আহাম্মকির ইতিবৃত্ত

একটা লোক কত বুদ্ধিমান, তা মাপা যায়। মাপার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে। কিন্তু একটা লোক কতটা আহাম্মক, তা পরিমাপ করা কি সম্ভব?
এর সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো, সম্ভব না। কারণ, আমরা আহাম্মকিকে কোনো স্বাধীন আচরণগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখি না। আহাম্মকি আমাদের কাছে হলো বুদ্ধির অনুপস্থিতি। যার বুদ্ধি যত কম, সে তত আহাম্মক বা গর্দভ বা বুরবক।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বিখ্যাত আহাম্মকের নাম বোধ করি নাসিরুদ্দীন হোজ্জা, যার জন্মস্থান উজবেকিস্তানের বুখারায় আমি গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, গাধার পিঠে চেপে তার হেঁটে যাওয়ার একটা ভাস্কর্য রাখা আছে পাবলিক স্কোয়ারে। তার নামে বুখারায় একটি রাস্তারও নাম রাখা হয়েছে। বাংলা ভাষায় উজবেকিস্তানের অধিবাসীদের আমরা উজবেক বলি। আবার উজবুক মানে আহাম্মকও বোঝায়। এটা কীভাবে হলো, হোজা নাসিরুদ্দীনের সঙ্গে এর কোনো যোগ আছে কি না, কে জানে। মানুষের আহাম্মকি বড়জোর কিছু হাস্যরসের জন্ম দিতে পারে। তবে ইদানীং দেখছি, সিরিয়াস রাজনৈতিক-দার্শনিক আলোচনায় আহাম্মকি বা স্টুপিডিটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে বইপত্রও লেখা হচ্ছে বিস্তর। সভা-সেমিনারে এ নিয়ে বক্তৃতা করছেন বিদ্বজ্জনেরা।
আহাম্মকি কী করে সিরিয়াস আলোচনার টেবিলে চলে এলো?
এ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন জার্মান ধর্মতাত্ত্বিক ডিয়েট্রিশ বনহফার। ১৯৪০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে তিনি তখন জেলখানায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বনহফার দেখলেন, চোখের সামনে তার বন্ধু-বান্ধব, কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা সবাই চোখ-কান বন্ধ করে রেখেছেন। দেশ রসাতলে যাচ্ছে; কিন্তু তারা যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। এটা কেন ঘটছে, ভাবতে গিয়ে জেলে বসে বনহফার লিখে ফেললেন এক দার্শনিক গ্রন্থ ‘অন স্টুপিডিটি’। তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, আহাম্মকি মানুষের একটা বিশেষ ধরনের চারিত্রিক আচরণ, যেটা শয়তানির চেয়ে ভয়ংকর। কারণ শয়তানি চেনা যায় এবং সে কারণে তা প্রতিরোধও করা সম্ভব। কিন্তু আহাম্মকি চেনা যায় না। আর সে কারণে তা সমাজের অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারে। কারণ আহাম্মকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যায় না। কারণ আহাম্মকেরা যুক্তি-বুদ্ধির ধার ধারে না। তথ্য এবং উপাত্ত চোখের সামনে যে জাজ্বল্যমান সত্য তুলে ধরছে, আহাম্মকরা তা দেখেও না দেখার ভান করে। নাৎসিরা দেশটা ছারখার করে দিচ্ছে, আহাম্মক বুদ্ধিজীবীরা তা দেখেও দেখছেন না।
বনহফারের মতে, আহাম্মকি ব্যাপারটা বোকামির চেয়ে ক্ষতিকর। একটি বোকা লোক সমাজের তত ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। আহাম্মকরা রাখে। কারণ অধিকাংশ সময় আহাম্মকরা বুদ্ধিমান হয়।
বনহফারের তত্ত্ব তার তখনকার জার্মানি নিয়ে কোনো হা-হুতাশ ছিল না। তিনি দেখালেন, আহাম্মকি একটা সর্বজনীন সমস্যা। দেশে দেশে, কালে কালে এটা মানব সমাজকে সংকটে ফেলে।
বনহফারের পর ১৯৭৬ সালে কার্লো সিপোলা নামের এক ইতালীয় দার্শনিক আহাম্মকিকে একটা প্রায় গাণিতিক তত্ত্বের রূপ দিয়ে ফেলেন। তিনি দেখান, স্বার্থপর লোকরা এমন কাজ করেন, যাতে নিজের লাভ হয়, আর অন্যের ক্ষতি হয়। কিন্তু আহাম্মক হচ্ছে সেই লোক, যে এমন কাজ করে, যাতে নিজের কোনো লাভ হয় না, অথচ অন্যের ক্ষতি হয়।
কয়েক বছর ধরে দেখছি আহাম্মকি নিয়ে পশ্চিমে বেশ কয়েকটি দার্শনিক বই বেরিয়েছে। গত বছর স্টুয়ার্ট জেফ্রিয়েস তার ‘আ শর্ট হিস্ট্রি অব স্টুপিডিটি’ বইতে সক্রেটিসের সময় থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাল পর্যন্ত আহাম্মকির ইতিবৃত্ত তুলে ধরে দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আহাম্মকি একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
উইলিয়াম সকোলফ নামের আরেক দার্শনিক ‘ইন ডিফেন্স অফ স্টুপিডিটি’ বইতে জানাচ্ছেন, আহাম্মকির নানান রকমফের আছে। কিছু কিছু আহাম্মকি প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবেও দেখা দিতে পারে। এ বছর নরওয়েজীয় দার্শনিক লারস ভেন্ডসেন লিখেছেন ‘স্টুপিড ইডিয়টস: আ ফিলোসফি অব স্টুপিডিটি অ্যান্ড কমপ্লিট অ্যান্ড আটার ডাউনরাইট ইডিয়সি’ নামে একটি বই।
দেখা যাচ্ছে, বহু বছর আগে বনহফার জেলে বসে যে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন, সে আলোচনা থেমে তো যায়নি; বরং দিনকে দিন তা নিয়ে চর্চা বাড়ছে। কারণ মানুষের সম্মিলিত আহাম্মকি আরও প্রকট হয়ে উঠছে। আজকের বিশ্বে দেশে দেশে স্বৈরশাসকদের উত্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য আর খবরের ছড়াছড়ি যেন পুরো মানব সমাজকে এক বিকট আহাম্মকির সামনে দাঁড় করিয়েছে।



