন্বয়ের স্থায়ী বিধান রাখা, যাতে দীর্ঘকাল নতুন পে স্কেলের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়।
৪. দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন: শুধু চাকরির বয়স নয়, কাজের মান ও যোগ্যতার যথার্থ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
আমাদের দেশের নির্মম সত্য হলো, নতুন পে স্কেলের খবর ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে একশ্রেণির অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ও বাসা ভাড়া এমনভাবে বাড়ানো হয় যে, বর্ধিত বেতনের অর্থ সরকারি কর্মচারীদের হাতে পৌঁছানোর আগেই বাজার তা গ্রাস করে নেয়। অন্যদিকে, এই কৃত্রিম মূল্যস্ফীতির কারণে যারা দারিদ্র্যসীমার ঠিক একটু ওপরে বসবাস করছিলেন, তারা নতুন করে দারিদ্র্যের অতলগহ্বরে তলিয়ে যান।
একজন সাধারণ পোশাক শ্রমিক বা দিনমজুরের আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় শুধু খাদ্য ক্রয়ের পেছনে। পে স্কেল-পরবর্তী সময়ে যদি চাল-ডালের দাম ও বাসা ভাড়া ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, আর ওই শ্রমিকের আয় যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে তাকে বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ ছাঁটাই করতে হয়। ফলে সমাজে বৈষম্য আরও বাড়ে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের রাষ্ট্রীয় অর্জন থমকে দাঁড়ায়।
একটি সুষম অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রকে শুধু বেতন বাড়ানো নয়; বরং বেতনের ‘প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা’ সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য জরুরি:
ক. কঠোর বাজার মনিটরিং ও আইনি ব্যবস্থা: পে স্কেল ঘোষণার আগে ও পরে নিত্যপণ্যের বাজার ও বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
খ. সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার: সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ওএমএস (OMS) ও টিসিবির (TCB) মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা।
গ. বেসরকারি খাতের মজুরি সমন্বয়: সরকারি পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি খাতের জন্য ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নিয়মিত হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
ঘ. পরোক্ষ সুবিধা ও ভর্তুকি বৃদ্ধি: নগদ অর্থ সরবরাহের চাপ কমাতে চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি বা ভাউচার সিস্টেম চালু করা।
পে স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর কোনো বিচ্ছিন্ন দলিল নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল নিয়ামক। একটি বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবসম্মত পে স্কেল যেমন সরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও কর্মস্পৃহা বাড়াতে পারে, তেমনই সরকারের দায়িত্ব হলো এর পরোক্ষ অভিঘাতে যেন কোটি কোটি সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ পিষ্ট না হয়। ন্যায্য মজুরি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য, মেধার স্বীকৃতি এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হোক একটি জনবান্ধব পে স্কেলের মূল দর্শন।
লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার



