শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

শিক্ষা যদি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল ভিত্তি হয়, তবে এই ব্যবস্থার প্রাণশক্তি হলেন শিক্ষক। একটি শিশুর চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা যতটা গুরুত্ব পায়, শিক্ষকদের কর্মপরিবেশের বিষয়টি ততটাই উপেক্ষিত থেকে যায়। একজন শিক্ষক প্রতিদিন যে পরিবেশে পাঠদান ও মূল্যায়ন করেন, তা যদি নিরাপদ ও পেশাবান্ধব না হয়, তবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষকদের কর্মপরিবেশের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন পক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও চাপ। পরিচালনা কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে। অনেক সময় জবাবদিহির নামে শিক্ষকদের ওপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষাঙ্গনের মুক্তচিন্তাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। নিয়োগ, পদায়ন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তাবোধ তৈরি করে। এর ফলে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়ার নেতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, ছাত্র সংগঠন বা কোনো ছাত্রগোষ্ঠীর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপও শিক্ষক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। পেশাগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য শিক্ষককে হেয় করা বা চাপ প্রয়োগের ঘটনা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর্মচাপ শিক্ষকদের মূল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পাঠদান ছাড়াও দাপ্তরিক কাগজপত্র, সভা এবং নানা অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে শিক্ষক পাঠপ্রস্তুতি ও গবেষণার পর্যাপ্ত সময় পান না, যা শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু নতুন ভবন বা আধুনিক পাঠ্যক্রম দিয়ে সম্ভব নয়। শিক্ষার কেন্দ্রে থাকা শিক্ষককে একটি সম্মানজনক, নিরাপদ ও চাপমুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। পরিচালনা কমিটির অযাচিত হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ছাত্র সংগঠনের অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ বন্ধ করে শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষককে ফুল দিয়ে সম্মান জানানোর চেয়ে তার পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম



