হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে দায় কার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের প্রাণ-প্রকৃতি আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। পরিবেশের ক্ষয়, দূষণ, ধ্বংস ও বেদখলে বুনো প্রাণীরা আজ দিশাহারা। আমাদের হস্তক্ষেপে বন্যপ্রাণীরা আবাস্থল হারাচ্ছে, তাদের সংখ্যা ছোট হয়ে আসছে, কমছে জিনবৈচিত্র্য। বুনো প্রাণীদের মধ্যে এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমাদের হাতি।
বড় আকার, বিস্তৃত বনাঞ্চল ও বেশি পরিমাণে খাবারের চাহিদা সম্পন্ন হওয়ায় আমাদের হাতিরা আজ সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত। এই হাতি শুধু জীববৈচিত্র্যেরই অংশ নয়; এরা আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ আজ এই বিপন্ন প্রাণীটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ক্রমে পরাজিত হচ্ছে। হাতির বড় শত্রু আজ আর শিকারি নয়; বরং মানুষের আক্রমণে হাতির মৃত্যু আর মানুষ-হাতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত। দেশের নানা ফ্রন্টে হাতির সঙ্গে প্রতিদিন আমাদের যুদ্ধ চলছে।
প্রায় এক দশক আগের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে আড়াইশর মতো আবাসিক বুনো হাতি আছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার খণ্ড খণ্ড বনাঞ্চলে আবাসিক হাতির বিচরণ। এ ছাড়া ভারতের মেঘালয় থেকে শতাধিক হাতি শেরপুর, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে বছরের বেশিরভাগ সময় বিচরণ করে।
কিন্তু গত কয়েক দশকে দেশের বন উজাড়, অবৈধ দখল, বসতি সম্প্রসারণ, সড়ক নির্মাণ, কৃষিজমির বিস্তার এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও চলাচলের পথ (করিডর) মারাত্মকভাবে সংকুচিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতিগুলো লোকালয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে। এর পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক।
বিভিন্ন গবেষণা ও সূত্রমতে, ২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের মোট হাতির সংখ্যার প্রায় অর্ধেক হাতির মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যুই বেশি। বিদ্যুতায়িত করে, গুলি করে, ট্রেনের ধাক্কায় কিংবা ফসল ও সম্পদ রক্ষার নামে মানুষের প্রতিশোধমূলক আক্রমণে বেশিরভাগ হাতি প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে ফসলের ক্ষেতে পেতে রাখা অবৈধ বৈদ্যুতিক তার এখন হাতির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
হাতি শুধু জীববৈচিত্র্যেরই অংশ নয়; আমাদের সংস্কৃতি ইতিহাস ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ আজ এই বিপন্ন প্রাণীটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ক্রমে পরাজিত হচ্ছে
অন্যদিকে মানুষের ক্ষয়ক্ষতিও কম নয়। প্রতি বছর ফসল রক্ষা করতে গিয়ে কৃষক, বননির্ভর জনগোষ্ঠী এবং হাতির বিচরণ এলাকার বাসিন্দারা হাতির আক্রমণে নিহত বা আহত হচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে হাতির আক্রমণে শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। আহত হয়েছেন প্রায় সমসংখ্যক মানুষ। অসংখ্য পরিবার বসতবাড়ি, ফসল ও জীবিকার ক্ষতির মুখে পড়ছে। ফলে স্থানীয়রা হাতিকে এখন আর বনের প্রাণী নয়; বরং ফসল ও পরিসম্পদের জন্য এক আপদ হিসেবে বিবেচনা করেন।
আমরা প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করি। হাতি মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না। এরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, সামাজিক ও স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত তাদের চলাচলের পথ যখন মানুষের বসতি, রাস্তা কিংবা কৃষিজমিতে পরিণত হয়, তখন তারা তাদের পূর্বপুরুষের সেই পথ ধরেই এগিয়ে আসে। সংঘাতের মূল কারণ এখানেই।
দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি আমরা সংবিধানে যুক্ত করেছি। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের অসংখ্য আইন, বিধিমালা, নীতিমালা আছে। কিন্তু কাগুজে সংরক্ষণ আমাদের মাঠে নিয়ে যেতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ অপরিহার্য। সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে কাজে-কর্মে, অর্থে, ক্ষমতায় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা দিতে হবে।
হাতি বাঁচাতে হলে হাতির করিডরগুলো আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। নতুন সড়ক, শিল্পাঞ্চল, বসতবাড়ি বা পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে বন্যপ্রাণীর বিচরণস্থল ও চলাচলের পথ ধ্বংস বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। স্থানীয় দূষ্কৃতকারী দ্বারা অবৈধ বিদ্যুতায়িত বেড়া স্থাপন রোধ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য না হন। অন্যান্য দেশের মতো ক্ষয়ক্ষতির জন্য বীমার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী হাতির জন্য ভারতের সঙ্গে সমন্বিত সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি।
পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ আমাদের আশাবাদী করে। বিশেষ করে বৃক্ষরোপণ অভিযান ও খাল খনন কর্মকাণ্ড পরিবেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে বলে মনে করি। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো দেশের প্রাকৃতিক বন-বনানি, বিশেষ করে রক্ষিত ও সংরক্ষিত এলাকা মানুষের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বনাঞ্চলে কোনো বৃক্ষরোপণের প্রয়োজন নেই, শুধু মানুষের আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখতে পারলেই ন্যাড়া পাহাড় কিংবা ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল আবারও গুণে-মানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে হাতির বিচরণ এলাকার প্রাকৃতিক বন, পাহার-টিলা, পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি-ঝরনা কোনোভাবেই যাতে আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
একটি সভ্য জাতির পরিচয় কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি আচরণেও প্রকাশ পায়। আমরা যদি আমাদের বনকে বাঁচাতে চাই, যদি আগামী প্রজন্মের জন্য সজীব নির্মল প্রকৃতি রেখে যেতে চাই, তবে হাতিকে বাঁচানোর বিকল্প নেই। হাতি রক্ষা করতে পারলে বন-পাহাড়ের ইকোসিস্টেম অটুট থাকবে, প্রতিবেশের নিরবচ্ছিন্ন সেবা সৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। আমাদের আগামী প্রজন্ম এর সুফল পাবে।
প্রশ্নটি তাই শুধু হাতির নয়; প্রশ্নটি আমাদের ভবিষ্যতের। আমরা কি এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে উন্নয়নের নামে বন হারিয়ে যাবে, হাতি হারিয়ে যাবে আর মানুষের জীবনও অনিরাপদ হয়ে উঠবে? নাকি আমরা এমন উন্নয়নের পথ বেছে নেব, যেখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণী উভয়েরই নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে?
মানুষ হিসেবে হাতির বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও হাতি বিশেষজ্ঞ




