সরকারের আকার আর কত বাড়বে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নতুন কাঠামোয় পেছনের দিকের গ্রেডের বেতন বেড়েছে বেশি। এজন্য বাহাবা পাবে সরকার। কারণ, অন্য কমিশনের তুলনায় এবার একটু বেশিই বেড়েছে। নিম্ন পদের কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে বৈষম্য কমিয়ে আনার চেষ্টা আপাতদৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। আয়বৈষম্যও সংকুচিত হবে। কিন্তু বেতন কাঠামো কি শুধু বৈষম্যের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে বড় একটি প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়। এ কাঠামো কতটা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান কমে আসাকে তাই একমাত্র ইতিবাচক সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বেতন কাঠামো নির্ধারণে দায়িত্ব, দক্ষতা, যোগ্যতা এবং কাজের জটিলতার বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রশাসনের নিম্ন স্তরের বিপুলসংখ্যক পদ নিয়ে নতুন করে ভাববার সময়ও এসেছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে একসময় যে কাজের জন্য একাধিক কর্মচারী প্রয়োজন হতো, এখন তার অনেকটাই অনায়াসে করা যায়। ই-ফাইলিংয়ের প্রসারে চতুর্থ শ্রেণির সহায়ক কর্মচারীদের কাজের প্রাসঙ্গিকতা কমেছে। বিশেষ করে কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহায়ক ও অন্যান্য সহায়ক পদে জনবল কাঠামো সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না— তা পর্যালোচনা জরুরি। প্রয়োজনে সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন করতে পারে। বিএনপি সরকার ২০০১-০৬ মেয়াদে সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক হাফিজ উদ্দীন খানের নেতৃত্বে এ ধরনের কমিশন করেছিল। তাদের পরামর্শে বিভিন্ন সংস্থা বিলুপ্ত হয় এবং একাধিক প্রতিষ্ঠান একীভূত হয়। রাজনৈতিক রেষারেষিতে পরে তা এগিয়ে নেওয়া হয়নি।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণের অর্থ কর্মচারী ছাঁটাই? অবশ্যই তা নয়। স্বাভাবিক অবসর বা অন্যান্য প্রচলিতভাবে পদ শূন্য হওয়ার পর প্রয়োজনের অতিরিক্ত পদে নতুন নিয়োগ না দিয়ে ধীরে ধীরে জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা যায়। একই সঙ্গে একজন দক্ষ কর্মী যাতে একাধিক কাজ সামলাতে পারেন, সে ধরনের আধুনিক অফিস ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার।
অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নত দেশে কমিয়ে আনা হচ্ছে সহায়ক কর্মীর সংখ্যা। জোর দেওয়া হচ্ছে পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মব্যবস্থায়।
জনতুষ্টির জন্য বেতন কাঠামো পরিবর্তন করা সহজ। কঠিন হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে একজন কর্মচারীর বেতন তার দায়িত্ব, দক্ষতা ও অবদানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে
তবে বেতনবৈষম্য কমানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। নিম্ন পদের কর্মচারীদের বেতন দক্ষতা ও দায়িত্বের তুলনায় বেশি হয়ে গেলে তা নতুন বিপদ ডেকে আনে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম থাকলে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনে মেধা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। সরকারি চাকরির বেতন কাঠামো এমন হওয়া উচিত— যাতে অধিক দায়িত্ব ও দক্ষতার যথাযথ আর্থিক মূল্যায়ন হয়। পদের গরিমা নষ্ট না হয়।
এখানে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সাধারণত দায়িত্ব, দক্ষতা ও ফলাফলের সঙ্গে পারিশ্রমিকের একটি সম্পর্ক থাকে। কারণ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, সীমিত জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা।
সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের সেবা দেন ঠিকই; কিন্তু তাদের বেতন-ভাতা শেষ পর্যন্ত জনগণের করের অর্থ থেকেই আসে। সরকার তাদের বাড়তি বেতন দিতে হয় ঋণ করবে অথবা অতিরিক্ত টাকা ছাপাবে। দুটোই মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। এর সহজ ও সহনশীল সমাধান হচ্ছে রাজস্ব বাড়ানো। সেটা কোথা থেকে আসবে? এই আমজনতার পকেট থেকে। তবে সরকার এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে উঠতে সাহায্য করার কৌশল নিতে পারে। প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপ করলে তারা বেশি আয় করবে এবং বেশি কর দেবে।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কোন পদ প্রয়োজন, কোন পদ প্রযুক্তির কারণে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে, কোথায় জনবল কমানো সম্ভব, কোথায় দক্ষ জনবল বাড়ানো দরকার— এসব প্রশ্নের উত্তরও একই সঙ্গে খুঁজতে হবে।
জনতুষ্টির জন্য বেতন কাঠামো পরিবর্তন করা সহজ। কঠিন হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে একজন কর্মচারীর বেতন তার দায়িত্ব, দক্ষতা ও অবদানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। রাষ্ট্রও সেই ব্যয় বহন করতে পারবে। আধুনিক প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ সেখানেই।
বেতন পুনর্নির্ধারণ করতেই হবে। সারা বিশ্বেই তা করা হয়। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বেতন কাঠামো এখনো পিছিয়ে। তবে নতুন কাঠামো ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে জিনিসপত্রের বাড়বাড়ন্ত এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে এ স্তরের মূল্যস্ফীতি ঘটার কথা নয়। বাজার শুধু সরকারি কর্মচারীদের কেনাকাটার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা পুরো দেশের জনগণের সামগ্রিক চাহিদার ওপর পরিচালিত হয়। তা সত্ত্বেও কেন প্রতিবার বাজার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তা এক গভীর অর্থনৈতিক ও বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
তবে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সরকারের আকার ও প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। একজন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়ার অর্থ হলো, গড়ে আগামী ৩৫ বছর তার বেতন-ভাতা বহন করা এবং পরবর্তী ১৫ থেকে ২০ বছর তার পেনশনের চাপ বহন করা।
পেনশনসহ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সেজন্যই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা দরকার। পুলিশ কনস্টেবল বা নার্সদের মতো যেখানে প্রয়োজন সেখানে লোক বাড়ানো যেতে পারে। আমরা ডাক্তার নিয়োগ দিচ্ছি অথচ হাসপাতালে বসার জায়গা বা ফ্যাসিলিটি নেই। টেকনোলজিস্ট খুবই সীমিত। কাজেই বিষয়গুলোতে সমন্বয় থাকা দরকার।
পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া গণহারে লোকবল নিয়োগ দিলে তা রাজস্ব খাতের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করে। তা ছাড়া সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি-দুরাচার নিম্নস্তরের পদগুলোতে নিয়োগ কেন্দ্র করেই। চতুর্থ শ্রেণির একটি বড় নিয়োগে অনেক নেতা কানাকড়ি থেকে কোটিপতি বনে যান। ছিটেফোঁটায় সাঙ্গোপাঙ্গরাও ফুলে-ফেঁপে ওঠে। যে বেশি টাকা দেয় তার নিয়োগটাই এগিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের চেয়ে বিরোধী দলের কর্মীরা এগিয়ে থাকে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা তার নিজ দলের কর্মীকে চাকরি দিয়ে খুব বেশি টাকা দাবি করতে পারে না। এ ফর্মুলায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অগণন কর্মী প্রশাসনে ঢুকে পড়েছে।
সরকারের আকার বড় হওয়া কোনো সাফল্যের মাপকাঠি নয়। দ্রুত ও মানসম্মত সেবা দিতে পারাটাই সাফল্য। রাষ্ট্রের অর্থ সীমিত, মানুষের প্রত্যাশা অসীম। সেই সীমিত অর্থে আরও বেশি মানুষ নিয়োগ দিয়ে সরকারকে বড় করার চেয়ে প্রযুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে সরকারকে ছোট, দ্রুত এবং কার্যকর করাই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়





