জাপানের কৃষি সমবায় থেকে আমরা যা শিখতে পারি

জাপানের ইয়ামাগুচিতে প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশেই আছি। নীল আকাশের নিচে সে এক অসম্ভব সৌন্দর্য। যে বাসায় থাকতাম, বাড়িওয়ালা কৃষিকাজ করতেন। তার বাসার পেছনের ক্ষেতে আমার জন্য দুইটা বেড বরাদ্দ ছিল। ভিন দেশে সবজি চাষের সঙ্গে চলত জাপানকে জানার চেষ্টা, কৃষিই তার প্রধান লক্ষ্য।
তিনি ছিলেন জাপান অ্যাগ্রিকালচার সংক্ষেপে জেএ-এর একজন সদস্য এবং সফল কৃষক। তার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, জেএ শুধু একটি অফিস বা সংগঠন নয়; এটি কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তিনি জানতেন, কোথা থেকে বীজ আসবে, কোথায় পণ্য বিক্রি হবে, কীভাবে মান নিয়ন্ত্রণ হবে এবং প্রয়োজনে কোথা থেকে ঋণ বা পরামর্শ পাওয়া যাবে। এই আত্মবিশ্বাসই সম্ভবত জাপানি কৃষকের সবচেয়ে বড় শক্তি।
জাপানে সমবায় ধারণার ইতিহাস বেশ পুরনো। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কিছু দূরদর্শী ব্যক্তি গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। ১৯০০ সালে সমবায়ভিত্তিক শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। সরকারের সহযোগিতায় ১৯৩০ সালের মধ্যে সারা জাপানে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমবায়ের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে গ্রামীণ শিল্প, কৃষিঋণ, বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সমবায় কার্যক্রম আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালের কৃষি সমবায় আইন দেশটির কৃষি খাতকে নতুন ভিত্তি দেয়। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে আধুনিক জাপানের কৃষি সমবায় কাঠামো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমবায়ের সঙ্গে সব কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সংযোগ করে। আর এতেই প্রায় সব কৃষককে এই কাজে যুক্ত করা সম্ভব হয়। এই সমবায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমবায় আর প্রথাগত কৃষি সমিতির সন্নিবেশের মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষির উন্নয়ন করা।
আজকের জাপানে ‘জেএ’ শুধু একটি সমবায় সংগঠন নয়; এটি কৃষকদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৯২ সালে এসব ছোট অঞ্চলভিত্তিক সমবায় সমিতি একত্র হয়ে যাত্রা শুরু করে ‘জাপান কৃষি সমবায়’, যা সংক্ষেপে জেএ নামে। জেএ এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা কৃষকের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করে।
জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায়, কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু প্রযুক্তি বা ভর্তুকি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী কৃষক সংগঠন
বাংলাদেশের কৃষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে দূরত্ব। কৃষক ফসল উৎপাদন করেন, কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন অন্যরা। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি কৃষকের, অথচ লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে স্থানীয় সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো ছিল জেএ-এর লক্ষ্য। জেএ-এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ মিলিয়ন। এর মধ্যে কৃষক এই সংগঠনের সরাসরি সদস্য। কৃষক ছাড়া সদস্যরা এই সংগঠনের সহযোগী সদস্য, যারা জেএ-এর সেবাগুলো ব্যবহার করতে পারে। জেএ জেনচু (JA-Zenchu) [সেন্ট্রাল ইউনিয়ন অব অ্যাগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ] হলো কৃষি সমবায় আন্দোলনের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান জাপানের কৃষক এবং কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। জাপান জুড়ে প্রতিটি পৌরসভায় এর শাখা আছে।
একজন কৃষক যখন ফসল উৎপাদন করেন, তখন শুরু থেকেই জেএ তার পাশে থাকে। বীজ নির্বাচন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই কৃষক প্রযুক্তিগত সহায়তা পান। উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় জেএ কেন্দ্রে জমা হয়। এরপর জেএ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ সম্পন্ন করে।
জাপানি কৃষিপণ্যের প্রতি বিশ্ব জুড়ে আস্থার অন্যতম কারণ হলো তাদের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। প্রতিটি কৃষিপণ্যের জন্য জেএ-এর অধীনে আলাদা কৃষক গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপে নিয়মিত আলোচনা হয় কোন জাতের বীজ ব্যবহার করা হবে, কতটুকু সার প্রয়োগ করা হবে, কীভাবে পরিচর্যা করা হবে এবং কীভাবে ফসল সংগ্রহ করা হবে। শুধু উৎপাদন নয়; পণ্যের আকার, রঙ, ওজন, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়েও নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। ফলে জাপানের এক প্রান্তে উৎপাদিত পণ্যের মান অন্য প্রান্তের পণ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
বিশ্বের অনেক দেশে কৃষকরা ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। কিন্তু জাপানে জেএ কৃষকদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা করে। এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়; বরং কৃষি খাতকে শক্তিশালী করা। কৃষকরা সহজে ঋণ পান, সঞ্চয়ের সুযোগ পান এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন।
কৃষি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, বাজারমূল্যের ওঠানামা কিংবা ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা— সবকিছুই কৃষকের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় জেএ সদস্যদের জন্য বীমা সুবিধা পরিচালনা করে। কৃষকের জীবন, সম্পদ এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
জেএ-এর কার্যক্রম শুধু কৃষি উৎপাদন বা বিপণনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা করে, কৃষি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে, কৃষিবিষয়ক বই ও পত্রিকা প্রকাশ করে, ট্রাভেল সেবা দেয়, গ্যাস স্টেশন পরিচালনা করে এবং বিভিন্ন সামাজিক সেবা প্রদান করে। ২০১৪ সালের এক প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, জেএ গ্রুপ ফার্ম প্রোডাক্ট বিক্রি করেছে প্রায় ৪০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার। জেএ গ্রুপে সদস্যদের জমা অর্থ ৮৭৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার; পক্ষান্তরে, ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার। দীর্ঘ মেয়াদে ইন্স্যুরেন্সের পরিমাণ ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার। সারা জাপানে কৃষকের সুবিধার্থে জেএ গ্রুপের আছে ১১০টি হাসপাতাল আর ৬৫টি ক্লিনিক।
বাংলাদেশে কৃষি এখনো অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, মাছ, সবজি, ফল ও পোলট্রি উৎপাদনে দেশ আজ অনেক ক্ষেত্রেই আত্মনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। সরকারও সার, বীজ ও ডিজেলে ভর্তুকি প্রদানসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে আসছে।
বড় সমস্যা হলো, কৃষকের সংগঠিত শক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কৃষক সংগঠন থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশ উৎপাদন, বিপণন, ক্রেডিট এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। ফলে কৃষক প্রায়ই বীজ, সার, কীটনাশক ও বিপণন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে। জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায়, কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু প্রযুক্তি বা ভর্তুকি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী কৃষক সংগঠন, কার্যকর সমবায় এবং কৃষককেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থা।
জাপানের কৃষি সাফল্যের গল্প আসলে সংগঠিত কৃষকের গল্প। প্রযুক্তি, গবেষণা ও সরকারি সহায়তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এসবকে কার্যকর করে তুলেছে একটি শক্তিশালী সমবায় কাঠামো। বাংলাদেশের কৃষিও আজ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি— খণ্ডিত জমি, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজার অস্থিরতা এবং কৃষকের ক্রমহ্রাসমান আগ্রহ। এই বাস্তবতায় জাপানের জেএ মডেল আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হতে পারে।
লেখক: সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক



