আজ সেই দিন— কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান ও লিওন রাসেল। ছবি—টাইম অ্যান্ড লাইফ পিকচার্স/গেটি ইমেজেস
দিনটি ছিল রবিবার। সাপ্তাহিক ছুটি। দুপুর আড়াইটা। নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে উপস্থিত ৪০ হাজার দর্শক।
১৯৭১ সালের কথা। একটি কনসার্ট হবে। গাইবেন বিখ্যাত সংগীত দল বিটলসের শিল্পীরা। বিটলসের লিড গিটারবাদক জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় সেতারবাদক রবিশঙ্কর আয়োজন করেছেন কনসার্ট। কনসার্ট থেকে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য দেওয়া হবে। প্রায় এক কোটি লোক সে সময় ভারতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বাংলাদেশে চলছিল মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম আগুনে ভস্মীভূত করছে। নির্বিচারে হত্যা করছে মানুষ। আগুনে জ্বালিয়ে দিচ্ছে বাড়িঘর, দোকানপাট। গণহত্যা, নারীর সম্ভ্রমহানি, শিশুহত্যাসহ জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী ভারতে। তারা অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। কেউ বা আশ্রয় পেয়েছে শিবিরে। সেখানেও খাদ্যের অভাব, ওষুধপত্রের অভাব, চিকিৎসার অভাব। বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে অনেকেই। এই বিপুল শরণার্থীদের তিনবেলা খাবার, চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মতো আর্থিক ক্ষমতা ভারত সরকারের নেই। কোনো সরকারের পক্ষেই এত শরণার্থীর আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
এই শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য পণ্ডিত রবিশঙ্কর তার বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে আলাপ করেন। রবিশঙ্কর আমেরিকায় একটি কনসার্ট আয়োজনের জন্য হ্যারিসনকে প্রস্তাব দেন। এ কনসার্ট হবে বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য। কনসার্টের অর্থ শরণার্থীদের ত্রাণ হিসেবে দান করা হবে। জর্জ হ্যারিসন প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করেন। উদ্যোগ নেন কনসার্ট আয়োজনের। তার দ্য বিটলস এরই মধ্যে ভেঙে গেছে। তিনি ‘ব্যড ফিঙ্গার’ নামে নতুন দল গঠন করেছেন। তারপরও হ্যারিসন প্রথমেই তার ভেঙে যাওয়া বিটলস সদস্যদের কনসার্টে যোগ দিতে অনুরোধ জানান।
নানা কারণে সবাই যোগ দেননি, তবে রিঙ্গো স্টার যোগ দিতে সম্মত হন। সম্মতি জানান বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন এবং হ্যারিসনের নতুন দল ব্যাড ফিঙ্গারের যন্ত্রী দলসহ অনেকেই। অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সব দিকে গুছিয়ে নিতে সময় নেন পাঁচ সপ্তাহ।
‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শুরু করা হয় পণ্ডিত রবিশঙ্করের একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়ে। তারপর পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও বিখ্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ আলি আকবর খানের যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে। তাদের সঙ্গে তবলায় ওস্তাদ আল্লা রাখা খান। তারা বাংলা ধুন নামে একটি ধুন পরিবেশন করেন। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এই প্রথম কোনো অনুষ্ঠানে হ্যারিসন সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
প্রায় পাঁচ মাস পর এরিক ক্ল্যাপটনও এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতাদের সামনে গান গাইলেন। একে একে গাইলেন জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, বিলি প্রিস্টন, বব ডিলান, ডন প্রিস্টন, জোয়ান বায়েজ।
সঙ্গে যন্ত্রী ছিলেন— এরিক ক্ল্যাপটন, ক্লস ভোরম্যান, জিম কেল্টনার, ব্যাড ফিঙ্গার, পিটি হাম, টম ইভান্স, জোয়ি মোলান্ড, মাইক গিবসন, জেসি এড ডেভিস, কার্ল র্যডলি, দ্য হলিউড হর্নস্সহ আরও অনেকে। এদিন দুটি পর্বে কনসার্ট হয়। বব ডিলান ১৯৬৯ সালের পর শ্রোতা-দর্শকদের উপস্থিতিতে কোনো সংগীত পরিবেশন করেননি। দীর্ঘ বিরতির পর আজ আবার দর্শক-শ্রোতাদের সামনে গাইলেন।
ম্যাডিসন স্কোয়ারের কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রতিবাদী গানের রাজা বব ডিলান। তিনি গেয়েছিলেন ছয়টি গান, মি. ট্যাম্বুরিনম্যান থেকে শুরু করে তার লেখা ও সুরারোপিত ৫০ লাইনের বিখ্যাত গান আ হার্ড রেইন ইজ গোননা ফল। বব ডিলানের গানের সঙ্গে গিটার বাজান জর্জ হ্যারিসন, বেজে লিওন রাসেল ও ট্যাম্বুরিনে রিঙ্গো স্টার। বিটলসের অন্যতম সদস্য রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, ডন প্রেস্টনসহ অনেকেই গান পরিবেশন করেন, গিটার বাজান।
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশের জন্য জর্জ হ্যারিসন লেখেন নতুন গান। অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে গানটি পরিবেশন করা হয়। তার গানটি ছিল— এলো একদিন বন্ধু আমার/চোখভরা তার ধু-ধু হাহাকার/বলে গেল, চাই শুধু সহায়তা/দেশ তার আজ ধুঁকে ধুঁকে মরে/বেশি কিছু আমি জানতে চাই না।
আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সুরের মধ্যে আর্তনাদের মতো করুণ অথচ দৃঢ়কণ্ঠে জর্জ হ্যারিসনের এ গান সেদিন কনসার্টকে আলোড়িত করে, জাগিয়ে তোলে বিশ্ববিবেক। পুরো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ছাড়াও জর্জ হ্যারিসন একক সংগীত পরিবেশন করেন ছয়টি। এই কনসার্টের মাধ্যমে সাহায্য হিসেবে পাওয়া যায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮ ডলার ৫১ সেন্ট। এ পুরো অর্থই ভারতের আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য ইউনিসেফকে দেওয়া হয়।
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ থেকে একটি লাইভঅ্যালবাম, একটি বক্স-থ্রি রেকর্ড সেট প্রকাশ হয়। ১৯৭২ সালে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে অ্যাপল ফিল্মস। লাইভ অ্যালবামটি সর্বাধিক বিক্রয়কৃত অ্যালবাম হিসেবে স্থান করে নেয়। ২০০৫ সালে কনসার্টের চলচ্চিত্রটিকে একটি তথ্যচিত্রসহ নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়।
২০২১ সালে কনসার্টের ৫০ বছর পূর্তিতে নিউ ইয়র্কে আয়োজন করা হয় একটি উৎসবের। ৩১ জুলাই, শনিবার বিকালে নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইশ সেন্টারে ‘ফ্রেন্ডস অব ফ্রিডম’ নামে একটি সংগঠন আয়োজন করে উৎসবের। সেই কনসার্ট নিয়ে সাংবাদিক শামীম আল আমিনের পরিচালনায় নির্মিত ‘একটি দেশের জন্য গান’ বা ‘সং ফর এ কান্ট্রি’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসবে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত শামীম আল আমিনের লেখা ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করা হয়। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ১৯৭১ সালের কনসার্টে অংশ নেওয়া কিংবদন্তি সরোদবাদক ওস্তাদ আলী আকবর খানের বড় ছেলে এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত শিল্পী ওস্তাদ আশীষ খান অনুষ্ঠানে সরোদ পরিবেশন করেন। মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক ও আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। একাত্তরের সেই দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ- এর প্রত্যক্ষদর্শী নিউ জার্সির বাসিন্দা দুই বোন লিন্ডা ও ম্যারিয়ন অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণ বিসর্জন, দেশের মানুষের ত্যাগ আর বড় শক্তি ছিল বিদেশি বন্ধুদের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত মেডিসন স্কোয়ারে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উপমহাদেশের কিংবদন্তি সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং পাশ্চাত্য সংগীত ব্যক্তিত্ব জর্জ হ্যারিসনের আয়োজন ছিল অসামান্য। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অবস্থানে ছিল। সে দেশের অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও এ কনসার্ট ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তোলে।
কনসার্টের উদ্দেশ্য ছিল শরণার্থীদের সহায়তা দেওয়া। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ ও নির্মমতা চলাচ্ছে সে সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানানো। ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ তার উদ্দেশ্য অর্জনে পুরোপুরি সফল হয়, প্রবলভাবে জনমত গড়ে ওঠে বাংলাদেশের পক্ষে। বিশ্ববাসী জানতে পারে যে, জাতিগত মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য এশিয়ার একটি দেশের মানুষ যুদ্ধ করছে। সেই দেশটির নাম বাংলাদেশ।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক







