ছাত্ররাজনীতিকে সুস্থধারায় আনা কি সম্ভব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অনেক মহার্ঘ্য নির্বাচনের ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ‘ডাকসু’র এক বছর পূর্ণ হয়েছে। আরও চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদেরও মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে কয়েক দিনের ব্যবধানে। নির্বাচনগুলোকে মহার্ঘ্য বিবেচনার কারণ হলো বহু বছর শুধু নয়, কয়েক দশকের প্রতীক্ষিত ও কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজনীয় নির্বাচন ছিল এগুলো। হয়েছে দীর্ঘ সময় পর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-গণআন্দোলনে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই এই নির্বাচনগুলো সম্ভব হয়েছে। এক বছরে এই ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ কেমন কাজ করল, এরপর প্রতি বছর সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে কি না প্রভৃতি নানা দিক নিয়ে পর্যালোচনা হওয়া আবশ্যক। এক লেখায় তা সম্ভব নয়। শুধু একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন তুলে ধরব। মূল যে কারণে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছিল, সেই ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি’র অবসান ঘটানো কি সম্ভব? ছাত্ররাজনীতিকে কল্যাণকর সুস্থধারায় আনা সম্ভব?
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রদের একস্ট্রা কারিকুলামের অ্যাক্টিভিটি বা শিক্ষাক্রমবহির্ভূত অতিরিক্ত কাজের মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন, সাহিত্য-সংস্কৃতি-ক্রীড়া চর্চা সংগঠিত করার যোগ্যতা অর্জন প্রভৃতির অনুশীলনের জন্য ছাত্র সংসদ। প্রতি বছর নির্বাচন হওয়ার কথা। ব্রিটিশ আমলে ব্যবস্থাটির জন্ম।
২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর, ছয় বছর পর। এর আগে ২০১৯ সালে নির্বাচন হয়েছিল ২৯ বছর পর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জাকসু’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাকসু’, চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ে ‘চাকসু’ নির্বাচন হয় ৩৫ বছর পর গত বছরের ১৫ অক্টোবর। আর জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ২১ বছর পর প্রথম ‘জকসু’ নির্বাচন হয় চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি। জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৭ সালে।
এই পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তথা বুয়েটের ছাত্র সংসদ ‘ইউকসু’ ২০ বছর ধরে অকেজো। ২০১৯ সালে আবরার নামে এক ছাত্র ‘দলীয় কারণে’ নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার পর ছাত্রসংগঠনের কাজই শুধু নিষিদ্ধ নয়; ছাত্রছাত্রীরা সংসদের নির্বাচনই চায় না বলে জানান। দেশের নামকরা পুরনো বড় বড় কলেজ, যেমন— কারমাইকেল, ব্রজমোহন, মুরারিচাঁদ, আজিজুল হক, রাজশাহী, রাজেন্দ্র প্রভৃতিতে ৩০-৪০ বছরের আগে ভালো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতো। এখন আর হয় না।
এতদিন নির্বাচন না হওয়ার জন্য প্রধানত বা বলা যায় একমাত্র দায়ী রাজনৈতিক দলগুলো ও রাজনৈতিক নেতারা। রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্গ সংগঠন বা সহযোগী সংগঠন নামে অনুগত ছাত্রসংগঠনগুলোকে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী বানিয়ে ক্যাম্পাসগুলো দখলে রাখতে চেয়েছে। সে জন্য কর্মীদের যথেচ্ছ চাঁদাবাজি ও গুণ্ডামি করার লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে দল যখন ক্ষমতায়, তখন সেই দলের পেটোয়া সংগঠনের ক্যাডাররা ছাত্রাবাসে আসন বণ্টনের মতো কর্তৃপক্ষীয় কাজ নিজ হাতে তুলে নিয়েছিল। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন করে বা শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ছাত্রদের দিয়ে কিছু সাহিত্য-সংস্কৃতি-ক্রীড়া সংগঠিত করার কাজ সীমিতভাবে চালানো হলেও শিক্ষাক্রমবহির্ভূত এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ধ্বংস হয়ে গেছে।
১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনধারা শুরু হওয়ার পর থেকে ৩৫ বছরে কয়েকটি ক্যাম্পাসে খুনোখুনিতে অন্তত ১৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার অধিকাংশের বিচার হয়নি। বিশ্বের আর কোথাও রাজনীতিবিদরা নিজ দেশের শিক্ষাঙ্গন ও ছাত্রসমাজের এত বড় ক্ষতি করেছেন কি না, বলা দুষ্কর
পরিতাপের বিষয়, ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনধারা শুরু হওয়ার পর থেকে ৩৫ বছরে কয়েকটি ক্যাম্পাসে খুনোখুনিতে অন্তত ১৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার অধিকাংশের বিচার হয়নি। বিশ্বের আর কোথাও রাজনীতিবিদরা নিজ দেশের শিক্ষাঙ্গন ও ছাত্রসমাজের এত বড় ক্ষতি করেছেন কি না, বলা দুষ্কর।
তবে ১৯৪৮-৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে আমাদের ছাত্রদের আন্দোলন সত্যিই গৌরবের ছিল। পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তারা বীরত্বপূর্ণ লড়াই পরিচালনা করেছে, আত্মদান করেছে। তখন বলা হতো ছাত্র আন্দোলন। পরে যখন ছাত্রকর্মীরা রাজনৈতিক দলের পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত হয়, রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন থেকে বলা হতে থাকে ছাত্ররাজনীতি। দলীয় লেজুড়বৃত্তির এই ছাত্ররাজনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রসমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১৫ বছরব্যাপী জাতীয় নির্বাচনকে কারচুপিতে ডুবিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী শাসনে ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অনেক জায়গায় সাধারণ ছাত্ররাই লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে।
ছাত্রদের জুলাই আন্দোলন শুরু হলে এক পর্যায়ে ওই সময়কার দখলদার ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে বিতাড়িত হয় এবং ছাত্রদের দাবির মুখে তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল ১৭ জুলাই গভীর রাতে ছাত্র সমাবেশে ঘোষণা করেন, হলগুলোতে দলীয় ছাত্রসংগঠনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হলো। সরকার উৎখাতের পর নিযুক্ত উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের সময় ওই বছর সেপ্টেম্বরে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা হয়। সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মেডিকেল কলেজসহ ৩২টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের আইনগত বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে এখন অনেক আলোচনা শুরু হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের পর লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি আবার ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না বা কত দিন যাবে, তা সন্দেহের বিষয়। এখন তো সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন যথাক্রমে ছাত্রদল ও শিবির সারা দেশে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। ডাকসুর সহসভাপতি মো. আবু সাদিক কায়েম ও সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয়ী শিবিরের নেতাকর্মীরা নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি রেখে ও বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলে এক কলঙ্কজনক ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। জুলাই আন্দোলনের সংগঠক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফা দাবিনামায় দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ছিল, অথচ তারাই এখন তাদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ছাত্র অঙ্গ সংগঠন বানিয়েছে; নাম ছাত্রশক্তি।
কাজেই এত রক্তপাত, এত সংঘাত ও দুঃসহ অভিজ্ঞতার পর লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি পরিহার করা যাবে কি না, বলা যায় না।
যে অধিকার ও আইনের প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তার জবাবে বলা যায়, অবশ্যই নাগরিকদের সংগঠন করার অধিকার একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার ও ভোট দেওয়ার অধিকারী। দুটো অধিকারই রাখতে হবে, তবে শিক্ষা ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ ধ্বংস করে নয়। দেশের কল্যাণে, অধিকার রক্ষায়, সামাজিক ও মানবিক অগ্রগতির নানা কর্মসূচি নিয়ে ছাত্ররা দেশব্যাপী সংগঠন করবেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও ছাত্রাবাসে সেই সংগঠনের শাখা ও নিয়মিত কার্যক্রম থাকবে না। ক্যাম্পাসে করবেন অরাজনৈতিক ক্লাব, বিতর্ক সভা ইত্যাদি। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদের নির্বাচন হবে এবং সেখানে অংশগ্রহণই শিক্ষার্থীদের পাঠ-অতিরিক্ত সাংস্কৃতিক কাজ। ছাত্ররা নিজ নিজ পছন্দের রাজনৈতিক দলের সদস্য হবেন, তবে তার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক দল ছাত্র ব্রিগেড গঠন করতে পারে। তারা সারা দেশেই দলীয় কাজ করবে। জাতীয় নির্বাচনের সময় ওই ব্রিগেড সদস্যরা শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য ক্লাসে ঢুকে দলীয় প্রচার চালাতে পারে। তবে রাজনৈতিক দল ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-ছাত্র ইউনিয়নের মতো জাতীয়ভিত্তিক ছাত্র গণসংগঠনকে নিজেদের দলীয় ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ও ব্যবহার করতে পারবে না।
এগুলো কোনো অবাস্তব চিন্তা নয়। পাশ্চাত্যের উন্নত দেশে শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলন আছে, কিন্তু কোনো দলীয় ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী নেই।
লেখক: বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক




