আবারও সেই একই ভুল!

আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সর্বশেষ অবস্থান সত্যিই হতাশার। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, রবিবার (অক্টোবর ১১) গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, দলটি স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দিতে চায়। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ধরে নেওয়া যায়, হয়তো স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার হতে যাচ্ছে। হলে সেটি বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের দফা ৭-এর বরখেলাপ।
আবার দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করে দলীয়ভাবে একক প্রার্থী দেওয়ার অর্থই হলো স্থানীয় নির্বাচনকে দলীয়করণ করা, যা এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে এনেছে। এ পরিস্থিতির জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও এর অতি-উৎসাহী আমলাতন্ত্র দায়ী।
বাংলাদেশে সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্য সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, যেমন— উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতো না। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে পাঁচ বছর মেয়াদের শেষ দিকে ১৫ জুন, ২০১৩ দলীয় প্রতীকে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হন।
২০১৪ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় প্রতীকে সিটি করপোরেশন নির্বাচন করার রাজনৈতিক একটা উদ্দেশ্য ছিল।
২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ছিল, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হবে না। এ ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করতেই মূলত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি সরকার। এর উদ্দেশ্য ছিল, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার যে দাবি জানিয়ে আসছিল, সে দাবিকে ভুল প্রমাণ করা। আমরা দেখেছি, সিটি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
অরাজনৈতিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করা গেলে জনগণের পছন্দমতো কিছু নেতা নির্বাচিত হবেন এবং তারা ভবিষ্যতে সংকটময় পরিস্থিতিতে বিএনপির হাল ধরতে পারবেন
তবে সিটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আরও শক্তিশালী হয়। বিএনপি প্রচার করে, আগামী নির্বাচনে তারা জয়ী হবে এবং চার সিটি নির্বাচনে জয় তারই প্রমাণ। তাদের নিশ্চিত জয় ছিনিয়ে নিতেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল, ‘নৌকা প্রতীককে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া।’ সে উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হয়েছে, তা বলা না গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আওয়ামী লীগের গৃহদাহ পৌঁছে দেওয়া গেছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সরকার। দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত করতে আইন সংশোধন করা হয়। ২০১৫ সালের সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে এবং সেখানে ব্যাপক কারচুপি ও জালিয়াতি হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়।
দলীয় প্রতীক পেতে দলের নেতাকর্মীরা এত মরিয়া হয়ে ওঠেন যে, গ্রামপর্যায়ে দলীয় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। দল থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করলে কঠোর ব্যবস্থা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলীয় মনোনয়ন কেনাবেচা শুরু হয়ে যায়। মনোনয়ন বিক্রির মধ্যে মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে নির্বাচনী বোর্ডের সদস্যরাও ছিলেন। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে যান দলের ত্যাগী নেতারা, যাদের টাকা-পয়সা নেই। এভাবে আওয়ামী লীগ নামক দলটি সাংগঠনিকভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে দেশের সব স্থানে দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জেলা গোপালগঞ্জে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সেখানে অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একইভাবে মাদারীপুর জেলায়ও অরাজনৈতিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মাদারীপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় প্রকাশ্যে বলেছেন, তার জেলায় তিনি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চান না। সে কারণে তার জেলায় অরাজনৈতিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ এবং হানাহানি বৃদ্ধি পায়, যা কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থা নিলে কোনো লাভ হয় না। নেতাকে বহিষ্কার করলে সংগঠনের ক্ষতিই হয়; লাভ হয় না।
আমার আশঙ্কা, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অনেকটা আওয়ামী লীগের পথে হাঁটছে। আওয়ামী লীগ যেভাবে ধ্বংসের পর্যায়ে গেছে, বিএনপি কি সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে? বিএনপির সামনে সুযোগ আছে শোধরানোর।
দেশকে রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে বাঁচাতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। কারণ, যেকোনো রাজনৈতিক দল রাতারাতি গড়ে ওঠে না।
দলের একক প্রার্থী দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিনশেষে বিএনপির জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। আওয়ামী লীগ চেষ্টা করেছে। পারেনি। বিএনপিও পারবে বলে মনে হয় না; বরং স্থানীয় পর্যায়ে বিভেদ বাড়বে এবং দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর চেয়ে বরং অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করা হোক।
গত ১৫-১৬ বছর স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে না পারায় বিএনপিতে যোগ্য নেতার সংকট দেখা দিয়েছে। অরাজনৈতিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করা গেলে জনগণের পছন্দমতো কিছু নেতা নির্বাচিত হবেন এবং তারা ভবিষ্যতে সংকটময় পরিস্থিতিতে বিএনপির হাল ধরতে পারবেন।
আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি শিক্ষা নিলে দল বাঁচবে। দেশের এ সংকটময় পরিস্থিতিতে বিএনপির মতো একটি মধ্যপন্থী দল খুবই প্রয়োজন। এর অন্যথা হলে মাশুল দিতে হবে দলকে ও দেশকে।
লেখক: সাংবাদিক



