শিশুরা হারানোর আগে আমরা কোথায় ছিলাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমরা অনেকে মিলে ভ্রমণে বেরিয়েছি। সঙ্গে নানা বয়সের শিশু।
‘মামণি, তোমার নাম কী?’
‘ধরিত্রী।’
জীবনের বহু পর্ব পার করে আসা সালমা আপা ধরিত্রীকে কাছে টেনে বললেন, ‘মামণি, তুমি এই যে সবার খোঁজ নিচ্ছ, এটা খুব ভালো করছ।’ একটু পরেই আমাকে বললেন, ‘পর্দার বাইরে তো শিশুদের আজকাল পাওয়াই যায় না।’ কথাটা ঠিক এবং অসম্পূর্ণও; পরিস্থিতি এতটা সরল নয়।
তবুও কথাটা শুনে ভালো লাগল। একজন প্রবীণ মানুষ একটি শিশুর মধ্যে এমন একটি গুণ দেখলেন, যার কোনো সনদ নেই— অন্য মানুষের খোঁজ নেওয়া। তারপরই গভীর এক বিষণ্নতা এসে বসে রইল।
অপ্রতিমকে নিয়ে এমন কথা আমরা কি আর কখনো শুনব? কেউ কি তাকে বলবে, ‘বাবা, তুমি খুব সুন্দর ছবি তোল?’ রামিসা, মাহিদা, কলি— আরও কত নাম। তালিকা বানিয়ে এই শিশুদের অসমাপ্ত জীবনকে সংখ্যায় নামাতে চাই না।
একটি শিশু মারা গেলে শুধু তার বর্তমান শেষ হয় না; তার সঙ্গে মারা যায় অসংখ্য সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। আর আমাদের এখানে শিশুরা দুবার হত্যার শিকার হয়। প্রথমবার তার শরীর আক্রান্ত হয়; দ্বিতীয়বার তার মৃত্যু ঢুকে পড়ে আমাদের রাজনৈতিক হিসাব, নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব আর কয়েক দিনের উত্তেজনার ভেতর। কে বেশি কাঁদল, কে আগে কাঁদেনি, কার সময়ে কতজন মরেছিল— শিশুটির মৃতদেহের চারপাশে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের হিসাব মেলাই।
শিশুটি তখন কোথায়? আমাদের দায়িত্ব এড়ানোর কৃষ্ণগহ্বরেই তো। আমাদের সিলেকটিভ বিস্মৃতিতে।
ভয় শুধু শিশু হত্যার সংখ্যা নিয়ে নয়; ভয় হচ্ছে, আমরা কি এমন এক সামাজিক মহামারীর মধ্যে ঢুকে পড়ছি, যেখানে একের পর এক শিশু আক্রান্ত হবে, আমরা কয়েক দিন স্তম্ভিত হব, তারপর নতুন ঘটনায় চলে যাব? শিশুর মৃত্যু সংবাদ শিরোনাম হবে; কিন্তু শিশুটি কীভাবে বেঁচে থাকতে পারত— সেই প্রশ্নটি কি কখনো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসবে?
অথচ মৃত্যুর অনেক আগে প্রায়ই একটি ছোট মুহূর্ত আসে।
একটি শিশু বাড়ি ফিরে বলে, ‘আমি আর সেখানে যাব না।’
সেটি স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং, আত্মীয়ের বাড়ি, কর্মস্থল কিংবা খেলার জায়গা হতে পারে। শিশুটি হয়তো পুরো ঘটনাই বলতে পারে না। শুধু বলে— আর যাব না।
আমরা তখন কী করি? তার পাশে বসে জানতে চাই— কেন? কেউ মেরেছে? অপমান করেছে? ভয় দেখিয়েছে? এমনভাবে স্পর্শ করেছে, যাতে অস্বস্তি হয়েছে? নাকি বলি— ‘স্যার একটু মেরেছে তো কী হয়েছে?’, ‘হুজুর শাসন করেছেন’, ‘ছেলে মানুষ, এত নরম হলে চলবে?’
ঘোষণায় শিশু নিরাপদ হয় না। এক বছর পরে জানতে হবে— কমিটিগুলো কাজ করছে কি না, শিশুরা অভিযোগ করতে পারছে কি না, ক্ষমতাবান অভিযুক্ত হলে কী হচ্ছে। শিক্ষার দর্শন আলাদা হতে পারে, শিশুর নিরাপত্তার ন্যূনতম মান আলাদা হতে পারে না
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশের শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে; ৫ থেকে ১৭ বছরের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। সহিংস নিয়ন্ত্রণ তাই বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়; তার শিকড় পরিবার, শিক্ষা ও কর্তৃত্বের ধারণায়।
আমরা মেয়েশিশুকে ভালো স্পর্শ-মন্দ স্পর্শ বোঝাতে শিখছি। কিন্তু ছেলেশিশুকে কি বলছি— তোমার শরীরও তোমার? তুমি ভয় পেলে বলতে পারো, কাঁদতে পারো, সাহায্য চাইতে পারো? ‘ছেলে মানুষ’— এ দুটি শব্দ দিয়ে কত শিশুর কান্না আমরা বন্ধ করে দিয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই।
দারিদ্র্য এই নীরবতাকে আরও গভীর করে। যে শিশুটি কাজ না করলে পরিবারের আয় কমে যাবে, যার মা-বাবার সামনে বিকল্প কম— তার ‘আমি আর যাব না’ বলার মূল্য অনেক বেশি। শিশু-সুরক্ষা তাই শুধু মা-বাবার দায়িত্ব নয়; এটি শ্রেণি, শ্রম, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন।
মাদ্রাসা নিয়েও কথা বলা দরকার; তবে প্রতিষ্ঠানটিকে শত্রু বানিয়ে নয়, তার ভেতরের শিশুটিকে কেন্দ্রে রেখে। সাম্প্রতিক অভিযোগের পর আল-হাইআতুল উলয়া শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করেছে, শিক্ষার্থী-সুরক্ষা কমিটিও দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘোষণায় শিশু নিরাপদ হয় না। এক বছর পরে জানতে হবে— কমিটিগুলো কাজ করছে কি না, শিশুরা অভিযোগ করতে পারছে কি না, ক্ষমতাবান অভিযুক্ত হলে কী হচ্ছে। শিক্ষার দর্শন আলাদা হতে পারে, শিশুর নিরাপত্তার ন্যূনতম মান আলাদা হতে পারে না।
রাজনীতির জায়গায় এসে বিষয়টি আরও কঠিন। শিশু রাজনৈতিক পৃথিবীর বাইরে নয়। তার মত থাকতে পারে, প্রতিবাদ থাকতে পারে। কিন্তু তাকে রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকার করা আর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা এক নয়। সে যখন মিছিলে একটি শরীর, জনসভায় একটি সংখ্যা, স্লোগানে একটি কণ্ঠ, আহত হলে প্রমাণ, মারা গেলে প্রতীক— তখন তার নিজের কণ্ঠ নয়, বড়দের প্রয়োজনই প্রধান হয়ে ওঠে। এই নৃশংসতায় শিশুদের ব্যবহারের বিষয়ে বড়দের আগে ঠিক করতে হবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে এই প্রশ্ন থেকেও পড়া দরকার। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিল, বহু মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সেখানে এসেছিল; তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া একজন ছিল ১২ বছরের। কিন্তু মোট কত শিশু ছিল, কতজন আহত হয়েছিল, পরে তাদের কী হয়েছিল— এই শিশুভিত্তিক ইতিহাস আমাদের সামনে নেই। এই না-জানাটিও ইতিহাসের অংশ।
আমরা জিজ্ঞেস করেছি— কে জিতল, কে হারল, কতজন মরল। কিন্তু কতজন শিশু ছিল?
শিশুর শরীর প্রাপ্তবয়স্কদের রাজনীতির ব্যবহারযোগ্য জনবল হতে পারে না। এ কারণেই ‘আমাদের শিশু’ কথাটি উদ্ধার করা দরকার। মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম, বস্তি, কারখানা— সব শিশুই আমাদের। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সন্তানও আমাদের। মেয়েশিশু, ছেলেশিশু— যার মৃত্যু নিয়ে কোনো আলোড়ন হবে না, সেও আমাদের।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব এখানেই বিরাট। বাংলাদেশের ছয়টি জাতীয় দৈনিকের ২ হাজার ৯৫৭টি শিশু নির্যাতনবিষয়ক প্রতিবেদন নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ সংবাদ ঘটনাকেন্দ্রিক; সমাজব্যাপী সমাধানের দিকটি ছিল মাত্র ১৮ শতাংশে। আমরা ঘটনা বলি, ব্যবস্থার গল্প বলি কম।
আমাদের দরকার ৩৬৫ দিনের শিশু সাংবাদিকতা। প্রথম দিন অপরাধের খবর হবে। সাত দিন পরে জানতে হবে, প্রতিষ্ঠান কী করল। এক মাস পরে প্রতিশ্রুত পরিবর্তন হলো কি না। ছয় মাস পরে পরিবারটির কী হলো। এক বছর পরে ফিরে গিয়ে জানতে হবে— বাকি শিশুগুলো কি এখন নিরাপদ? প্রতিটি ক্ষেত্রে শিশুকে কেন্দ্র করে পুরো গণমাধ্যম সাজাতে হবে।
আমাদের শুধু ঘটনার পরের রাষ্ট্র দরকার নয়। দরকার ঘটনার আগের রাষ্ট্র; ঘটনার আগের গণমাধ্যমও। যে রাষ্ট্রে একটি শিশু ‘আমি আর সেখানে যাব না’ বললে পরিবার জানে কী করতে হবে; নিখোঁজ শিশুর প্রথম ঘণ্টার মূল্য বোঝা হয়; ছেলেশিশুও নির্যাতনের শিকার হতে পারে— এ কথা পরিবার, পুলিশ, চিকিৎসক জানে; কোনো রাজনৈতিক সংগঠন শিশুকে সহজ জনবল ভাবে না; গণমাধ্যম শিশুর মরদেহকে দর্শক টানার উপকরণ বানায় না।
সালমা আপা ধরিত্রীকে বলেছিলেন, ‘মামণি, তুমি এই যে সবার খোঁজ নিচ্ছ, এটা খুব ভালো করছ।’
এখন প্রশ্নটা উল্টো করে শুনি— আমরা কি আমাদের শিশুদের খোঁজ নিচ্ছি?
শুধু তারা হারিয়ে যাওয়ার পরে নয়। শুধু মৃতদেহ পাওয়ার পরে নয়। প্রতিদিন। ৩৬৫ দিন।
কারণ, শিশুরা শুধু আমাদের ভবিষ্যৎ নয়; তারা আমাদের বর্তমান। শিশু হত্যার বহু আগেই তাদের জন্য নিয়ত হত্যার ফাঁদ আমরাই তৈরি করে চলেছি।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও শিক্ষক




