সরকার স্থিতিশীল তাই বিএনপির রাষ্ট্রপতির সময় হয়েছে

গণঅভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক সংকট এড়াতে মো. সাহাবুদ্দিন নয়, রাষ্ট্রপতি পদের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিএনপি। যেহেতু গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের কারণে দেশের প্রায় সব সাংবিধানিক পদের দায়িত্বশীলরাই পালিয়ে গেছেন, এতে সাংবিধানিক একটা শূন্যতা দেখা দিয়েছিল সব জায়গাতেই। সে জায়গা থেকে বের হওয়ার জন্য অন্তত একটা উপায় তো দরকার ছিল। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অথবা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য ওই পদটাকে অব্যাহত রাখার গুরুত্ব ছিল। তা ছাড়া গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই পদটা তো ৫ আগস্টের পর একধরনের স্থিতিশীলতা লাভ করেছিল। সে কারণেই এবং রাষ্ট্রপতি পদের সম্মানের জন্যই বিএনপি তার পাশে ছিল। এটার অর্থ এই নয়— বিএনপি ব্যক্তি মো. সাহাবুদ্দিনের পাশে ছিল; আমার কাছে মনে হয়, বিএনপি ছিল রাষ্ট্রপতি পদের পাশে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই বিএনপি একটা নির্বাচন এবং নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার চেয়েছিল। যেহেতু শূন্যতাটা হতো সর্বোচ্চ, এখানে যদি স্পিকার থাকতেন অথবা অন্য কেউ থাকতেন, তাহলে হয়তো সেটা ডিফারেন্ট (ভিন্ন) হতো।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যেভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তখনো কিন্তু তাকে নিয়ে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি তার প্রিভিয়াস (অতীত) ক্যারিয়ার নিয়ে, প্রিভিয়াস কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক বেশি বিতর্ক হয়েছে। এমনকি তাকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে খোদ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মধ্যেও। সেখান থেকে একটা লোক কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদের পক্ষে যেভাবে ছিলেন এবং কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ হিসেবে তার যে অবস্থান ছিল, সে জায়গা থেকে তার ভাগ্য ভালো যে— রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক যে নিয়মকানুন, রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক যে ইমিউনিটি— সে কারণে তিনি একটা বড় বেনিফিট পেয়েছেন। এটা ব্যক্তি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পাননি, পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
ফ্যাসিবাদী সরকারের যে টিম, সেই টিমের তুলনায় তো উনার বিদায় অনেক বেশি সুন্দর হয়েছে, অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে— অন্তত পদত্যাগ করতে পেরেছেন। যেখানে অন্যদের পালিয়ে যেতে হয়েছে, তাকে তো পালাতে হয়নি। শুধু রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক গুরুত্ব এবং সংকটকালে তার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যে প্রয়োজনীয়তা, সে কারণেই তাকে তৎকালীন সরকারপ্রধান বা আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের মতো পরিণতি ভোগ করতে হয়নি।
বিএনপি সরকার মো. সাহাবুদ্দিনকে কোনো এক্সিট দেয়নি। তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং অসুস্থতাটা আস্তে আস্তে বেড়েছে। এখন তিনি চলে যেতে চান। বিএনপিও তাদের সরকারের একটা স্থিতিশীলতা চেয়েছিল। সরকারও বর্তমানে একটা স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, এখন তাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে তারা একটা গণতান্ত্রিক সরকার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি চায়। আবার সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও এখন যেতে চান তার অসুস্থতার কারণে। দুটা একসঙ্গে মিলে গেছে, তাই এখন পারফেক্ট টাইম হয়েছে দুপক্ষের জন্য। দুপক্ষই অ্যাকসেপ্ট (গ্রহণ করা) করেছে, তাই সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও যেতে পেরেছেন, বিএনপিও এটা অ্যাকসেপ্ট করেছে। এখানে আসলে অন্য কিছু আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না।
তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের সময়কার তার যে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, বিচারক হিসেবে থাকাকালে অথবা দুর্নীতি দমন কমিশনে থাকাকালে তার যে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আছে— এসব বিষয়ে অভিযোগ তো ভবিষ্যতেও উঠতে পারে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের যেখানে বিচার হয়েছে, সেখানে তো পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুরও বিচার হতে পারে— কেউ যদি অভিযোগ করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদে থাকার কারণে, পদে থেকে কোনো কর্মকাণ্ড করার কারণে কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তার বিচার করা বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সম্ভব নয়। কারণ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে থাকা অবস্থায় তার সিদ্ধান্তের জন্য কোনো বিচার হয় না।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে, মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপির অনেক চিন্তাভাবনা করা উচিত। বিএনপির রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-মনোনয়নের ইতিহাস অধিকাংশ সময়ই সুখকর নয়। অতীতে বিএনপি দল থেকে মনোনয়ন দিলেও যেমন সুখকর হয়নি, দলের বাইরে পেশাজীবীদের থেকে দিয়েও কিন্তু সুখকর হয়নি। এ কারণে পরবর্তী রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিকে অনেক বেশি ভাবতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে অধিকাংশ সময়ই তারা দলের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি অথবা দলের সঙ্গে সদাচরণ করতে পারেনি; কিংবা দলের সঙ্গে বিট্রে (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছেন— শুধু রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছাড়া। এ ছাড়া আরও দুয়েকজন আছেন, তারা ছাড়া বাকিরা বিএনপির মিশন-ভিশন ধারণ করতে পারেননি; বরং বিএনপির প্রতি অন্যায় করেছেন। অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি পদটাকে অপব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি হয়েও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বিএনপির সঙ্গে ন্যায়বিচার করতে পারেননি।
মনে রাখা দরকার— রাষ্ট্রপতি পদের যে ভার, সেই ভার অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সিলেকশন না হওয়া অর্থাৎ যথার্থ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে না বসানোর কারণে রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্কও হয়েছে।
লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং পরিচালক, উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




