প্রণোদনার কৌশল ও কর মেনে চলার রাজনীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অর্থনীতি শুধু সম্পদের বিজ্ঞান নয়। অর্থনীতি মানুষের সিদ্ধান্তের বিজ্ঞানও। মানুষ প্রণোদনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। নীতিনির্ধারকরা যখন কর বসান, তখন মানুষের আচরণ পরিবর্তন হয়— কখনো পরিকল্পিতভাবে, কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের করনীতি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে চমকপ্রদ কিছু চিত্র পাওয়া যায়।
কর ফাঁকি বা কর মেনে চলা— এটি মূলত একটি কৌশলগত সমস্যা। একজন করদাতা মনে মনে হিসাব কষেন— অন্যরা কি কর দিচ্ছেন? যদি বেশিরভাগ মানুষ কর না দেন, তাহলে কর দেওয়া বোকামি; কিন্তু যদি সবাই কর দেন, তাহলে না দেওয়া লাভজনক। এই পরিস্থিতিটি কৌশল তত্ত্বে ‘ন্যাশ ইক্যুইলিব্রিয়াম’-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ। সফল করনীতির কাজ হলো করদাতার পছন্দকে নৈতিক থেকে কৌশলগতভাবে লাভজনকে পরিণত করা।
প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন বিধানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে, ব্যাংক ও এনবিএফআই থেকে ঋণ নিতে, মোবাইল ব্যাংকিং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে, ট্রেড লাইসেন্স নিতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ পেতে এবং বিআরটিএতে যানবাহন নিবন্ধন করতে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটির একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত মাত্রা রয়েছে।
প্রথমবার রিটার্নদাতাদের জন্য মাত্র এক হাজার টাকা ন্যূনতম করের প্রস্তাব একটি বুদ্ধিদীপ্ত আচরণগত পদক্ষেপ। করদাতা হওয়ার প্রাথমিক প্রবেশ-বাধা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একবার কেউ করদাতা হলে পরের বছর রিটার্ন না দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, তিনি এরই মধ্যে ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছেন।
আইটি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য শূন্য কর হারের প্রস্তাব একটি দ্বিমুখী প্রণোদনা তৈরি করবে। প্রথমত, বৈধ চ্যানেলে অর্থ আনার প্রণোদনা বাড়বে। আগে হয়তো হুন্ডিতে অর্থ আসত— কর এড়ানোর জন্য। এখন ব্যাংকে আনলে কর শূন্য। তাই সঠিক পথে আসার কারণ তৈরি হলো। দ্বিতীয়ত, ফ্রিল্যান্সিং পেশাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এই স্বীকৃতি নিজেই একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রণোদনা।
ট্রান্সফার প্রাইসিং বিধিমালার নতুন বাধ্যবাধকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন। তিন কোটি টাকার বেশি সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনে ডকুমেন্টেশন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। অব্যাখ্যাত ক্রেডিটে ৫০ শতাংশ কর ও ১০ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই পরিমাণ স্বাভাবিক আয়কর হারের চেয়ে অনেক বেশি।
বাধ্যতামূলক বিআইএন, প্রথম ফাইলারের জন্য কম কর, ক্যাশলেস রিবেট—এগুলো আচরণগত অর্থনীতির চতুর প্রয়োগ। তবে কিছু প্রণোদনার অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে
একটি বহুজাতিক কোম্পানি কম করের দেশে মুনাফা স্থানান্তর করে বাংলাদেশে করের বোঝা কমাতে পারে। ট্রান্সফার প্রাইসিং বিধি এই কৌশলকে ব্যয়বহুল করে তোলে। ডকুমেন্টেশনের ঝামেলা ও ৬০ শতাংশ মোট দণ্ডের ভয় কৌশলগতভাবে মুনাফা-স্থানান্তরকে নিরুৎসাহিত করে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে এনবিআরের দক্ষতা ও নিরীক্ষা সক্ষমতার ওপর।
স্টক ডিভিডেন্ড করের বিধানটি কৌশলগত দৃষ্টিতে আকর্ষণীয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি নগদ ডিভিডেন্ড না দিয়ে বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে, তাহলে কোম্পানিকে ১০ শতাংশ কর দিতে হবে বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আগে এই বিধান ছিল না। কোম্পানিগুলো করযোগ্য নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে বোনাস শেয়ার দিত। নতুন বিধান এই কৌশলটিকে আর লাভজনক রাখেনি। বিনিয়োগকারীদের নগদ ডিভিডেন্ড পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
ক্যাশলেস লেনদেনে ১০ শতাংশ কর ছাড় একটি সৃজনশীল নীতি। যেসব প্রতিষ্ঠান ১০০ শতাংশ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করে, তারা এই ছাড় পাবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় রেকর্ড তৈরি হয়। তাই ডিজিটাল পেমেন্ট প্রমোট করার নিজস্ব রাজস্ব-যুক্তি আছে।
একক ব্যক্তিনির্ভর কোম্পানির কর হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি একটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা। বাংলাদেশে বহু ব্যবসা অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হয়। কর হ্রাস ওই ব্যবসায়ীদের ওপিসি গঠন করে আনুষ্ঠানিক হওয়ার উৎসাহ দেয়। আনুষ্ঠানিক কোম্পানি মানে আরও স্বচ্ছতা, আরও রাজস্ব। একই সঙ্গে সিএসআর ব্যয়ের কর ছাড়ের সীমা ১০ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মোটরযানে অগ্রিম করের প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি একটি বড় আচরণগত পরিবর্তন আনবে। ১ হাজার ৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়িতে অগ্রিম কর ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ সিসির গাড়িতে ৪ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মাইক্রোবাস ও ডাবল কেবিন পিকআপে নতুন করে ৪০ হাজার টাকা অগ্রিম করারোপ হয়েছে। বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানাকে ব্যয়বহুল করা ন্যায়সংগত। তবে ছোট ইঞ্জিনের গাড়িও একই নিয়মে বাড়তি কর বহন করছে, যা মধ্যবিত্তের জন্য চাপ তৈরি করবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ই-কমার্স, সফটওয়্যার অ্যাজ এ সার্ভিস, মার্কেটপ্লেস— সবই আয়করের আওতায় এলো। এটি ডিজিটাল অর্থনীতির বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
বিলম্ব রিটার্ন জরিমানার দ্বিস্তরীয় কাঠামো একটি স্মার্টনীতি। বছরের মধ্যে রিটার্ন দিলে জরিমানা ১০ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা, যা বেশি। বছর শেষের পর দিলে ১৫ শতাংশ বা ১০ হাজার টাকা, যা বেশি। এই তারতম্য সময়মতো রিটার্ন দেওয়ার শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি করবে।
তবে কর ফাঁকি ও কর পরিহারের মধ্যে পার্থক্য আছে। কর পরিহার আইনসম্মত— করদাতা আইনের সুযোগ ব্যবহার করে কর কমান। কর ফাঁকি বেআইনি। কর প্রশাসনের দুর্বলতা কর পরিহারের সুযোগ বাড়িয়েছে। ট্রান্সফার প্রাইসিং বিধি বা স্টক ডিভিডেন্ড কর— এগুলো কার্যকর হবে তখনই, যখন নিরীক্ষা ও প্রয়োগ কাঠামো শক্তিশালী হবে।
এই বাজেটের করনীতি কৌশলগতভাবে চিন্তাশীল। বাধ্যতামূলক বিআইএন, প্রথম ফাইলারের জন্য কম কর, ক্যাশলেস রিবেট— এগুলো আচরণগত অর্থনীতির চতুর প্রয়োগ। কিছু প্রণোদনার অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। শেষে বলতে হয়— দিকনির্দেশনা সঠিক, তবে বিস্তারিত প্রয়োগে আরও সূক্ষ্মতা প্রয়োজন।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক




