পিডি হবেন না, বাইরে থেকে নিলেও মন খারাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইতিহাসই প্রকল্পের ইতিহাস। পিরামিড থেকে মহাপ্রাচীর— সবই ছিল পরিকল্পিত উদ্যোগের ফসল। তবে আধুনিক প্রকল্পের ধারণা জন্ম নেয় শিল্পবিপ্লবের পর। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা পায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা ও বাজেটের মধ্যে কাজ শেষ করার এ পদ্ধতি বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দেয় বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। অর্থাৎ প্রকল্প সফল করতে এ প্রশাসনিক পদ্ধতির জন্মই হয়েছিল দক্ষতা, জবাবদিহি ও গতিশীলতার জন্য— স্থবিরতা বা টানাপড়েনের জন্য নয়।
কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টি হয়েছে প্রশাসনিক প্যারাডক্স। কোয়ালিটি অফিসাররা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিতে চান না। আবার বাইরে থেকে আনতে গেলেও তাদের মন খারাপ হয়। এটি চিরকালীন। এ বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা চলছে। সরকার চাইছে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি যেন বেসরকারি উপযুক্তরাও পিডি হতে পারেন। পিডি নিয়োগ নীতিমালার খসড়া প্রকাশের পর প্রশাসন সরব। তারা মনে করেন, এতে দলীয়করণে পথ সুগম হবে। তৈরি হবে ব্যাপক দুর্নীতির ঝুঁকি।
সরকারি চাকরির তুলনায় প্রকল্পে বেতন বেশি। একজন অতিরিক্ত সচিব বেতন পান ৬৬ হাজার থেকে ৭৬ হাজার টাকা স্কেলে। এর সঙ্গে নানা সুবিধা। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১০ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজারের মধ্যে। আর পিডির বেতনও সর্বোচ্চ ৭ লাখ। এরপরও পিডি পদ টানে না। পিডিদের সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা। আলাদা অফিস, সাপোর্টিং স্টাফ, নিজের মতো অফিস চালানোর স্বাধীনতা। এতকিছুর পরও কোয়ালিটি অফিসাররা পিডি হতে চান না বা হলেও তারা চালিয়ে েযতে অনীহা দেখান। ফিরে আসতে মরিয়া মন্ত্রণালয়ে। সরকার মানে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী-সচিব ক্ষমতার কেন্দ্রে। ক্ষমতার উত্তাপ তারাও পেতে চান। তা ছাড়া পদোন্নতি পেতে হবে তো! উপসচিব পর্যায় থেকেই পিডি হন। আগে যুগ্ম সচিবরা, এখন বড় প্রকল্পগুলোতে পিডি হন অতিরিক্ত সচিবরা। সচিব থেকে একধাপ দূরে! ক্ষমতার আশপাশে থাকলে পদোন্নতির দৌড়ে এগিয়ে থাকা যায়।
একজন পিডির প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক জায়গায়ই থাকা দরকার। তিন বছর পর্যন্ত মেয়াদি প্রকল্পে এটাই আদর্শ। তাহলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই গতিতে চলবে। এর চেয়ে বেশি মেয়াদি হলে একাধিকজন দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ঘন ঘন অর্থাৎ ছয় মাস, নয় মাস পরপর পিডি বদলালে কাজে সমস্যা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে সেটি হয় না, ফরম্যাট করা কাজ। শুরুর মতো সমাপনটাও প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হয়। যে গাড়িটি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, সেটি বুঝিয়ে দিয়ে আসার একটি বিষয় আছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। বাস্তবে তা হয় না। প্রকল্পের শত শত গাড়ির কোনো হদিস করতে পারে না সরকার।
পিডির বিষয়টি এত আলোচিত কেন? কারণ প্রশাসনে নানা ঘটনা ঘটছে। সরকার মাত্রই ১১ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে এসব পদে কখনোই রাজনীতিবিদের নিয়োগ হয়নি। এতে আইনি বাধা নেই, তবে প্রশ্নে ভরপুর
ডিপার্টমেন্ট থেকে পিডি করলে, বিশেষ করে অবকাঠামো প্রকল্পে কিছু ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়। রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের প্রকল্প পরিচালক বেশিরভাগই ওই ডিপার্টমেন্ট থেকে হয়। এলজিইডির প্রকল্পে পিডি হয় তারাই। কিন্তু সোশ্যাল সেক্টরে সমস্যা। এ সেক্টরের প্রকল্প হয় মূলত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে। শিক্ষক এবং চিকিৎসকদের বিশেষায়িত কাজ। তাদের শিক্ষকতায় বা চিকিৎসায় অভিজ্ঞতা থাকে। প্রশাসনিক বা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা কম। এ কারণে কিছু ছোট প্রকল্পে তাদের দেখা গেলেও বড় প্রকল্পে বাইরে থেকে পিডি করা হয়। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)। এর সিইও হচ্ছেন স্যার জিম ম্যাকি। তিনি চিকিৎসক নন, পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। সারা বিশ্বেই এনএইচএস খ্যাতনামা এর সেবা, বাজেট, জনবল, অবকাঠামো, নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনার জন্য। কাজেই ডিপার্টমেন্ট থেকেই পিডি হতে হবে— এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনা খানিকটা টেকনিক্যাল বিষয়। যাদের ধারণা কম, অভিজ্ঞতা নেই তাদের পক্ষে চালানো মুশকিল। বিশেষ করে কেনাকাটার বিধিবিধান সম্পর্কে না জানলে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ভালো করার কোনো সুযোগ নেই। এর বড় অংশ ক্রয় ব্যবস্থাপনা। প্রপোজাল বানাতে হবে, ঘাটে ঘাটে অ্যাপ্রুভ করিয়ে আনতে হবে। এরপর বাস্তবায়নের পালা। রাজনৈতিক চাপ আমলে নিতে হবে। মিডিয়ার মতো সরকারের বাইরে যারা আছে, তাদের হ্যান্ডেল করতে হবে।
পিডিদের যোগ্যতা কী হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা দরকার। কমন যোগ্যতা নয়, সেক্টরভিত্তিক আলাদা আলাদা যোগ্যতা নির্ধারণ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। এখানে ওপেন কম্পিটিশন থাকলে ভালো। ওপেন না হলেও লিমিটেড কম্পিটিশন হলেও থাকা দরকার। আগ্রহীদের একটি প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দিতে হবে।
সরকারের প্রতিটি পদের বিপরীতে সেট ক্রাইটেরিয়া আছে। তারপরও সঠিক লোক নিয়োগ, পদোন্নতি বা পদায়ন করা সবচেয়ে জটিল কাজ। সেট ক্রাইটেরিয়ায় যখন পারা যায় না, তখন অনির্ধারিত ক্রাইটেরিয়ায় তা আরও জটিল হবে। যোগ্য লোককে না দিয়ে দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোক ঢুকে পড়বে।
যোগ্য লোক পাওয়া মুশকিল— আগ্রহী অনেক, কিন্তু যোগ্য লোক খুব কম। সরকার যদি নিজ দলের লোকও নিয়োগ দেয়, তাহলে তো সেরা কর্মীকেই বাছাই করতে হবে। কারণ দিন শেষে সরকারকেই জবাব দিতে হয়। উন্নয়ন সহযোগীরা কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়। কিন্তু তাদের কনসালট্যান্ট খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। তারা বিজ্ঞাপন দেয়, সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। কিন্তু দিন শেষে যারা সাড়া দেয় তাদের নিয়োগ দিতে পারে না। তারা ব্যক্তিগত পরিচয় বা সরকারি কাজের সূত্রের সম্পর্কে ধরে উপযুক্ত লোক খুঁজে খুঁজে বের করে। এ কারণে এ দেশে যারা কনসালট্যান্ট, তারাই বছরের পর বছর কনসালট্যান্সি করে যায়।
মন্দের ভালো হবে যদি সরকার রিটায়ার্ড অফিসারদের এখানে জড়ো করে। তবে সেটি ১৫ বছর আগের অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে হবে না। সেটি হতে হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মধ্যে যারা চাকরি থেকে বিদায় নিয়েছেন তাদের দিয়ে। দুই বছর আগে একজন সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার যদি অবসরে যান, তাকে এনে পিডি করা হলে সমস্যা হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যারা অবসরে গেছেন, তাদের ওপর সরকার আস্থা রাখতে পারছে না বলেই এত নিয়ম বদলানোর পালা চলছে।
পিডির বিষয়টি এত আলোচিত কেন? কারণ প্রশাসনে নানা ঘটনা ঘটছে। সরকার মাত্রই ১১ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে এসব পদে কখনোই রাজনীতিবিদের নিয়োগ হয়নি। এতে আইনি বাধা নেই, তবে প্রশ্নে ভরপুর। আমলারা অনিয়ম করলে তাদের ধরার জায়গা অনেক। শেষ পর্যন্ত পেনশন আটকে দেওয়া যায়। রাজনীতিবিদদের ধরা হবে কীভাবে? একই প্রশ্ন পিডির বেলায়ও। এগুলো যে দলীয়করণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশাসন পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব থাকে ব্যাপক। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর সময় এসেছে আমলা এবং রাজনৈতিক দুপক্ষেরই।
লেখক: ডেপুটি এডিটর, আগামীর সময়





