উচ্চ সুদের হার শেয়ারবাজারের জন্য বড় বাধা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারে ব্যাপক দর পতন ও মূলধন সংকট চলছে। আর এই সংকটের কারণ– শেয়ারবাজারে মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা কমে গিয়ে দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, মার্জিন ঋণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া গত ১৫ বছরে শেয়ারবাজারের ভিত্তি ও ব্যাপ্তি আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়েছে। ফলে যে আস্থা ও প্রাণচাঞ্চল্য একসময় শেয়ারবাজারে ছিল, তা এ মুহূর্তে নেই। আর শেয়ারবাজারের এই সংকট দূর করতে হলে শুধু সূচক বাড়ানো নয়, বরং বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও দূর করা জরুরি।
একসময় বাজারে বেশ কিছু ‘লিজেন্ড’ কোম্পানি ছিল, যারা বেশ ভালো ব্যবসা করত। বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত নগদ লভ্যাংশ ও বোনাস শেয়ার দেওয়ার সক্ষমতা ছিল তাদের। এখন এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ শতাংশই নন-ফাংশনাল বা কার্যত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। তা ছাড়া ব্যাংকিং খাতেও প্রায় ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো নয়। অথচ একসময় এসব ব্যাংক ও ‘লিজেন্ড’ কোম্পানিগুলো নিয়মিত নগদ লভ্যাংশ এবং বোনাস শেয়ার প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনেকটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ায় তাদের দুরবস্থার প্রভাব সরাসরি শেয়ারবাজারেও পড়েছে। অন্যদিকে মিউচুয়াল ফান্ড খাত টালমাটাল পরিস্থিতি পার করছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে এ খাত অনেকটাই ডিসক্রেডিটেড হয়ে পড়েছে বলা যায়।
ফলে বাজারের ব্যাপ্তি ও গভীরতা কমেছে। বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাজার থেকে সরে গেছেন। একসময় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩ লাখ। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১৩ লাখে। সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ, অর্থাৎ বাজার থেকে শুধু মূলধন নয়; বিনিয়োগকারীরাও অনেকটা সরে গেছেন।
এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেয়ারবাজারের লেনদেনের বড় অংশ জুড়ে ছিল জাঙ্ক স্টক বা দুর্বল কোম্পানির শেয়ার। একপর্যায়ে প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেনই ‘জুয়াভিত্তিক’ লেনদেনে পরিণত হয়েছিল। অর্থাৎ ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বদলে দ্রুত মুনাফার আশায় দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাজারের বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন করে অনেক নন-ফাংশনাল কোম্পানি চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো ‘জেড’ গ্রুপে স্থানান্তর হয়েছে। ফলে কোম্পানি শ্রেণিবিন্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বড় অঙ্কের মার্জিন ঋণ আটকে আছে। শেয়ারের দাম কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ঋণের দায়ও বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করছেন, ঋণের দায় কমাতে চেষ্টা করছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় শেয়ার ফোর্স সেলের আওতায় পড়ছে। পুরো প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বিনিয়োগকারীরা মার্জিন ঋণের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে যারা মার্জিন ঋণ ছাড়া নিজেদের অর্থে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছেন, তাদের ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। তাই সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে মূলধন কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু মূলধন প্রত্যাহার হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে না। বিনিয়োগকারীরা যখন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন কিংবা বাজার ছেড়ে চলে যান, তখন বাজারে থাকা অর্থও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
শেয়ারবাজারে মূলধন কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু মূলধন প্রত্যাহার হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে না। বিনিয়োগকারীরা যখন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন কিংবা বাজার ছেড়ে চলে যান, তখন বাজারে থাকা অর্থও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে
উচ্চ সুদের হার শেয়ারবাজারের জন্য বড় বাধা। সুদের হার বেশি থাকলে স্টক মার্কেটে তারল্যের সরবরাহ কমে যায়। অর্থের জোগান কমে যায়। সরকারি বন্ডে যখন সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ইয়েল্ড পাওয়া যায়, তখন তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই সুদের হার কমানো জরুরি।
শেয়ারবাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মানসম্পন্ন শেয়ারের ঘাটতি। গত দুই-আড়াই বছরে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো আইপিও আসেনি। ফলে বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের সরবরাহ বাড়েনি। বিপরীতে কম মূলধনের দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে ‘জুয়া খেলা’ বেড়েছে এবং মার্জিন ঋণের ব্যবহারও বেড়েছে। কোনো কোনো মার্চেন্ট ব্যাংকের কাছে মার্জিন ঋণের ব্যবসা ব্রোকারেজ ব্যবসার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় বাজারকে কার্যকর করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসম্পন্ন কোম্পানির সরবরাহ বাড়ানো। সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আইপিওর নিয়ম সহজ করা হচ্ছে। ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতিতে আইপিও ও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে আরও বড় সুযোগ রয়েছে। এসব কোম্পানির মূলধনের অভাব নেই। বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা মাত্র ৫ শতাংশ শেয়ার অফলোড করেও তালিকাভুক্ত হতে পারবে— এ ধরনের ব্যবস্থা করা হলে বাজারে ভালো কোম্পানি আনার পথ অনেকটাই সহজ হবে। ভারতে এমন ব্যবস্থার নজির রয়েছে। ইউনিলিভার ইন্ডিয়া তার একটি উদাহরণ।
বাংলাদেশেও ইউনিলিভার, মেটলাইফ, নেসলের মতো বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা গেলে বাজারের গুণগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য দেশেও তালিকাভুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশে তাদের তালিকাভুক্তি শুধু বাজারের আকারই বাড়াবে না; বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়াবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও সংস্কার করা ছিল জরুরি। ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের পরিবর্তে ওপেন-এন্ড ব্যবস্থায় যাওয়ার উদ্যোগ সেদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের ক্ষেত্রে কোনো ফান্ডের নিট অ্যাসেট ভ্যালু বা এনএভি যদি আট টাকা হয়, বাজারে সেটি চার টাকায় লেনদেন হতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় না। বর্তমানে ওপেন-এন্ড ফান্ডে নির্ধারিত নিয়মে এনএভি অনুযায়ী অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকায় এ সমস্যা কমবে।
শেয়ারবাজারের পুনরুদ্ধারের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি সরাসরি সম্পর্কিত। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যদি সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি না যায় এবং বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে শেয়ারবাজারও প্রাণবন্ত হবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এরই মধ্যে অনেক শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছেড়েছেন। অর্থনীতি ও বাজারের পরিবেশ ভালো হলে তারাও আবার ফিরবেন।
সুতরাং শেয়ারবাজারের হাল ফেরাতে নিয়মকানুন সহজ করা, লেনদেন ব্যবস্থা আধুনিক করা এবং মার্জিন ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা— সবই দরকার। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে ‘সাপ্লাই অব কোয়ালিটি স্টকস’। বাজারে ভালো কোম্পানি আনতে পারলে বিনিয়োগকারীদের হাতে ভালো বিকল্প তৈরি হবে। আর ভালো বিকল্প তৈরি হলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে।
তাই আশাবাদী হওয়ার কারণ অবশ্যই আছে। আইপিও সহজ হচ্ছে, সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ খুলছে, মিউচুয়াল ফান্ডে সংস্কার হচ্ছে, লেনদেন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কয়েক মাসের মধ্যে তার কিছু ফল দেখা যেতে পারে। তবে স্থায়ী পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা।
শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। এখানে আগামীতে ভালো কোম্পানি আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়বে। সরকার সেভাবে কাজ করছে। আগামীতে শেয়ারবাজার দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে বলে আশা করা যায়।
লেখক: চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)




