ইরানের প্রতিরোধ সামরিক কৌশলের নতুন উদাহরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমীকরণ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সামরিক কৌশলগত দিকটি অনেকটাই আড়ালে রয়ে যাচ্ছে। ইউএসএ-ইসরায়েল বনাম ইরানের এ যুদ্ধটি যুগের পর যুগ একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে টিকে থাকবে। একে একটি সফল অসম যুদ্ধের যুগোপযোগী এবং টেক্সটবুক এক্সাম্পল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। সামরিক কৌশল এবং পাঠ্যপুস্তকে এ যুদ্ধের বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইরান খুব ভালো করেই জানত, তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুদ্ধে তাদের অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল মোজাইক স্ট্র্যাটেজি। কমান্ড এবং ইমপ্লিমেন্টেশনের সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণ। ইরান তাদের সামরিক শক্তিকে বিভিন্ন স্তরে বিকেন্দ্রীকরণ করে তা প্রয়োগ করেছে। সেখানে কোনো সেন্ট্রালাইজড বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কে, কখন, কোন মিসাইলটি মারবে বা কী পদক্ষেপ নেবে— তা সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় কমান্ডের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল-ইউএসএ ইরানের প্রক্সি ও মিত্রদের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে। নেতৃত্বশূন্য করার এ প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ তীব্র। কিন্তু নেতৃত্বশূন্য হওয়ার পরও মোজাইক স্ট্র্যাটেজি নিখুঁত ও সফলভাবে কার্যকর থাকে। ইরান যে এভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা ইসরায়েল ও ইউএসএ কল্পনাও করতে পারেনি। তারা এ ধরনের বিকেন্দ্রীকৃত কৌশলের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিরাচরিত সামরিক চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে চিন্তা করা। ইরান শুধু ভিন্নভাবে চিন্তাই করেনি; বরং তা কার্যকরভাবে মাঠে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। এর বড় উদাহরণ হলো, বিমানবাহী রণতরী বা এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ারের প্রতিরোধ। ইরান কিন্তু ইউএসএর এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ারের বিপরীতে নতুন কোনো ক্যারিয়ার তৈরি করতে যায়নি। বরং তারা এমন সব ব্যবস্থা করেছে, যেন ইউএসএ তাদের এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ারগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারে। ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশিসংখ্যক এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেনি। এটি বিশাল কৌশলগত বিজয়।
ইরানের গোপন সামরিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি আলাদাভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা যুগের পর যুগ ধরে শত্রুর চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অনেকে ইরানের এই সামরিক মাত্রাকে তিন ভাগে ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে, ভূমির ওপরে একটি ইরান রয়েছে।
আবার ভূমির নিচে রয়েছে আরেকটি ইরান এবং পানির নিচে রয়েছে অন্য এক ইরান। ৪০ বছর ধরে তারা বিভিন্ন মাত্রায় এ গোপন প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইরানের এই আসল সক্ষমতা শত্রুপক্ষকে বিচলিত করে ফেলে।
ইরানের কৌশল ছিল কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে শত্রুকে ক্ষয় করা, যাকে ওয়ার অব অ্যাট্রিশন বলে। আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল, অত্যধিক সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া
যুদ্ধে ইরানের সহনশীলতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল অকল্পনীয়। এটি অন্যান্য দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান নিজেদের সামরিক শক্তিকে ধরে রেখেছে এবং ক্রমেই উন্নত করেছে। তারা সরাসরি কোনো সম্মুখযুদ্ধে জড়ায়নি। বরং প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ড্রোন এবং মিসাইল দিয়ে শত্রুকে দূর থেকে মোকাবিলা করেছে। ইউএসএ এবং ইসরায়েল যে মাত্রায় আক্রমণ চালিয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও তীব্র। এত বড় আঘাতের পরও ইরানের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি; বরং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। আধুনিক যুদ্ধের ধারণায় ইরান মূলত পাঁচটি মাত্রায় বা হাইব্রিড উপায়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। প্রথমটি হলো স্থলমাধ্যম। এখানে তাদের নিজস্ব ল্যান্ড ফোর্সেস বা আইআরজিসি এবং মূল সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন মিত্র মিলিশিয়াবাহিনী। দ্বিতীয়টি হলো আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র মাধ্যম। আমরা দেখেছি কীভাবে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও কামিকাজি ড্রোনের মাধ্যমে তারা ইউএসএ এবং ইসরায়েলকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। তৃতীয়টি হলো জলমাধ্যম। সমুদ্রে বড় যুদ্ধজাহাজের মুখোমুখি না হয়ে তারা শত শত ছোট ও দ্রুতগামী স্পিডবোট ব্যবহার করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাবমেরিন এবং সামুদ্রিক মাইন। চতুর্থটি হলো ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ডাইমেনশন। ইরানের পক্ষে এই গ্রে-জোনে যুদ্ধ করেছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা। এই অক্ষশক্তি বা এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে নিজের দেশের বাইরে রাখতে পেরেছে। যুদ্ধ ইরানের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি, যা একটি সফল সামরিক কৌশল। পঞ্চম এবং শেষটি হলো সাইবার মাধ্যম। তারা পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ সাইবার আক্রমণকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এই যুদ্ধের লাভ-ক্ষতির কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিসিস বা হিসাবটি অত্যন্ত জটিল। ইরানের বেনিফিট হলো, তাদের অসম যুদ্ধকৌশলের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তারা অত্যন্ত কম খরচে ড্রোন তৈরি করে শত্রুর ওপর প্রয়োগ করেছে। আর সেই সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ইসরায়েল ও ইউএসএকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের আয়রন ডোম বা প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করতে হয়েছে। এর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্বের অস্ত্রবাজারে পড়বে। পৃথিবীর ছোট দেশগুলো এখন ইরানের এই সাশ্রয়ী যুদ্ধ সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি কেনার চেষ্টা করবে। দ্বিতীয় লাভ হলো, যুদ্ধের ময়দানকে ইরান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। প্রক্সি নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো সুরক্ষিত থেকেছে। তৃতীয় লাভ হলো, উপসাগরীয় দেশগুলো আগে মনে করত, ইউএসএ তাদের শতভাগ নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেবে। তারা পশ্চিমাদের থেকে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনত। কিন্তু এই যুদ্ধে প্রমাণ হয়েছে, ইউএসএ তার মিত্রদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। পাশাপাশি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছে। এই নিয়ন্ত্রণের বহুমাত্রিক সুবিধা ইরান দীর্ঘকাল ভোগ করবে।
তবে ইরানের ক্ষতির পাল্লাও কম নয়। তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের ডিক্যাপিটেশন হয়েছে, যা একটি বড় ক্ষতি। অনেক অভিজ্ঞ সামরিক কমান্ডার এবং পরমাণুবিজ্ঞানীকে হারিয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে। পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের লাভ হলো, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে পেরেছে। ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার কৌশল সম্পর্কে তাদের তথ্যভাণ্ডার এখন অনেক সমৃদ্ধ। ইরানের ক্ষতিও ইসরায়েল নিজেদের লাভ হিসেবে দেখছে। কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। প্রথমত, তারা বিশ্ব জুড়ে তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ও জনসমর্থন হারিয়েছে। সস্তা ড্রোন আটকাতে গিয়ে তাদের বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, ইসরায়েলের অপরাজেয় থাকার যে মিথ বা বিশ্বাস ছিল, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল বৈশ্বিক প্রতিপক্ষ হলো চীন এবং রাশিয়া। এই যুদ্ধের কারণে তাইওয়ান সংকট বা ইউক্রেন সংকট থেকে আমেরিকার মনোযোগ বিচ্যুত হয়েছে। একে সামরিক ভাষায় স্ট্র্যাটেজিক ডিস্ট্রাকশন বা কৌশলগত মনোযোগ বিচ্যুতি বলা যায়। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও তহবিল খরচ হয়েছে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত তৈরি হয়েছে। সংক্ষেপে লাভ-ক্ষতির মূল সমীকরণ হলো, ইরানের কৌশল ছিল কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে শত্রুকে ক্ষয় করা, যাকে ওয়ার অব অ্যাট্রিশন বলে। আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল, অত্যধিক সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। সাময়িক অস্ত্রবিরতি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত পুরোপুরি থামবে না। এই চুক্তিতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মতো মূল পক্ষগুলো সরাসরি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় মাঠপর্যায়ে ছায়াযুদ্ধ ও সাইবার আক্রমণ চলতেই থাকবে।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল





