ভারত কি নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে

আমরা এতদিন দেখে এসেছি, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বিরোধীরা হরতাল ডাকেন। কিন্তু দিল্লিতে আমরা একেবারে নতুন একটি ছবি দেখলাম। আন্দোলন ঠেকাতে সরকারই যেন নিজের বিরুদ্ধে হরতাল ডেকে বসেছে! কেন বলছি এ কথা?
গত ১০ অক্টোবর জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ডাকে দিল্লির যন্তর মন্তরে গণজমায়েতের কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশ যে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলল, তা কার্যত রাজধানীকে দুর্গে পরিণত করার শামিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিল্লিগামী ট্রেন বাতিল, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ, প্রায় ৪০ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েন— এমনকি তাদের একাংশকে সীমান্ত থেকে নিয়ে আসার খবরও সামনে এলো। দিল্লির রাস্তায় বসানো হলো ব্যারিকেড, পাতা হলো কাঁটাতার ও পেরেক। দিল্লিগামী ট্রেন থেকে আগের দিনই তরুণদের নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠল।
প্রশ্ন হলো, একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি ঠেকাতে সরকারকে এতটা মরিয়া হতে হলো কেন? লোকসভা নির্বাচন তো এখনই নয়। ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে এখনো কয়েক বছর বাকি। যন্তর মন্তরে কিছু তরুণ-তরুণী জড়ো হয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করলে এমন কী বিপদ ঘটত? সরকারের সামনে তো তাকে সরিয়ে দেওয়ার সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পথ নিয়েও আলোচনা করার সুযোগ ছিল। তাহলে রাজধানীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে প্রতিবাদের পথ বন্ধ করার চেষ্টা কেন?
ভারত সরকার আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু একটি কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়: ১৯৭৪-৭৫ সালের পর ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের এমন ব্যাপক ও তীব্র অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই আন্দোলন শুধু কিছু পদত্যাগের দাবি তুলছে না
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কয়েক মাস পিছিয়ে যেতে হবে।
ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যখন সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হলো, তখন পেশাদার প্রতিবাদীদের নিয়ে তার মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই আবহেই অনলাইনভিত্তিক উদ্যোগ থেকে আত্মপ্রকাশ করে সিজেপি। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের কাঠামোর বাইরে, ডিজিটাল পরিসরে সংগঠিত তরুণদের এই উদ্যোগ ক্রমে রাস্তায় নামার আন্দোলনে পরিণত হয়।
এরপর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী পথে নামলেন। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হলো। সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তার পরই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দ্বিতীয় দফার আন্দোলন শুরু হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। এই আন্দোলন শুধু সিজেপি বা তার নেতৃত্বে থাকা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কাদের আন্দোলন নয়। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। সিপিআইএমএল লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা ভোরা আন্দোলনের প্রথম সারির মুখ। পাশাপাশি রয়েছে এসএফআই, এআইএসএফ ও এআইডিএসওর মতো সংগঠন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সিজেপি ও বামপন্থীরা একসঙ্গে আন্দোলন করছে।
নেহা ভোরার প্রতিবাদের সময় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ভূমিকার সঙ্গে তার ভূমিকার তুলনা করে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে বলা হয়েছিল, আগামী ভারতের রাজনীতিতে নেহার কণ্ঠও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যটির তাৎপর্য এখানেই— নতুন প্রজন্মের রাজনীতি এখনো পুরনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছক থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি; কিন্তু সেই ছক ভাঙার চেষ্টাও চলছে। কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কে কার চেয়ে বড়— এ প্রতিযোগিতার বদলে একসঙ্গে লড়াই করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই সামনে আসছে।
কেন্দ্রীয় সরকারও সম্ভবত এই পরিবর্তনটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। উত্তর ভারতসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমছে, তা কখনো ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে, কখনো জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে প্রকাশ পাচ্ছে। এর সঙ্গে যদি কৃষকদের অসন্তোষও যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি সরকারের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের মনে আছে, ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের সময় পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের কৃষকরা দিল্লির সীমান্ত অবরুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকারকে তাদের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। সরকার আশঙ্কা করছে, বিক্ষুব্ধ তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে কৃষকদের ক্ষোভ এক জায়গায় এসে মিশলে তার অভিঘাত সামলানো কঠিন হবে।
কিন্তু আন্দোলনকে কি শুধু রাজধানীর কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? এরই মধ্যে বেঙ্গালুরু, পাটনা ও কলকাতাসহ বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও লক্ষ করার মতো। কংগ্রেস সরাসরি সিজেপির আন্দোলনের অংশ হয়নি। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ও তার ছাত্রসংগঠনগুলো সমান্তরালভাবে আন্দোলন করছে। ১০ অক্টোবরের প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষদের বড় অংশের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা ও বামপন্থী সংগঠনগুলোর পতাকা; তারা কংগ্রেসের পতাকার নিচে সমবেত হননি। সম্ভবত কংগ্রেসের হিসাব, সিজেপির মতো রাজনৈতিক দলের বাইরের উদ্যোগকে সরাসরি সমর্থন করলে উত্তর ভারতের বিরোধী ভোটের সমীকরণে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, সিজেপির আন্দোলনের পাশাপাশি বৃহত্তর বিরোধী ঐক্য গড়ার চেষ্টাও চলছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের কর্মসূচিতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিআই, সিপিএমসহ বামপন্থী দলগুলোর নেতাদের উপস্থিতি সেই প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত দেয়। ১০ অক্টোবরের আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন, মানিক সরকার ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো বিরোধী নেতাদের আটক করার ঘটনাও রাজনৈতিক উত্তাপের মাত্রা বুঝিয়ে দেয়।
নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এখন বিরোধীদের সামনে বড় প্রশ্ন। ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিতই দুর্বল হয়ে পড়ে। ভারত কি ক্রমে তুরস্কের মতো নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে? এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচনী কাঠামোর নিজস্ব শক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতিকে সরাসরি মেলানোও ঠিক হবে না।
তবে এটাও সত্য, গণতন্ত্রের কাঠামো বজায় রেখেও তার কার্যকারিতা সংকুচিত করা সম্ভব। আর সেই কারণেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিরোধীদের আন্দোলনের অধিকার নিয়ে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের কিছু অবস্থানও সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হয়েছে। ফলে পরিস্থিতিকে শুধু সরকার বনাম বিরোধী দলের লড়াই হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও।
এই আন্দোলন নরেন্দ্র মোদি সরকারের পতন ঘটাবে কি না, এখনই তা বলা অসম্ভব। বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি ভারতেও তৈরি হবে— এমন পূর্বাভাস দেওয়ারও ভিত্তি নেই। বরং আপাতত বড়, এই আন্দোলন সরকারকে ব্যাপক রাজনৈতিক চাপে ফেলতে পারে। যেমন ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল এবং পরবর্তী সময়ে জরুরি অবস্থা ও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছিল।
ভারত সরকার আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু একটি কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়: ১৯৭৪-৭৫ সালের পর ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের এমন ব্যাপক ও তীব্র অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই আন্দোলন শুধু কিছু পদত্যাগের দাবি তুলছে না; এটি প্রতিবাদের নতুন ভাষা, নতুন শব্দ ও নতুন রাজনৈতিক অভিব্যক্তি তৈরি করছে। আগামী দিনের রাজনীতির শিক্ষার্থীদের কাছে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হয়ে থাকবে।
দিল্লিতে সরকার যে হরতালের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে আন্দোলন ঠেকাতে চাইছে, তার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা— সরকার বুঝতে পারছে, রাস্তায় নামা এই তরুণদের প্রশ্নগুলোকে আর সহজে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
লেখক: ‘দি ইন্টারন্যাশনাল’ পত্রিকার এক্সিকিউটিভ এডিটর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক




