অভিযানটি যেন সফল হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে দেশব্যাপী একটি অভিযান শুরু করেছেন গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের সামনের প্লাজায় ছেলেমেয়েদের বিরাট সমাবেশ আয়োজন করে। কর্মসূচির নাম ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’। তিন মাসব্যাপী। এই নতুন ধরনের উদ্যোগের সফলতার জন্য আমাদের চেষ্টা চালাতে হবে, অংশ নিতে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে, লেগে থাকতে হবে, যেন আবেগপূর্ণ বক্তৃতাবাজিতে উদ্যোগটা শেষ না হয় বা একসময় ঝিমিয়ে না পড়ে।
উদ্বোধনের পরবর্তী সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সংবাদপত্র-টেলিভিশনে স্থানীয় পর্যায়ের টুকটাক খবর ছাড়া উৎসাহব্যঞ্জক সংবাদ পরিবেশন ও মোটিভেশন বা উদ্বুদ্ধকরণ দেখিনি। বিশ্বের এ অঞ্চলে কয়েক বছর আগে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় তা প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে তরুণদের নিয়ে জনগণকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করে দুটি বড় শহর সাফল্য পেয়েছে। কলকাতা ও সিঙ্গাপুর। এ অভিজ্ঞতার কথা আমাদের সংবাদপত্রেও এসেছে।
কয়েক বছর ধরে মারাত্মক ডেঙ্গু রোগের প্রাণঘাতী বিস্তার প্রতিরোধের জন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কর্মীদের দিয়ে গতানুগতিক কাঠামোয় ওষুধ ছিটিয়ে এ রোগটির বাহক এডিস মশা নিধনের চেষ্টা চালিয়ে খুব বেশি ফল না পেয়ে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে জোরালো অভিযান চালানোর তাগিদ অভিজ্ঞ মহল থেকে দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু নাগরিকদের মধ্যে নিজ নিজ বাসাবাড়ি, নির্মাণস্থল, ফুলের টব, ছাদবাগানে পানি জমে থাকা বন্ধ করার প্রচার চালানো ছাড়া বড় তোড়জোড় হয়নি। এডিস মশা মারার লার্ভা সাইড বা মশার ডিমনাশক এবং অ্যাডাল্টিসাইড বা উড়ন্ত মশা মারার দুই রকম ওষুধই ব্যবহার করা হয়। প্রথমটা জমে থাকা পানি, ডোবা-নালার পানিতে মেশানো হয় এবং দ্বিতীয়টা ফগার মেশিন দিয়ে ছড়ানো হয়। এ কাজে ওষুধ কেনায় আমাদের করপোরেশনগুলোতে দুর্নীতি প্রবাদপ্রতিম। সংবাদপত্রে বহু খবর বেরিয়েছে। একবার নালা-নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছেড়ে একটা চেষ্টা করা হয়েছিল। কোনো ফল দেয়নি। তাই শুধু ব্যয়বহুল ওষুধ দিয়ে মশা মারার কৌশল রোগটির বিস্তার কার্যকরভাবে ঠেকাতে পারেনি। মশা পাখা মেলে ওড়ার পর মারার চেয়ে প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করাই হচ্ছে কার্যকর পথ। নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া তা সম্ভব নয়। এর সূচনাটা হলো নতুন অভিযানটিতে।
উন্নত নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি গবেষণালব্ধ কৌশল ব্যবহার করে। পদ্ধতিটি হচ্ছে ল্যাবরেটরিতে উলবাকিয়া নামের ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ মশা প্রজনন করিয়ে তাদের প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেগুলো যে স্ত্রী মশাদের সঙ্গে মিলিত হবে, তাদের ডিম থেকে লার্ভা হবে না
ডেঙ্গু বিশ্বজনীন রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন ১২৮টি দেশে ডেঙ্গু হয়। এর ৭০ শতাংশই এশিয়ায়। এক হাজার বছর আগে চীনা মেডিকেল সাহিত্যে রোগটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে করা হতো, জলের কোনো পোকামাকড়ের কামড়ে এ জ্বর হয়। পালের জাহাজে রোগটা ক্যারিবীয় অঞ্চল ও পানামায় ছড়ায়। ১৭০০ শতকে সেখানে মহামারী হয়। হাড় ভাঙার মতো ব্যথা হওয়ায় একে হাড়ভাঙা জ্বরও বলা হতো। ১৯০০ শতকে এডিস মশা দিয়ে রোগটি ছড়ায় বলে প্রমাণিত হয় ও ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। বিংশ শতকে পূর্ব আফ্রিকার সোয়াহিলি ও ইউরোপের স্পেনীয় ভাষার শব্দ নিয়ে ডেঙ্গু বা ডেঙ্গি নামকরণ হয়। যুদ্ধ ও নগরায়ণের ফলে সারা বিশ্বে রোগটা ছড়িয়ে পড়েছে এবং এটা নগরের রোগ।
বাংলাদেশে প্রথম ১৯৬৫ সালে অল্প কয়েকজনের মধ্যে এ রোগ দেখা দেয় এবং ‘ঢাকা জ্বর’ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। মাঝে কোনো কোনো বছর অল্প রোগী পাওয়া গেলেও ২০০০ সালে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আবার বড় করে দেখা দেয় ২০১৯ সালে; ১ লাখ হাসপাতালে ভর্তি ও ১৭৯ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। ২০২৩ সালে তিন লক্ষাধিক ভর্তি ও ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় দেশের ৬২টি জেলায় রোগ ছড়িয়েছে এবং প্রথমবারের মতো ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরের রোগী বেশি। ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে এ পরিসংখ্যান আছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে পরিস্থিতি বিপজ্জনক। প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে দেড় হাজারজন। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রাভেদে বাড়ে-কমে।
ডেঙ্গু হলে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশি ও হাড়ে ব্যথা, র্যাশ, বমি, ডায়রিয়া হয়, রক্তের শ্বেতকণিকা কমে যায়, রক্তের প্লেটলেট বা অণুচক্রিকা ভেঙে কমে যায় এবং পরিণামে মৃত্যু হতে পারে। সরকার ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ প্রতিনিয়ত মিডিয়ায় প্রচার করছে। রোগটা যেহেতু মশাবাহিত জীবাণু সংক্রণের এবং মৃত্যুঝুঁকিসহ বিপজ্জনক— তাই সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে পরিবেশকে মশামুক্ত রাখা এবং সেটা হচ্ছে এডিস মশা। ঘরবাড়ি, নগর, পরিবেশকে মশামুক্ত রাখার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব জনসাধারণের।
ডেঙ্গু মানুষের কর্মশক্তি কমিয়ে অর্থনীতির ক্ষতি করে। উন্নত নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি গবেষণালব্ধ কৌশল ব্যবহার করে। পদ্ধতিটি হচ্ছে ল্যাবরেটরিতে উলবাকিয়া নামের ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ মশা প্রজনন করিয়ে তাদের প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেগুলো যে স্ত্রী মশাদের সঙ্গে মিলিত হবে, তাদের ডিম থেকে লার্ভা হবে না। অর্থাৎ মশা কমে যাবে। এতে সিঙ্গাপুর ভালো ফল পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ আরও কিছু দেশে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে ল্যাবরেটরি পর্যায়ে কয়েকজন কীটতত্ত্ববিদ এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তবে তারা বলেছেন, এটা ব্যয়বহুল। সিঙ্গাপুরে নাগরিকরা ফোনে একটি অ্যাপ ব্যবহার করে এলাকায় মশার অবস্থান শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় লোকদের খবর দিয়ে দেন। এটাও কার্যকর।
আমাদের মতোই সমস্যাসংকুল শহর কলকাতা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অনেক সফল। তারা ফগার মেশিন বাদ দিয়েছে। পৌর করপোরেশনের মতে, ফগার মেশিন দিয়ে মশা তাড়ালে মশা এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় চলে যায়। মশার উৎপত্তিস্থলেই লার্ভা ধ্বংস করার কাজে জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছে। প্রশিক্ষিত পৌরকর্মী ও জনগণ একাট্টা হয়ে ওয়ার্ড ও পাড়া পর্যায়ে তিন স্তরের কমিটি গঠন করেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিবিড়ভাবে মশা নিধন করা হয় এবং মশা জন্মানোর জায়গা ও রোগী দেখলে তার খবর নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত যেতে বিলম্ব হয় না। ডেঙ্গু রোগী কলকাতায় আমাদের চেয়ে অনেক কম।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে ছিলেন স্কাউটস, বিএনসিসি (ক্যাডেট কর্পস), গার্লস গাইড সদস্য ও অনেক ছাত্রছাত্রী। তারেক রহমান তরুণদের প্রতি দেশকে পুনর্গঠনে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বললেন, আগামী তিন মাসে আমাদের ডেঙ্গু সমস্যা আমরা সমাধানের চেষ্টা করি। হয়তো আমরা শতভাগ পারব না; কিন্তু অন্তত ৮০ শতাংশ আমরা পারব।
এ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা এবং সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করা।’ তিনি পরিচ্ছন্নতা কাজে ছাত্র-তরুণদের প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা সময় দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী একটি পরিসংখ্যান দেন যে, দেশে স্কাউটসের সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ, বিএনসিসি সদস্য ২২ হাজার, স্কুল-মাদ্রাসা-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রায় দেড় কোটি ও প্রাথমিক স্কুল আর ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আড়াই কোটি। এই অভিযান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিতে জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
আমাদের দেশে এমন অনেক জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে। পরে কাজের ধারাবাহিকতা কতটা থাকে, সেটা এক বড় প্রশ্ন। এই অভিযান সফল করতে হলে এর সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মকৌশল শক্ত হতে হবে এবং উৎসাহ ধরে রাখতে হবে। আমরা অভিযানের সাফল্য কামনা করি।
লেখক: বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক




