খারাপ নজিরকে অনুসরণ করল বিএনপিও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চলতি মাসের ১০ তারিখে শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনটি দুটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ১. এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে এবং ২. সংসদ ও সব মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন সম্পন্ন হয়েছে।
সংসদ যে আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়, সেই কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান জাতীয় সংসদে তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই সব স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। কারণ সর্বশেষ ২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন অষ্টম সংসদের অধিবেশন শুরুর প্রায় দেড় বছর পর সপ্তম অধিবেশনে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলো গঠিত হয়, যা নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। কারণ তখন কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ব্যাপারে কোনো সময়সীমা ছিল না।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ২৬ সেপ্টেম্বর সংশোধিত কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, কোনো নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে সব সংসদীয় কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা অারোপ করা হয়।
২০০৯ সালে গঠিত নবম সংসদ থেকে শুরু করে পরবর্তী সংসদগুলোতে এই বিধি অনুসারে সব সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত সংসদের মাধ্যমে সংশোধিত বিধি আওয়ামী লীগ মেনে চলেছে।
তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ সত্ত্বেও কার্যপ্রণালি বিধির সংসদীয় কমিটি-সংক্রান্ত বিধি সব দলের সরকারই মেনে চলে। এটা একটা বড় অর্জন।
বিধি সংশোধনের পর অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার আমাকে বলেছিলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই এবং বিশেষ করে আমলাতন্ত্র চায় না সংসদীয় কমিটি দ্রুত গঠন হোক, কার্যকর থাকুক। সংসদীয় কমিটি গঠন যত বিলম্বিত হবে, নির্বাহী বিভাগ তত জবাবদিহির বাইরে থাকবে। অার মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে, সে অন্যের কাছে জবাবদিহি করতে চায় না।’
আওয়ামী লীগ আমলে হুইপকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। বিএনপি এবার চিফ হুইপ, মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাকে এবং অন্য হুইপদের কমিটির সভাপতি ও সদস্য নির্বাচিত করল, যা একটি খারাপ নজিরকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করল
তিনি আরও বললেন, ‘এই সংসদের অন্যতম অর্জন হলো কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধন করে সব সংসদীয় কমিটি গঠনের জন্য ক্ষমতাসীন দলকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া। অতীতে যেহেতু সংসদীয় কমিটি গঠনের ব্যাপারে কোনো সময়সীমা ছিল না, সেহেতু ক্ষমতাসীন দল কমিটি গঠনে গড়িমসি করত। আমরা বিধি সংশোধন করে দিয়ে গেলাম। তুমি লিখে রাখো, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ এলেও কোনোদিন এই বিধি সংশোধন করে আগের অবস্থায় যেতে পারবে না। যদি কেউ এই বিধি সংশোধন করতে যায়, তাহলে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়বে, প্রেসের ক্রিটিসিজমের মুখে পড়বে। একটি নির্বাচিত সরকার কখনো এমন ভুল করতে যাবে না। এভাবেই সংসদীয় প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়।’
তবে বিধি অনুসারে সংসদীয় কমিটি গঠিত হলেও কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বেশ বাজে একটি নজির স্থাপন করল বিএনপি। এবার বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে প্রধান হুইপ, হুইপবৃন্দকে এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাকে, যা কার্যপ্রণালি বিধির স্পৃহা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংসদের কাছে নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ১৯৯৬ সালে মন্ত্রীদের পরিবর্তে বেসরকারি সদস্যদের সভাপতি করার বিধান কার্যপ্রণালি বিধিতে সংযোজন করা হয়। সে মোতাবেক সব সংসদেই যিনি মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রী নন অথবা মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রীর পদমর্যাদার সংসদ সদস্য নন—তাদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এ ব্যবস্থার ফলে সংসদে নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি পথ উন্মুক্ত হয়।
নবম জাতীয় সংসদে হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটনকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো হয়। বর্তমান সংসদেও প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে করা হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি, যা নজিরবিহীন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর কোনো প্রধান হুইপ অথবা হুইপকে কোনো সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত করা হয়নি। প্রধান হুইপ পদাধিকার বলে সংসদ কমিটির প্রধান। এই কমিটি সংসদ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
প্রধান হুইপ পদটি মন্ত্রী পদমর্যাদার। তিনি হলেন সংসদের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের যোগসূত্র। সংসদীয় কার্যক্রমে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের পক্ষে কাজ করেন। প্রধান হুইপ এবং অন্য সরকারি হুইপরা প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুসারে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে পতাকাসহ গাড়ি, বাড়ি ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সুবিধা পেয়ে থাকেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নীতি ও নিয়মকানুন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কাজ করে এই কমিটি। সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থেকে কীভাবে প্রধান হুইপ, উপদেষ্টা ও হুইপরা নিরপেক্ষতার সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন— সেটি পরিষ্কার নয়। কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে এমন কোনো সংসদ সদস্য কমিটিতে নিযুক্ত হবেন না যার ব্যক্তিগত, আর্থিক ও প্রত্যক্ষ স্বার্থ কমিটির কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
এ ব্যাপারে সংসদের একজন পদস্থ ব্যক্তি গত সপ্তাহে আমাকে বললেন, সংসদীয় কমিটি গঠনে কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘিত হওয়ার বিষয়টি আমি স্পিকারের নজরে নিয়ে আসি। তিনি আমার সঙ্গে একমত পোষণ করে সংসদে একটি রুলিং দিয়ে বলেছেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যেন হুইপ অথবা অন্য কোনো সরকারি সুবিধাভোগী কোনো সদস্যকে প্রধান অথবা অন্তর্ভুক্ত করা না হয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরদিন সংসদীয় কমিটি গঠনে চিফ হুইপকে একটি কমিটির প্রধান করা হলো এবং হুইপদের অন্যান্য কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আমলে হুইপকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। বিএনপি এবার চিফ হুইপ, মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাকে এবং অন্য হুইপদের কমিটির সভাপতি ও সদস্য নির্বাচিত করল, যা একটি খারাপ নজিরকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করল।
লেখক: সাংবাদিক



