মাছ নয় বুকে গুলি পেলেন জেলে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেঘনায় মাছ ধরতে গিয়েছিলেন আকতার হোসেন হাওলাদার (৪০)। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারে যাওয়া আখতােরর জালে মাছ না ধরা পড়লেও বুকে পেয়েছেন রাষ্ট্রের বুলেট। অথচ মাছ মারার এই নিষেধাজ্ঞার মৌসুমে রাষ্ট্রের কাছ থেকে তার পাওয়ার কথা ছিল খাবার, টিকে থাকার সাহায্য।
নিরন্ন মানুষ কেন আইন ভাঙে? শত বছর পূর্বে মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ‘ক্ষুধার্ত মানুষ কোনো আইন মানে না।’ আজ আধুনিক যুগে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে আইন ভঙ্গ করার জন্য। চার মেয়ে, দুই ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে আকতারের আটজনের পরিবার। জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞাকালীন নদীতে গিয়ে প্রাণ হারালেন তিনি। যদিও নৌ-পুলিশ, কোস্ট গার্ডসহ সবাই এই অভিযানের কথা অস্বীকার করেছেন। হিজলা থানার ওসি মো. সোলায়মান বলেছেন, নিহত জেলের ঘাড়ে ও বুকে গুলির দাগ রয়েছে।
রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রশ্ন, দরিদ্র জেলেদের ক্ষুধার অন্ন ব্যবস্থা না করতে পারা কি অপরাধ নয়? মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৫৬৫। সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ১৪ লাখ ২০ হাজার জেলের কার্ড রয়েছে। বর্তমানে আরও কার্ড বিতরণের কাজ ধাপে ধাপে চলমান আছে। কিন্তু কার্ড থাকা মানেই সরকারি সহায়তা পাওয়া নয়।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মাঠতথ্যভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ভোলায় নিষেধাজ্ঞাকালে ৬১ শতাংশ জেলে পরিবারের আয় প্রায় শূন্যে নেমে আসে। আবার ৮৭ শতাংশ পরিবারের কোনো বিকল্প আয়ের উৎস নেই। ৫৬ শতাংশ ক্ষুদ্র জেলে সরকারি সহায়তা থেকে বাদ পড়েছে। আবার সহায়তাপ্রাপ্ত পরিবারগুলোর ৮৩ শতাংশ জানিয়েছে, তারা নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার এক থেকে দুই মাস পরে চাল পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞা যখন সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়, তখন সহায়তাও সময়মতো পৌঁছানো উচিত। দেরিতে চাল দেওয়া নিষেধাজ্ঞাকালীন ক্ষুধা, ঋণ ও আয়হীনতার সমাধান করে না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মৎস্য আহরণে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং জলজ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত সর্বশেষ মৎস্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষপুস্তক অনুযায়ী, দেশে মাছের মোট উৎপাদন প্রায় ৫১ লাখ ১১ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক লাখ টন বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে একজন মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৬৭ দশমিক ৮ গ্রাম মাছ গ্রহণ করেন। সেই হিসাবে দেশের বার্ষিক মাছের চাহিদা ৪২ থেকে ৪৫ লাখ টন। উৎপাদনের হিসাবে বাংলাদেশ এখন মাছের চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
ইলিশ রক্ষার অভিযানে যদি জেলের প্রাণই ঝরে তাহলে সেই অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি জবাবদিহি এবং জেলেদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই
এই সাফল্য সরকারি নীতি, গবেষণা, মৎস্য চাষের সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগের ফল। কিন্তু উৎপাদনের এই বড় সংখ্যার আড়ালে নদী, হাওর, বিল ও উপকূলনির্ভর ক্ষুদ্র জেলেদের জীবন সংকট প্রায় অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। আমরা মাছের উৎপাদনের হিসাব রাখি; হিসাব রাখা হয় না এই উৎপাদনের সুফলের বণ্টন কতটা ন্যায্য, কত জেলে পেশা ছাড়ছেন, কত পরিবার ঋণে ডুবছে, কত নারী স্বীকৃতির অভাবে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জেলেদের সংকটের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়। সমকালের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, খুলনায় নিষেধাজ্ঞার সময় সাধারণ জেলেরা নদীতে যেতে না পারলেও, প্রভাবশালীরা সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ আহরণ করছেন। দেশ রূপান্তরের ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে জেলেদের পেশা ছাড়ার কথা উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে খাল ও বিল ইজারা নিয়ে বাণিজ্যিক মাছ চাষের কারণে প্রকৃত জেলেদের প্রবেশাধিকার হারানোর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর শাখা কুকড়া নদী ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে স্থানীয়ভাবে আন্দোলন হয়েছিল। নদীকে বদ্ধ জলমহাল হিসেবে দেখিয়ে ইজারা দেওয়া হলে মাছ ধরার অধিকারই সীমিত হয় না; সীমিত হয় নৌচলাচল, কৃষিকাজ, গৃহস্থালি ব্যবহার, গবাদি পশুর পানি এবং স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত প্রবেশাধিকারও।
সরকারের নীতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জলমহাল ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। জলমহাল নীতিমালায় জলমহাল ইজারা পাওয়ার জন্য মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি গঠন, নিবন্ধন, আর্থিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের বিধান রয়েছে। বাস্তবে এসব শর্ত প্রকৃত ক্ষুদ্র জেলেদের জন্য কঠিন। দরিদ্র ও অসংগঠিত জেলে পরিবারগুলো অনেক সময় সমবায় গঠন, নিবন্ধন, দরপত্র প্রস্তুত এবং ইজারামূল্য পরিশোধ করতে পারে না। এই সুযোগে রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জেলেদের নামে সমিতি গঠন করে ইজারা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কাগজে জেলে সমিতি ইজারা পেলেও বাস্তবে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রভাবশালীদের হাতে।
চলতি বছর ভূমিমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘জলমহাল কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের।’ শুধু বক্তব্যে নয়, মাঠপর্যায়ে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলমহাল জনগণের সম্পদ হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে নদী-জলমহালকে জনগণের সম্পদ বলা, অন্যদিকে নদীতেই জেলের মৃত্যু জনগণের সঙ্গে স্পষ্ট দ্বিচারিতা। আইনের প্রয়োগ জরুরি, তবে আইন যেন দরিদ্র জেলেদের শোষণের জন্য না হয়, আইন যেন তাদের অধিকারও রক্ষা করতে পারে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে হবে, কিন্তু জেলেদের জীবন ও মানবাধিকারকে উপেক্ষা করে নয়। ইলিশ রক্ষার অভিযানে যদি জেলের প্রাণই ঝরে, তাহলে সেই অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি, জবাবদিহি এবং জেলেদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
লেখক: উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক নীতিবিষয়ক গবেষক



