স্মরণে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
নিঃসঙ্গের কথাকার

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (২০ আগস্ট, ১৯১২ — ১ আগস্ট ১৯৮২)
লেখালেখির জগতে কিছু মানুষ থাকেন, যারা কখনো ভিড়ের হইহুল্লোড়ে গলা মেলান না— জনপ্রিয়তার উজ্জ্বল মঞ্চে দাঁড়িয়ে করতালির জন্য হাত পাতেন না, বরং নিজের মনের গহন অরণ্যে একা হেঁটে বেড়ান, কান পেতে শোনেন ঝিঁঝির ডাক, পেঁপে পাতার হলুদ বিবর্ণতা খসে পড়া, বৃষ্টির শব্দ আর শামুক-গুগলির গন্ধমাখা নৈঃশব্দ্যের ভাষা। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী ছিলেন এমনই এক নিঃসঙ্গ পথিক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যার অবস্থান স্বতন্ত্র, অথচ যিনি কখনো স্বীকৃতির ভিড়ে নিজেকে হারাতে চাননি। যে লেখক সহজে মিশে যান পাঠকের মনে, যে গল্প শেষ করার পরও যেন শেষ হয় না— সেই দুর্লভ শিল্পীর নাম জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী সমষ্টিবদ্ধ জনতার কথা বলেন না, নেতার কথাও বলেন না। তিনি বলেন একক কোনো চরিত্রের কথা— নিজের অন্তঃপুরে প্রায়ই যে নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী। যে মানুষটি ভিড়ের মিছিলে মিশে যায় সহজে, অনন্য করে চিহ্নিত করার উপায় থাকে না। বৃহত্তর এই পৃথিবীর মহত্তম কোনো কর্মে লিপ্ত নয় সে। ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংযমের পরিচয়ও অপরিহার্য নয় তার চরিত্রে। কেননা তিল তিল ক্ষয়ের মধ্যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই তার জীবনবেদ। সে মানুষ অন্তর্মুখী, সহসা নিজেকে প্রকাশ করতে চায় না বা পারে না। তার মনের গহনে সঞ্চিত কয়েকটি বোধ কথা বলে পাঠকের সঙ্গে। নিপুণ কথাশিল্পী জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী চরিত্রকে টেনে নিয়ে যান মুখর ব্যস্ততা থেকে দূরে, নির্জন প্রান্তরে। কান পেতে শোনেন তার না-বলা কথা। তারপর আপাত সামঞ্জস্যহীন টুকরো টুকরো বোধের কোলাজ তৈরি করে তার গল্পের শরীর, যা পাঠকের গল্প শোনার যাবতীয় অর্জিত অভিজ্ঞতায় ঘটিয়ে দেয় চেতনার উলটপুরাণ।
১৯১২ সালের ২০ আগস্ট বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লায় জন্মেছিলেন এই স্বভাবনিঃসঙ্গ মানুষটি। পিতা অপূর্বচন্দ্র নন্দী ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাতা চারুবালা দেবী। বাবার দেওয়া নাম ছিল ‘ধনু’। সেই ধনুই একদিন হয়ে উঠবেন বাংলা কথাসাহিত্যের এক বিশিষ্ট কারিগর, যদিও ছোটবেলায় সে ছিল অদ্ভুত এক চরিত্র। পুকুরঘাটের পুঁইমাচার কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত সে— কী দেখছে কে জানে! চার বছর বয়সী ধনুর সেই একা দাঁড়িয়ে থাকা যেন তার ভবিষ্যৎ জীবনেরই পূর্বাভাস দিচ্ছিল। পরে নিজেই লিখেছেন, ‘আজ আমি বুঝি তখনো আমার ভালোলাগার বোধ জন্মায়নি... কোন দৃশ্য, কোন শব্দ— কীসের গন্ধ আমাকে আনন্দ দেবার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনো জানতে পারিনি, বুঝতে পারিনি।’ আর সেই না-বোঝাকেই আজীবন বুঝতে চেয়েছেন তিনি, একের পর এক লেখায়, অনুসন্ধানে।
শৈশবেই প্রকৃতির গন্ধের সঙ্গে এক গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল জ্যোতিরিন্দ্রের। ঠাকুরদার হাত ধরে রেললাইন পেরিয়ে শহরের শেষ সীমায় এক খালের ধারে, হেলিডি সাহেবের বাংলোর ফুলবাগানে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন সৌন্দর্যের প্রথম বীজ। শিশিরভেজা গোলাপের পাপড়িতে সূর্যের রক্তাভ আলো, আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটি নীল প্রজাপতির বসে পড়া— সেই প্রথম ভালোলাগা, সেই প্রথম সৌন্দর্যচেতনার জন্ম। জ্যোতিরিন্দ্র লিখেছেন, ‘ভালোলাগা কাকে বলে, ভালো দৃশ্য কী, সেদিন প্রথম টের পেলাম। আর গন্ধ। নির্জন উষার সেই বাগানে গোলাপের মৃদু কোমল গন্ধে আমার বুকের ভেতর ছেয়ে গেল।’ গন্ধের সঙ্গে এই বন্ধুত্ব আমৃত্যু রয়ে গেল তার। ‘ভাদ্র মাসে জলে ডোবানো পাটের পচা গন্ধ থেকে বা অঘ্রাণের পাকা ধানের গন্ধ থেকে বা কখনো পুঁটি, মৌরলা মাছের আঁশটে গন্ধ’ থেকে সৃজনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করেছেন তিনি। পরবর্তী জীবনে স্বীকার করেছেন, ‘সব কটা ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সেই শৈশব থেকে আমার নাকটা অতিমাত্রায় সজাগ সচেতন। সাহিত্য সৃষ্টি করতে গিয়ে এই গন্ধ আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা হাই স্কুলে পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়ে যে অভাবনীয় বিস্ময়-আনন্দ-কৌতূহল তার মনে জেগেছিল, তা-ই তাকে ছোটগল্প রচনায় প্রাণিত করে। মাত্র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তখন, কিন্তু ছোটগল্পের প্রতি সর্বগ্রাসী টান তাকে কাব্যপ্রীতি ভুলিয়ে দিয়েছিল। ১৯৩০ সালে প্রবেশিকা পাস করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আইএসসিতে ভর্তি হন। এই সময় ঢাকার ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় মোপাসাঁর একটি অনূদিত গল্প প্রকাশিত হয়— ছাপার অক্ষরে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ। এরপর এক মাসের মধ্যেই ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় একটি মৌলিক গল্প। মাত্র আঠারো বছর বয়সে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত হাতে লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম সাড়া জাগানো গল্প ‘অন্তরালে’। নিজের কথা থেকে জানা যায়, ‘স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে ঢোকার আগেই আমি একজন পাকা ছোটগল্প লেখক— বিশেষত আমার বন্ধুদের কাছে।’
কিন্তু লেখনীর এই গতিতে ছেদ পড়ল ১৯৩২ সালে। স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হলো তাকে। ছয় মাস কুমিল্লা জেলে ও এক মাস স্বগৃহে অন্তরিন থাকলেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হলো লেখালেখির ওপর। কিন্তু মাথার ভেতর অজস্র প্লট, অগণিত গল্পের আনাগোনা। তখনই জন্ম নিল ‘জ্যোৎস্না রায়’ ছদ্মনাম। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই চলল সৃষ্টির কাজ। অবশেষে ১৯৩৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ‘রাইচরণের বাবরি’ এবং ‘পরিচয়’ ত্রৈমাসিকে ‘নদী ও নারী’ লিখে কলকাতার বৃহত্তর পাঠকসমাজের নজর কাড়লেন তিনি। এরপর ‘মাতৃভূমি’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘চতুরঙ্গ’সহ একের পর এক পত্রপত্রিকায় গল্প বেরোতে থাকল। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হলো প্রথম গল্প সংকলন ‘খেলনা’।
জীবিকার সন্ধানে ১৯৩৬ সালে কলকাতা এলেন জ্যোতিরিন্দ্র। কিন্তু নিরাপদ চাকরির জীবনযাপন তার অভিপ্রেত ছিল না। মাথার মধ্যে কেবল ঘুরপাক খেত সফল লেখক হওয়ার বাসনা। ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’, ‘দৈনিক যুগান্তর’, ‘দৈনিক আজাদ’, ‘জনসেবক’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও আসলে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর সাহিত্যসাধক। শেষ কুড়ি বছর আর কোথাও চাকরি করেননি, পুরোপুরি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন সাহিত্যচর্চায়।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ২০, আর উপন্যাস ৫৩টি। প্রথম উপন্যাস ‘সূর্যমুখী’ ১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর ‘মীরার দুপুর’ (১৯৫৩), ‘বারো ঘর এক উঠোন’ (১৯৫৫), ‘নীল রাত্রি’ (১৯৫৮), ‘আলোর ভুবন’ (১৯৬২), ‘আকাশলীনা’ (১৯৬৪), ‘প্রেমের চেয়ে বড়’ (১৯৬৬), ‘সুনন্দার প্রেম’ (১৯৬৭)—একটানা লিখে গেছেন তিনি। ‘বারো ঘর এক উঠোন’ তাকে এনে দেয় ব্যাপক খ্যাতি। এই উপন্যাসে একই উঠোনকে কেন্দ্র করে থাকা কয়েকটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প বলেছেন লেখক। উপন্যাসের পরিকল্পনা ও কাঠামো ছিল অভিনব। মধ্যবিত্তের টানাপড়েন, অভাব-অনটন, নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র এখানে নিষ্ঠুর সততা আশ্রয় করে উঠে এসেছে। সমালোচনার ঝড় উঠেছিল এই উপন্যাস নিয়ে। বলা হয়েছিল— লেখক শুধু অন্ধকারই দেখেছেন, আলোর সন্ধান দেননি। কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্র তার উত্তর দিয়েছিলেন স্পষ্ট ভাষায়: ‘আলো দেখাবার জন্য, উত্তরণ দেখাবার জন্য আমি এ বই লিখিনি। কেননা আমার দেখা ও জানা চরিত্রগুলোর মধ্যে এমন একটি মানুষও ছিল না, যে এদের মধ্যে উপস্থিত থেকে মহৎ জীবনাদর্শের বাণী শোনাতে পারত। বিপন্ন, বিপর্যস্ত, অবক্ষয়িত সমাজের মানুষগুলো শুধু বেঁচে থাকার জন্য, কোনোরকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কতটা অন্ধকারে, কতটা নিচে নেমে যেতে পারে আমি তাই দেখিয়েছি।’
জ্যোতিরিন্দ্রের গল্পের প্রধান বিষয় মানুষ; কিন্তু সেই মানুষ কখনো নায়ক নয়, নায়িকা নয়। সে নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের অসহায় চরিত্র, যে তিল তিল ক্ষয়ে বেঁচে থাকে, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই যার একমাত্র সাধ্য। তার গল্পের চরিত্ররা যেন নিজেদের ভেতরেই কথা বলে, তাদের না-বলা কথাগুলোই হয়ে ওঠে গল্পের মূল সুর। ‘রাইচরণের বাবরি’ গল্পে এক দর্জির গল্প বলেছেন তিনি, যার রূপলাবণ্যময় বাবরিচুল তার গর্বের বস্তু। থিয়েটারে অভিনেতা হওয়ার প্রস্তাব পেয়েও সে ফিরে আসে নিজের সেলাই মেশিনের কাছে— কারণ, মঞ্চের মিথ্যা আবহে তার সত্যিকারের বাবরির অপমান সে সহ্য করতে পারে না। রাইচরণ এক অর্থে শিল্পী— সে সৌন্দর্য চেনে, সম্মান চেনে, নিজের সৃষ্টিকে ভালোবাসে। ‘নদী ও নারী’ গল্পে দেখা যায় এক আধুনিক রমণীকে, যার বাইরের রূপের আড়ালে রয়েছে এক অসাধারণ আত্মত্যাগের কাহিনি— সে বিকলাঙ্গ, যক্ষ্মারোগগ্রস্ত ও অন্ধ স্বামীকে নিয়ে তিন বছর ধরে নদীবক্ষে ভেসে বেড়াচ্ছে বেঁচে থাকার মন্ত্র জোগাতে। ‘গিরগিটি’ গল্পে উঠতি বয়সী মায়া এক বৃদ্ধ প্রতিবেশীর প্রেমের ফাঁদে পড়তে পড়তে হঠাৎই আবিষ্কার করে তার আসল রূপ— যেন গিরগিটির মতোই রঙ বদলায় সে মানুষটা। ‘সামনে চামেলি’ গল্পে ক্রাচ-বগলে এক যুবক নিঃসঙ্গ পথে হেঁটে যায়, দেখে যায় রূপ, আর সেই রূপই তাকে ভিখিরি ভেবে পয়সা ছুড়ে দেয়। ‘চোর’ গল্পের কিশোর মদনের ভেতরের ভয়ংকর সাপ একদিন বেরিয়ে আসে, ধনী-গরিবের ব্যবধান হয়ে ওঠে মুখ্য। ‘তারিণীর বাড়ি বদল’ গল্পে এক দশ সন্তানের পিতার ঠেলাগাড়িতে সংসার সরানোর মর্মস্পর্শী চিত্র আঁকেন তিনি। ‘নীল পেয়ালা’ গল্পে এক কিশোর আত্মহত্যা করতে চায়, অথচ তার সব আছে— বোঝা যায়, আসলে সে আপনজনের সান্নিধ্যবঞ্চিত, নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্প-উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি ও মানুষের একাকার মিলন। প্রকৃতি তার রচনায় কেবল পটভূমি নয়, বরং সমান্তরাল এক চরিত্র। গাছ, পাখি, ফড়িং, বৃষ্টি, নদী, সমুদ্র— সবই তার গল্পে প্রাণ পায়, কথা বলে ওঠে। ‘সমুদ্র’ গল্পের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। পুরীতে একটিমাত্র বেড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছিলেন এই অনন্যসাধারণ গল্পটি। ‘গাছ’, ‘বনের রাজা’, ‘সামনে চামেলি’— এমন অসংখ্য গল্পে তিনি যেন প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলেছেন, আদিম এক গুহামানব হয়ে জড়িয়ে থেকেছেন জীবনের প্রতিটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। প্রকৃতির এই চিত্রময়তা তার গদ্যকে কবিতার কাছাকাছি নিয়ে গেছে। সমালোচকরা প্রায়ই বলেন, তিনি কবিতা দ্বারা আক্রান্ত-অধিকৃত। কিন্তু এই কবিতাময়তাই তার রচনার মানকে তুলে দিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে তিনি নিজে যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তেমনি তার গদ্যও হয়ে উঠেছে চিত্রকল্পে ভরপুর।
বাংলা সাহিত্যে বৃদ্ধ; ছাদের চরিত্র নিয়ে প্রথম গল্প লেখা শুরু করেন জ্যোতিরিন্দ্রই। তিনি ‘ড্রয়িংরুম সাহিত্য’-এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে জীবনের গভীর চোরাবালি থেকে তুলে এনেছেন তার গল্পের উপকরণ। আত্মপরিচয়ে জানিয়েছেন, ‘অনেকে বলে শুনেছি, ঘোরাফেরা না বাড়ালে অভিজ্ঞতা হয় না, লেখালেখির অসুবিধা হয়। আমি বুঝিনি। অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই দরকার, ওটা একটা বেস। কিন্তু মূল ব্যাপার হলো কল্পনা— ইমাজিনেশন। ইমাজিনেশন না থাকলে শুধু অভিজ্ঞতা দিয়ে কিছু হয় না।’
এই নিঃসঙ্গ মানুষটি কখনো পাঠকের সংখ্যা নিয়ে ভাবিত ছিলেন না, পয়সার কথাও ভাবেননি। আপামর জনতার প্রিয় লেখক হয়ে উঠতে পারেননি কখনো, কিন্তু ব্যক্তিসত্তা তথা শিল্পীসত্তার স্বাধীনতা বিসর্জন দেননি কোনোদিন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানবসমাজের স্বাধীনতায় আস্থা পোষণ করাই শিল্পের ধর্ম। নিজেই বলেছেন, ‘আমি জনপ্রিয় হতে পারলাম কি পারলাম না— শিল্পচর্চার সময় কোনো শিল্পীই এ কথাটা মনে রাখে না। নিজের সৃষ্টির মধ্যেই সে নিজেকে দেখে, নিজেকে খোঁজে এবং সমাজ ও পরিবেশের সঙ্গে তার কতটা যোগাযোগ কতটা সম্পর্ক, তা অনুসন্ধান করে বেড়ায়। এই অনুসন্ধানের মধ্যেই শিল্পী হিসেবে তার উত্তরণের বীজ নিহিত আছে।’
শিল্পের এই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষটি জীবনে কখনো আপস করেননি। লেখার জন্য বেছে নিয়েছিলেন বস্তি এলাকা পর্যন্ত। স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, ‘লেখার প্রয়োজনে ওই বস্তিতে থাকতে হবে আমাদের।’ সেই বস্তিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘বারো ঘর এক উঠোন’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাস। বস্তির মানুষদের হাবভাব, আচার-আচরণ, জীবনযাত্রা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তা রূপ দিয়েছেন গল্প-উপন্যাসের চরিত্রে। কিন্তু এর জন্য কখনো নিজেকে ‘সমাজসচেতন’ বা ‘দায়িত্বশীল’ লেখক হিসেবে জাহির করেননি। তিনি শুধু নিজের মতো করে দেখেছেন, লিখেছেন, বেঁচেছেন।
সাহিত্যজীবনে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের তোয়াক্কা করেননি। গল্পের শেষে মোচড় বা চমক প্রথম দিকে থাকলেও পরবর্তীকালে তার রচনা হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক ক্রমপরিণতির দিকে প্রবহমান। ছোটগল্পের যে প্রধান আকর্ষণ একটা ক্লাইম্যাক্স ছোঁয়ার প্রবণতা, তা তিনি রক্ষা করেছেন শেষ পর্যন্ত। কারণ তিনি মনে করতেন, ছোটগল্প তার ধর্মচ্যুত হলে আর ছোটগল্প থাকে না, তার মর্যাদা হারায়।
১৯৮২ সালের ১ আগস্ট জীবনাবসান হয় এই নিঃসঙ্গ কথাকারের। কিন্তু স্ত্রী পারুল নন্দী স্মৃতিচারণায় যা বলেছেন, তা-ই যেন জ্যোতিরিন্দ্রের জীবনের মূলমন্ত্র: ‘ভেতরে একটা আগুন ছিল নিশ্চয়ই, নইলে সারাজীবন এত লিখলেন কী করে?’ আগুন, সেই সঙ্গে চূড়ান্ত নিরাসক্তি। সাফল্য এবং ব্যর্থতা, উভয়ের প্রতি নিরাসক্তি।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় বিরাজ করছেন, যেখানে তার পাশে কাউকে দাঁড় করানো কঠিন। একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই হয়তো তার তুলনা চলে, যে নন-কমার্শিয়াল লেখক হয়েও শুধু সাহিত্যের আয়ের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘তিনি লেখকদের লেখক।’ গৌরকিশোর ঘোষ লিখেছিলেন, ‘এক ধরনের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব যা জ্যোতিরিন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো লেখকের রচনায় ধরা পড়ে না।’ সন্তোষকুমার ঘোষ বলেছিলেন, ‘প্রকৃতিকে এমন জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখিনি আর কারোর লেখায়।’
সেই নিঃসঙ্গ বালক ধনু, যে পুকুরঘাটের পুঁইমাচার পাশে একা দাঁড়িয়ে থাকত, সে-ই একদিন হয়ে উঠেছিল বাংলা কথাসাহিত্যের এক বিশিষ্ট স্তম্ভ। তার শব্দ-অক্ষর আজও ছড়িয়ে আছে সেই উঠোন জুড়ে, যেখানে বারো ঘর নয়, অসংখ্য পাঠকের মন একাকার হয়ে যায়। জ্যোতিরিন্দ্রের গল্প যেন নিঃশব্দে বলে যায়— একা থাকো, একা বাঁচো, একাই শোনো জীবনের গভীরতম সুর। সেই সুর আজও বেজে চলেছে, নিঃসঙ্গ পথিকের পায়ের শব্দের মতো, অশরীরী এক উপস্থিতির মতো।










