ফল বিপর্যয়ের দায় কি শুধুই শিক্ষার্থীদের

সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্গত এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। ২০২৬ সালে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে; গত বছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু পরীক্ষার ফলের নিম্নগামিতা নয়; বরং শিক্ষার্থীর অধ্যয়নাভ্যাস, শ্রেণিকক্ষের প্রতি দায়বদ্ধতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং পারিবারিক তদারকির ক্রমবর্ধমান সংকট নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান। শিক্ষার এ অধোগতিকে শুধু কঠিন প্রশ্নপত্র; কিংবা মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল।
প্রথমত, পাঠ্যপুস্তকবিমুখতা। শিক্ষার্থীদের একাংশ মূল বইয়ের ধারাবাহিক পাঠ, বিষয়ভিত্তিক অনুশীলন এবং ধারণাগত উপলব্ধির পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত নোট, সাজেশন ও পরীক্ষামুখী মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অথচ পাঠ্যপুস্তক কোনো আনুষ্ঠানিক উপকরণ নয়; তা জ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি নির্মাণের প্রধান অবলম্বন। মূল পাঠ আত্মস্থ না করে বিচ্ছিন্ন প্রশ্নোত্তর আয়ত্ত করার প্রবণতা শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণক্ষমতা, ভাষাগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সামর্থ্যকে দুর্বল করে। প্রশ্নের কাঠামো সামান্য পরিবর্তিত হলেই তখন প্রস্তুতির অন্তঃসারশূন্যতা প্রকট হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, শ্রেণিকক্ষবিমুখতা। নিয়মিত উপস্থিতি, মনোযোগী পাঠগ্রহণ, শিক্ষকের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর এবং সহপাঠীদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা— এসবই শিক্ষার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকেও প্রকৃত শিক্ষাকার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের সংস্পর্শ হারালে শিক্ষার্থীরা শেখার ধারাবাহিকতা, সময়ানুবর্তিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ— তিনটিই হারায়। কোনো শিক্ষার্থী দিনের পর দিন ক্লাস ফাঁকি দিলে সেটিকে কখনো ‘বয়সের দোষ’, কখনো ‘স্বাধীনতার প্রকাশ’ বলে হালকা করা হয়। কৈশোর ও তারুণ্যে স্বাধীন চিন্তা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি আত্মসংযম, কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্তের পরিণতি উপলব্ধি। এ মৌলিক শিক্ষা পরিবার ও প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে দিতে ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীর মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দকে দীর্ঘমেয়াদি অর্জনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হয়।
পাঠদানের মান বিষয়ভিত্তিক শিখনঘাটতি, প্রশ্নপত্রের ধরন, পরীক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈষম্যও অনুসন্ধান দাবি করে
তৃতীয়ত, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অসম্মানের সংস্কৃতি। শিক্ষককে প্রশ্ন করা, মতভিন্নতা প্রকাশ করা কিংবা যৌক্তিক সমালোচনা করা অবশ্যই শিক্ষার্থীর অধিকার; কিন্তু তা কখনোই অবজ্ঞা, ঔদ্ধত্য বা শৃঙ্খলাভঙ্গের সমার্থক নয়। শিক্ষকের নির্দেশনা উপেক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিধিবিধান অমান্য এবং পড়াশোনাকে তুচ্ছজ্ঞান করার প্রবণতা সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। এটি শিক্ষার্থীদের মনঃসংযোগ ও সময়ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় ডেকে আনছে। শিক্ষামূলক প্রযুক্তি অবশ্যই সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে; কিন্তু উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর অবিরাম আকর্ষণ, অনলাইন বিনোদন এবং ভার্চুয়াল স্বীকৃতির প্রতিযোগিতা অনেকের দৈনন্দিন রুটিনকে গ্রাস করছে। ৫ মিনিটের বিরতি কখন ঘণ্টাব্যাপী অপচয়ে পরিণত হয়, তা তারা টেরও পায় না। পর্যাপ্ত ঘুম, নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন, পুনরাবৃত্তি ও আত্মমূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় সংকুচিত হয়।
পঞ্চমত, অভিভাবকীয় উদাসীনতা ও প্রশ্রয়। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পড়াশোনায় কতটা সময় দিচ্ছে, এসব প্রশ্ন অনেক পরিবারেই যথাযথ গুরুত্ব পায় না। কোথাও সন্তানের প্রতিটি অজুহাত নিঃশর্তে গ্রহণ করা হয়; কোথাও শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের যুক্তিসংগত অভিযোগ যাচাই না করেই প্রত্যাখ্যান করা হয়। অভিভাবকের ভালোবাসা যদি সীমারেখাহীন প্রশ্রয়ে পরিণত হয়, তবে তা সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পরিবর্তে আত্মশৃঙ্খলা ধ্বংস করতে পারে। অভিভাবকের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অর্থ সন্তানকে সারাক্ষণ সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং স্নেহ ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে যুক্তিসংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। শুধু পরীক্ষার আগে ভালো ফলের দাবি তুলে বছরের বাকি সময় সন্তানের পাঠাভ্যাস সম্পর্কে নির্বিকার থাকলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে অবধারিত ব্যবধান সৃষ্টি হয়। মাসে একবার শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা, উপস্থিতির তথ্য দেখা, পড়াশোনার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা এবং অনলাইন সময় ব্যবহারের যৌক্তিক নীতি তৈরি করা— এসবই অভিভাবকীয় দায়িত্বের ন্যূনতম প্রকাশ।
এ পাঁচটি প্রবণতা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একে অন্যকে পুষ্ট করে। পাঠ্যবইয়ের প্রতি অনীহা শ্রেণিকক্ষে আগ্রহ কমায়; অনিয়মিত উপস্থিতি শিক্ষকের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে; অসংযত ডিজিটাল আসক্তি অধ্যয়নের সময় কেড়ে নেয়; আর অভিভাবকীয় নীরবতা এ অবক্ষয়কে দীর্ঘস্থায়ী করে। ফল প্রকাশের পর ক্ষোভ, হতাশা কিংবা দোষারোপ যত সহজ, এই আচরণগত সংকট সংশোধন তত কঠিন। তাই ফলের সংখ্যাকে উপলক্ষ করে শিক্ষাসংস্কৃতির ভেতরের ক্ষয় পরীক্ষা করা জরুরি।
তবে জাতীয় ফল বিপর্যয়ের প্রতিটি কারণকে শুধু আচরণগত বিচ্যুতির ওপর নির্ভর করে প্রমাণ করা যায় না। পাঠদানের মান, বিষয়ভিত্তিক শিখনঘাটতি, প্রশ্নপত্রের ধরন, পরীক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈষম্যও অনুসন্ধান দাবি করে। যথাযথ গবেষণা ছাড়া কোনো একটি কারণের অবদান শতাংশের হিসাবে নির্ধারণ করা অসম্ভব। কিন্তু এ সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থী, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ দায়িত্বকে অস্বীকার করার অজুহাত হতে পারে না।
আজ যে পরিবার সন্তানের অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যে শিক্ষার্থী বই ছেড়ে পর্দায় নিমগ্ন, যে প্রতিষ্ঠান উপস্থিতির শৈথিল্য মেনে নিচ্ছে— তাদের প্রত্যেকের জন্য এ ফলাফল এক কঠোর সতর্কবার্তা। শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা, পাঠের প্রতি নিষ্ঠা ও দায়িত্বের প্রতি অনমনীয় অঙ্গীকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হলে ভবিষ্যতের ফলও বদলাবে না।
লেখক: কলামিস্ট ও জনসংযোগ পেশাজীবী



