স্মরণ
অবদানের কারণেই কি তাকে নিয়ে বিতর্ক বেশি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত নাম সিরাজুল আলম খান। তাকে নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের অনেকেই বিতর্ক করেন, আবার বিতর্ক করেন স্বাধীনতাবিরোধীরাও। এ দেশের রাজনীতিতে নীতিহীন অনেক নেতারই আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু সেসব নেতা অনেকেই থেকেছেন বিতর্কের বাইরে। যদিও ওই নেতাদের থেকে ভিন্ন রাজনীতি করতেন সিরাজুল আলম খান। সাফল্যের অংশীদারত্বের বিষয়েই স্বাধীনতার পক্ষের লোকেরা সিরাজুল আলম খানের সমালোচনা করেন। আর স্বাধীনতাবিরোধীরা পরাজিত হওয়ার যন্ত্রণা থেকে। সিরাজুল আলম খান স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। সেই স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত ছিল শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
সিরাজুল আলম খান সামনের কাতারে থেকে রাজনীতি করছেন খুব কম সময়। ছাত্রলীগের রাজনীতির সময়েই তাকে সামনের কাতারে দেখা গেছে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫— এ দুই বছর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ, দূরদর্শী চিন্তার এক সৃজনশীল ছাত্রনেতা। ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের ভেতরে গড়ে তোলেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। ছাত্রলীগের পাল্টা বা বিরোধী কোনো সংগঠন নয়, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরেই এক গোপন সংগঠন। তার এ তৎপরতাকে অনেকেই নিছক অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং মনে করতেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এ সংগঠন। সঙ্গে নিয়েছিলেন সহযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদকে। এ সংগঠনকেই বলা হয় স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল লক্ষ্য।
ছাত্রলীগের নেতৃত্ব শেষ করেই সিরাজুল আলম খান প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে যথাসাধ্য সরে আসেন। পরে শ্রমিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। এই শ্রমিক রাজনীতি করাও ছিল তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন থেকে একটি উদ্ধৃতি দেওয় যায়— ‘সিরাজের সঙ্গে আবার আমার যোগাযোগ বেড়ে যায় চার বছর পর, ১৯৬৬ সালে, ছয়দফা ঘোষণার পর পর। প্রায়ই ও ৫১ পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগ অফিসে আসতো। ৩২ নম্বরের বাসায় ফেরার পথে আমি ওকে ধানমণ্ডির কোথাও নামিয়ে দিয়ে যেতাম। গাড়িতে যেতে যেতে অনেক বিষয়ে আলাপ হতো ওর সঙ্গে। সিরাজ আওয়ামী লীগকে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী। ও আর ছাত্রলীগ করতে আগ্রহী নয়— কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগ গড়ে তুলতে চায়। এর দরকার আছে বৈকি। আমার বিশ্বাস ছিলো, এই কাজ সিরাজই পারবে।’ প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু সিরাজুল আলম খানকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। এ সুযোগকেই রাজনৈতিক কাজে লাগিয়েছেন তিনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা নিয়েও সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একান্ত আলোচনা করেছেন। সে আলোচনায় একমত না হওয়া হয়তো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সাফল্যের অংশীদারত্বের বিষয়েই স্বাধীনতার পক্ষের লোকেরা সিরাজুল আলম খানের সমালোচনা করেন। আর স্বাধীনতাবিরোধীরা পরাজিত হওয়ার যন্ত্রণা থেকে সমালোচনামুখর। সিরাজুল আলম খান স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার
বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা নিয়ে যখন তর্ক-বিতর্ক চলছে, সিরাজুল আলম খান তখন দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছেন ছয় দফার পক্ষে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ছাত্রলীগ পালন করেছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। ছয় দফার আন্দোলনে শ্রমিকদের যে ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটে ৭ জুনের হরতাল কেন্দ্র করে, সেই ঘটনার পেছনের কারিগর ছিলেন সিরাজুল আলম খান। সদ্য ছাত্ররাজনীতি শেষ করেছেন। তাই শ্রমিক নেতা হিসেবেও পরিচিতি নেই। কিন্তু ৭ জুনের হরতাল শেষ হওয়ার পরও আদমজীর শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে অবশেষে পুলিশ সিরাজুল আলম খানকে গাড়িতে করে নিয়ে যায়। অনেকের মতে, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের দিনেই বাংলা ভাগ নিশ্চিত হয়ে যায়। একইভাবে এই ছয় দফার আন্দোলনেই প্রকৃতপক্ষে নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহে সিরাজুল আলম খান পেছন থেকে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭০ সালের ৭ জুন পল্টন ময়দানে শ্রমিক লীগ বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেবে। সেই অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় পতাকা নকশা করে ফেলেন তিনি। জহুরুল হক হলে বসে সেই পতাকার নকশা দেখে সিরাজুল আলম খান বলেন, ‘যে নামেই পতাকা প্রদর্শন করো না কেন, সে পতাকাকে জনগণের ভবিষ্যৎ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে ভেবে নিতে কোনো বাধা থাকবে না।’ পরে কলা ভবনে ২ মার্চ সেই পতাকাকেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে উত্তোলন করা হয়। স্বাধীনতার ইশতেহার প্রণয়ন ও ৩ মার্চ জাতির সামনে জানানো হয় এসবের পেছনের নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান।
মুক্তিযুদ্ধকালে গোপনে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গঠন ছিল একটি বড় উদ্যোগ। এই বিএলএফ নিয়ে অনেকেই বিতর্ক করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনীতি। সেই রাজনীতির বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দীক্ষিত করা ছিল বিএলএফের বড় কাজ। সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় আজ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে দেখা যায় স্বাধীনতার বিরোধী দলে যোগ দিতে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দ্বিমত করে সিরাজুল আলম খান গড়ে তোলেন ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ)। সিরাজুল আলম খান জাসদের কোনো পদে থাকলেন না। অথচ তিনিই জাসদের সর্বেসর্বা।
এ দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক নেতার দর্শন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আবুল হাসিম বাংলা ভাগের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির ঘোর বিশ্বাসী ছিলেন। শেরেবাংলাও অসাম্প্রদায়িক হয়ে মুসলিম লীগের সঙ্গে সরকার গঠন করলেন এবং শ্যামাপ্রসাদের মতো সাম্প্রদায়িক লোককে তার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বানালেন। এমন বিতর্ক এ দেশের সব নেতাকে নিয়েই রয়েছে। সিরাজুল আলম খানের বেলায়ও হয়তো তা প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধের পথে নিয়ে যেতে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর




