শুধু ভালো ফল নয় মানুষও তৈরি করতে হবে

একটি বিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব কেবল কতজন জিপিএ ৫ পেল, কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো— এ হিসাবের মধ্যেই আটকে থাকতে পারে না। আর শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিক্ষিত হলো, সেটি শুধু তার মার্কশিটে দৃশ্যমান হয় না; দৃশ্যমান হয় মানুষের সঙ্গে তার আচরণে, মূল্যবোধে, বিবেকবোধে এবং দায়িত্বশীলতায়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করলে চলবে না, তৈরি করতে হবে মানুষ। শুধু ভালো ফল নয়, শেখাবে ভালো হওয়ার পথ।
একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করল। কিন্তু সে যদি বড়দের সম্মান করতে না শেখে, ছোটদের ভালোবাসতে না শেখে, অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, অন্যায় দেখেও নীরব থাকে কিংবা নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না হয়, তাহলে তার শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। শিক্ষা যদি মানুষের ভেতরে মানবিকতা সৃষ্টি না করে, যদি বিবেককে জাগ্রত না করে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা সফল— আমাদের ভাবতে হবে।
আজ অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানের ভালো ফল সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। সন্তান কত নম্বর পেল, কোন গ্রেড পেল, কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলো— এসব অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়; কিন্তু সে কেমন মানুষ হচ্ছে, তার মধ্যে সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ কতটা তৈরি হচ্ছে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। কারণ, জীবনের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র থাকে না, মার্কশিটও পাওয়া যায় না; সেখানে মানুষের প্রকৃত শিক্ষাই তাকে পথ দেখায়।
শিক্ষকের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তার কথা, আচরণ, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্বও শিক্ষার্থীর মনে গভীর ছাপ ফেলে। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক কখনো এমন প্রেষণা তৈরি করতে
পারেন, যা একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে। তাই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষকতার পেশায় দায়িত্বশীলতা, সততা ও নিষ্ঠাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমাদের এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার, যেখানে ভালো ফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা থাকবে
শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনের সব দায়িত্ব শিক্ষকের একার নয়। পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং সমাজ— সবকিছুরই সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে। সন্তানকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। অভিভাবককে যেমন সন্তানের পাশে থাকতে হবে, তেমনি তার ভুল-ত্রুটি যুক্তিসংগতভাবে সংশোধনের সুযোগও দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হওয়া উচিত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক আস্থার। শিক্ষক ভুল করলে তার প্রতিকার ও জবাবদিহির যথাযথ ব্যবস্থা থাকবে। শিক্ষার্থী ভুল করলেও তাকে অপমান বা দমন নয়, সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। কোনো পক্ষের প্রতি অসম্মান, অপমান কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা কখনোই সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারে না।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষা আর পড়াশোনা নিয়ে পড়ে থাকলেই চলবে না; সেখানে সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেরও সুযোগ থাকতে হবে। কারণ বইয়ের বাইরে যে বিশাল জীবন, তার সঙ্গেও শিক্ষার্থীকে পরিচিত করিয়ে দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শেখে, অন্যের মতকে সম্মান করতে শেখে, পরাজয় মেনে নিতে শেখে কিংবা বিপদে অন্যের পাশে দাঁড়ায়— তখনই তার প্রকৃত শিক্ষার বিকাশ ঘটে।
একটি বিদ্যালয়ের ভবন, তার সুবিশাল আঙিনা, চেয়ার-টেবিল কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বড় করে না। বড় করে তার শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের আদর্শ, শিক্ষার্থীদের আচরণ এবং প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কর্ম ও মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশের ওপর।
তাই শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার, যেখানে ভালো ফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা থাকবে; যেখানে বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে থাকবে জীবনবোধ, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা। যেখানে শিক্ষার্থী শুধু ‘কীভাবে সফল হতে হয়’ তা নয়; ‘কীভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয়’, সেটিও শিখবে।
শিক্ষার আসল সার্থকতা ভালো ফলে নয়,
ভালো মানুষ তৈরিতে। তাই
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফল তৈরির কারখানা না হয়ে মানুষ গড়ার কারখানা হয়ে উঠুক—
এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: শিক্ষক নারায়ণগঞ্জ



