অপ্রতিম হত্যায় শঙ্কিত মায়েরা, মনে শত প্রশ্ন

অপ্রতিমের মায়ের আহাজারি
মায়ের আইফোনটি সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার বিকালে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। এরপর আর কোনো খোঁজ নেই। মায়ের হয়তো ভাবনাতেই ছিল না এটাই হবে সন্তানের সঙ্গে শেষ দেখা। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। কিন্তু ঘরে ফিরল না ছেলে। ফোন বেজে উঠবে, ওপাশ থেকে অপ্রতিমের কণ্ঠ শোনা যাবে— এমন অপেক্ষায় গড়াতে থাকে সময়। কোথায় গেল, কার সঙ্গে আছে, কখন ফিরবে— অজানা শঙ্কা ভর করে মা-বাবার বুকে। শেষ পর্যন্ত সদর দক্ষিণ মডেল থানায় করা হয় জিডি। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর অপ্রতিমের খোঁজ মিলল লালমাই পাহাড়ের সানন্দা জঙ্গলে; তবে তার নিথর দেহ।
একইভাবে ৯ সেপ্টেম্বর বিকালে বাবার সঙ্গে বাজার থেকে বাড়ি ফিরেছিল ১০ বছরের কামরুন্নাহার কলি। মায়ের হাতে বাজারের ব্যাগ তুলে দিয়ে আবার বাড়ি থেকে বের হয় সে। এরপর আর ফেরেনি। বাড়ির কাছেই পাওয়া যায় তার স্যান্ডেল। নিখোঁজের পরদিন থানায় জিডি করেন বাবা। সাত দিন পর গত বৃহস্পতিবার বাড়ির পাশের ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হয় কলির মরদেহ। পুলিশ বলছে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুজনকে।
এভাবে প্রায়ই অপ্রতিম বা কলির মতো শিশু নিখোঁজের খবর আসে সামনে। তাদের কেউ কেউ ফিরে আসছে মায়ের কোলে। কেউবা হত্যার শিকার হয়ে ফিরছে নিথর দেহ হয়ে। আবার অনেকের কোনো সন্ধানই পান না স্বজনরা। খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো খোঁজ মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
অপ্রতিম নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধারের পর দেশের মায়েদের মধ্যে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে নতুন করে। অপ্রতিমের সন্ধানে তার মা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নাহিদা নাহিদের দেওয়া ফেসবুক পোস্ট গত শুক্রবার রাত ও গতকাল শনিবার সকাল থেকেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেসব পোস্টের মন্তব্যের ঘরে জমা হয়েছে অপ্রতিমের জন্য অসংখ্য শোকগাথা। এর মধ্যে অনেক মন্তব্যে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বহু বাবা-মা।
নারী গণমাধ্যমকর্মী মুসলিমা জাহান সেতু বলছিলেন, ‘চারদিকে নানান ধরনের সহিংসতার খবর। নিজের ও স্বজনদের সন্তানদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। কোনদিক থেকে কোন ক্ষতি হয়ে যায়। কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। সবাইকে সন্দেহ হয়। সেজন্য চার বছরের মেয়েকে নিজের বা স্বামীর কর্মস্থলের আশপাশে রেখে চাকরি করছি। মেয়ে রোজ চারবার মেট্রোরেলে চলাচল করে। সেখানেও বোমা উদ্ধার। ফেসবুক খুললে শুধুই নৃশংসতার খবর। মায়েরা এত মানসিক চাপে থাকি যে, স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
পারভেজ খান নামে একজন লিখেছেন, ‘অসহ্য, দেশটাকে কি আমরা শিশুদের বাসযোগ্য করতে পারব না।’
তাজুল ইসলাম নামে আরেক গণমাধ্যমকর্মী লিখেছেন, ‘নিষ্পাপ শিশুর লাশ বুকে নিয়ে এই রাষ্ট্র ঘুমায় কীভাবে?’
নাহিদ সালমা নামে একজন লিখেছেন, ‘আপনি অনেক কষ্ট করে বাচ্চা লালনপালন করবেন। বড় করবেন, আদরে রাখবেন। একদিন কেউ এসে আপনার আদরের সন্তানকে মেরে ফেলবে। জীবন এত সস্তা, মনে হয় না আর কোথাও আছে। অপ্রতিমের নিখোঁজের খবরটা কাল থেকে দেখেছি। আমি নিজের ওয়ালে শেয়ার দিইনি। কারণ এর আগে আমি এমন যত নিউজ শেয়ার দিয়েছি, কেউ জীবিত ফেরেনি। শেষে আজ সকালে শেয়ার দিয়েছি এই ভেবে যদি কেউ উপকার করতে পারে। আমি খুব করে দোয়া করেছিলাম ওকে যেন জীবিত পাওয়া যায়। পাওয়া গেল না। এ কেমন দেশ আমাদের, এ কেমন নির্মমতা!’
গত বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর থেকে নিখোঁজ হয় ছোট্ট আব্দুল্লাহ। এ খবর জানিয়ে খান অপর্ণা নামে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “গতকাল আসরের নামাজের সময় হয়েছিল। অজু করে হাসিমুখে বলল, ‘আম্মু/আব্বু, আমি নামাজ পড়তে যাচ্ছি।’ আমরা ভাবতেও পারিনি, মাসুম বাচ্চার সেই শেষ বাক্যটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আঁধার নেমে আনবে! সন্তান বাড়ি থেকে বের হলো, কিন্তু আর ফিরে এলো না...। ঝাউচর এলাকার চারপাশ, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, হাসপাতাল— এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আমরা ওকে খুঁজিনি। কিন্তু আমাদের বুক খালি করে আমাদের ফুটফুটে বাবাটা হারিয়ে গেছে! একমুহূর্ত না দেখে যাকে থাকতে পারতাম না, সেই সন্তান ছাড়া পুরো পরিবার আজ পাগলপ্রায়। প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চোখের পানিতে, আর এক বুক হাহাকার নিয়ে।’
নারী ও শিশুরা শারীরিকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাদের নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘সাম্প্রতিককালে শিশু নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনাগুলো নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব অপরাধের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে অপরাধের ধরন ও প্রবণতা শনাক্ত করতে হবে। সেই ট্রেন্ড অ্যানালাইসিসের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষায় বিশেষায়িত দক্ষ ইউনিট গঠন করা জরুরি। অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনতে হবে, যাতে একই অপরাধ পুনরাবৃত্তির সুযোগ না পায়। তবে বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানি বা শাস্তির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’
‘শিশুদের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি আস্থার বিষয়টিও’— যোগ করলেন অধ্যাপক সিদ্দিকী।
নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দেশে চালু হয় প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কতা ব্যবস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন অ্যালার্ট)। চলতি বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সমন্বয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সিআইডি সমন্বয় করছে না বলে অভিযোগ মুন অ্যালার্টের। এতে শিশু উদ্ধারে একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
শিশু নিখোঁজ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্মের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদাত রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘থানা থেকে শিশু মিসিং হওয়া নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। পরে মেটার সহযোগিতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে মুন অ্যালার্ট চালু করি। সিআইডির সঙ্গে পার্টনারশিপে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। আমরা তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, কিন্তু উদ্ধার করতে পারি না। উদ্ধার ও তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এজন্য নিখোঁজ শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট প্রয়োজন। দেশে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের জন্য আলাদা কোনো জাতীয় ডেটাবেজ, বিশেষ বাজেট কিংবা বিশেষায়িত ইউনিট নেই। ফলে অনেক পরিবার বছরের পর বছর সন্তান হারানোর বেদনা নিয়ে অপেক্ষা করছে।’
শিশু নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, ছোট শিশুরা সাধারণত পরিবারের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার পথে অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে কারণ কিছুটা ভিন্ন। অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব এবং পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা তাদের বাড়ি ছাড়ার অন্যতম কারণ।
নিখোঁজ শিশুদের স্বজনরা জানিয়েছেন, নিখোঁজ বা অপহরণ যাই হোক, থানা পুলিশ ২৪ ঘণ্টা পর জিডি নেয়। অনেক ক্ষেত্রে জিডির দু-তিন দিন পর তদন্ত শুরু করে বলেও অভিযোগ। নিখোঁজের পর মৃত শিশু উদ্ধারের সংখ্যাও কম নয়। গত ৯ জুলাই ময়মনসিংহের তারাকান্দা থেকে নিখোঁজ হয় দুই বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। নিখোঁজের পর শিশুটিকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও পাওয়া না গেলে থানায় জিডি করে পরিবার। এর দুদিন পর ওই শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো— অনেক শিশু পাচার চক্রের হাতে পড়ে দেশের বাইরে চলে যায় অথবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।



