জাতিসংঘ সবার কবে হবে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ছিল সাড়ে আট কোটি। যুদ্ধে বিজয়ী মিত্রপক্ষ আগেই বুঝেছিল, বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে লিগ অব নেশনস দিয়ে আর কাজ হবে না। ৫৮ জাতি লিগ থেকে একে একে বিভিন্ন দেশ ছিটকে পড়ছিল। ১৯৪১ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট নাৎসি-ইতালি-জাপান অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে একত্র হওয়া দেশগুলোকে ইউনাইটেড নেশনস বলা শুরু করেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তার সঙ্গে যোগ দেন এবং অক্ষশক্তিবিরোধী ইউনাইটেড নেশনস জোট গঠনের জন্য ঘোষণাপত্র তৈরি করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা ১৯৪৩ সালে মস্কোতে বসে নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের ইঙ্গিত দেন। এই চার দেশের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক সংস্থার কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। ১৯৪৫-এ যুক্তরাজ্যের অনুরোধে ফ্রান্সকেও সেখানে যুক্ত করা হয়। ৫০টি দেশ এই উদ্যোগে শামিল হয়। ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম হয় ইউনাইটেড নেশনস তথা জাতিসংঘের।
জন্মের পর থেকে জাতিসংঘ দেশে দেশে যুদ্ধ থামাতে তৎপর ছিল। সফলও হয়েছে। কোরিয়া যুদ্ধ তার বড় উদাহরণ। অবশ্য তখন নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুপস্থিত ছিল। চীনের আসনও দখল করে রেখেছিল তাইওয়ান। সোভিয়েত ইউনিয়ন চাইছিল, তাইওয়ানের পরিবর্তে নিরাপত্তা পরিষদে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে অধিষ্ঠিত করতে। অন্যান্য স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রকে রাজি করাতে না পেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদ বর্জন করে। এতে কপাল পুড়ে উত্তর কোরিয়ার। নিরাপত্তা পরিষদ সৈন্য পাঠিয়ে উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করে।
বছরের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনরায় যোগ দেয় জাতিসংঘে। পৃথিবী ক্রমান্বয়ে ঢুকে যায় স্নায়ুযুদ্ধের যুগে। এশিয়া ও আফ্রিকায় উপনিবেশের নিগড় থেকে একে একে স্বাধীন দেশের জন্ম হলে তারা জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ফলে তাদের সম্মিলিত শক্তি ও সমর্থনে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন অর্জন করে জাতিসংঘ তথা নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব। মজার ব্যাপার হলো, নিজে নিরাপত্তা পরিষদে অধিষ্ঠিত হয়ে চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে ভেটো দিয়ে বসে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৫০ বার ভেটো দিয়ে ইসরায়েলকে রক্ষা করেছে। অনেকে তাই ভেটো ক্ষমতাকেই বিশ্বশান্তির অন্তরায় মনে করে
জাতিসংঘে প্রতিটি সদস্য দেশের একটিই মাত্র ভোট। সাধারণ পরিষদে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তা সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে গৃহীত হয়। সাধারণ পরিষদের কোনো সিদ্ধান্ত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক না। তবে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স। অপর ১০টি দেশ সদস্য রাষ্ট্র হতে পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়ে আসে। নিরাপত্তা পরিষদ সাধারণভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু স্থায়ী পাঁচটি দেশের প্রতিটির যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো বা আপত্তি দেওয়ার সুযোগ আছে। ভেটো উত্থাপিত হলে সে সিদ্ধান্ত আর গৃহীত হয় না, অর্থাৎ স্থায়ী পাঁচটি দেশের যেকোনোটি চাইলেই যেহেতু যেকোনো সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সে জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত এই পাঁচটি দেশের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। কেননা একদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত সদস্য দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক না, অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচটি দেশের যেকোনোটি ভেটো দিয়ে সিদ্ধান্ত আটকে দেয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৫০ বার ভেটো দিয়ে ইসরায়েলকে রক্ষা করেছে। অনেকে তাই ভেটো ক্ষমতাকেই বিশ্বশান্তির অন্তরায় মনে করে।
জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী নেই। ফলে সদস্য দেশ যদি জাতিসংঘের অনুরোধে যুদ্ধ বন্ধ না করে, তবে জাতিসংঘের পক্ষে সেই সদস্য দেশকে বাধ্য করার কোনো উপায় নেই। জাতিসংঘ অনেক ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো থেকে সেনাবাহিনী ভাড়া নেয়; কিন্তু প্রধানত তা শান্তিরক্ষার জন্য, যুদ্ধের জন্য নয়। জাতিসংঘ সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ নিরাপত্তা পরিষদকে বলপ্রয়োগের এখতিয়ার দিয়েছে। কোরিয়া যুদ্ধ ছাড়াও ১৯৯০ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকি সৈন্যদের কুয়েতছাড়া করতে এই এখতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, হাইতি, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, পূর্ব তিমুর, লিবিয়া, কঙ্গো ও মালিতে সীমিত বলপ্রয়োগ অনুমোদন করা হয়েছে।
আবার বহু জায়গায় হয় স্নায়ুযুদ্ধ, না হয় ভূরাজনৈতিক স্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বা জোট থাকায় স্থায়ী সদস্যদের কেউ না কেউ কোনো না কোনো আগ্রাসী দেশকে সমর্থন দিয়ে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে হয় নিজেরা, না হয় তাদের পক্ষে অন্য দেশ প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে যুদ্ধ জিইয়ে থেকেছে। অসহায় মানুষরা অন্যায়ভাবে মরেছে। কিন্তু দায়ী রাষ্ট্রকে নিবৃত্তও রাখা যায়নি, শাস্তিও দেওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইসরায়েল। সাধারণ পরিষদ প্রতিবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিলেও নিরাপত্তা পরিষদ কখনো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফিলিস্তিনের ৮৫ ভাগ জমি ইসরায়েলের দখলে। দুই কোটি ফিলিস্তিনি লোকসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের শিকার। কাশ্মীরের সংঘাত বন্ধে ১৯৪৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত বা পাকিস্তানের কেউ তা মানতে চায় না। অন্তত এক লাখ কাশ্মীরি বিভিন্ন সময় এই সংঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে। কম্বোডিয়ার খেমার রুজ সরকার প্রায় ২০ লাখ নাগরিক হত্যা করেছে, অথচ জাতিসংঘ দীর্ঘদিন খেমার রুজ সরকারকে বৈধতা দিয়ে গেছে। সোমালিয়ায় এখনো গৃহযুদ্ধ চলছে। মৃতের সংখ্যা পাঁচ লাখ। জাতিসংঘ এখানেও ব্যর্থ। রুয়ান্ডায় যখন হুতু জনগোষ্ঠী তুতসি জনগোষ্ঠীর ওপর চড়াও হয়, আট লাখ তুতসি গণহত্যার শিকার হয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীরা কিছুই করতে পারেনি। এখানেই শেষ নয়; সুদান, দক্ষিণ সুদান, বসনিয়া, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমারে হয় গণহত্যা চলছে, নয় যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ চলছে ইউক্রেন, ইরান, লেবানন ও ফিলিস্তিনে। জাতিসংঘ এসব হত্যা বা যুদ্ধ নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে।
তাহলে কি জাতিসংঘ ব্যর্থ? জাতিসংঘ কি কাগুজে বাঘ? জাতিসংঘের কি কোনো কার্যকারিতা নেই?
যুদ্ধ চলাকালীন নিপীড়িত জনগণ বা শরণার্থীদের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে এখনো জাতিসংঘের বিকল্প নেই। দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশকে খাদ্য সাহায্য দিতে জাতিসংঘ কার্পণ্য করে না। মহামারীতে জাতিসংঘ এগিয়ে যায়। অনগ্রসর দেশে অর্থনৈতিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সাহায্য করে থাকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একমাত্র প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রতি বছর সর্বোচ্চ সংখ্যক বিশ্বনেতা অংশ নেন, সর্বোচ্চ সংখ্যক দেশ প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘের এখনো বিকল্প নেই। অনেকে তাই মনে করেন, যুগোপযোগী সংস্কারে হয়তো জাতিসংঘকে আবার কার্যকর সংস্থায় রূপান্তর করা যাবে।
১১ জাতি ব্রিকস জোট সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলন করেছে। এর আগে ১০ জাতি সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনও শীর্ষ সম্মেলন করেছে। দুটি সংস্থাই জাতিসংঘের সংস্কারের দাবি করছে, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের। চীন গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভের আওতায় জাতিসংঘের সংস্কার নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন বহু দিন থেকে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতাসহ অন্তত একটি স্থায়ী সদস্যপদ চাইছে। ব্রাজিল, জার্মানি, ভারত ও জাপান জোটবদ্ধ হয়ে প্রত্যেকের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ চাইছে। এবারের শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকস ভারতের স্থায়ী সদস্যের দাবি সমর্থন করেছে। আবার ইতালি, স্পেন, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, কোরিয়া এই চার দেশের বিরোধিতা করছে।
১৮ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এখানে নীরব থাকার সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে তাই সমমনা উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়ে জোট গড়ে তুলতে হবে এবং কার্যকর সমাধানের জন্য সোচ্চার হতে হবে। সবল কোনো দেশ যেন দুর্বলের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে না পারে, আবার নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাকে পদানত না করে। জাতিসংঘ তবেই প্রকৃত অর্থে ‘সবার জাতিসংঘ’ হয়ে উঠবে।
লেখক: সাবেক কূটনীতিক




