আয়নায় একা উত্তম কুমার

উত্তম কুমারের স্কেচ। ছবি: এআই
উত্তম কুমারের বাড়ির দেয়ালে একটি বিশাল আকৃতির আয়না বসানো ছিল। আয়নার সামনে অভিনয় অনুশীলন করতে তিনি। আয়নায় তখন যে মানুষটির অবয়ব ভেসে উঠত তিনি কি সিনেমাপ্রেমী বাঙালির মহানায়ক, লার্জার দ্যান লাইফ উত্তম কুমার, নাকি মুখোশের আড়ালে হারিয়ে গিয়ে নিজস্ব মুখশ্রী খুঁজে ফেরা একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি?
উত্তম কুমার যদি যদি অভিনেতা না হতেন তাহলে কোন পরিচয়ের বৃত্তে বেঁচে থাকতেন? ফুটবলার, কবি ঔপন্যাসিক নাকি সিনেমা হলের টিকেট ব্ল্যাকার? সফলতাহীন, উজ্জ্বল আলোর বৃত্তের বাইরে হয়ত একজন সাধারণ মানুষ হয়েই টিকে থাকতে হতো তাকে। কিন্তু এসবের কিছুই হননি তিনি। আমাদের সাধারণ জীবনের গল্পের বাইরে গিয়ে হয়ে উঠেছিলেন সফল একজন অভিনেতা; বাঙালির স্বপ্নের নায়ক। মৃত্যু তাকে গ্রাস না করলে আজ তার বয়স হতো ৯৯ বছর। কিন্তু আজও তিনি ৫৩ বছর বয়সেই আটকে রইলেন মানুষের স্মৃতির পর্দায়। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরেও ভক্তদের হৃদয়ে তার রাজ্যপাট অটুট রয়ে গেল। উত্তম কুমার ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
কবি, চলচ্চিত্রকার পুর্নেন্দু পত্রী ষাটের দশকের মাঝামাঝি উত্তম কুমারকে তার একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প অবলম্বনে তৈরি হবে সিনেমা। উত্তম কুমার তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কোনো এক কারণে। তার মৃত্যুর পর লেখা একটি দীর্ঘ রচনা পুর্নেন্দু পত্রী শেষ করেছিলেন এভাবে, ‘‘নায়ক-এর পর আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, যে আগুন মশালে জ¦লার কথা,তাকে কত দীর্ঘদিন আপনি ভরে রেখেছিলেন দেশলাইয়ের কাঠিতে? শুনতে পান বা না পান,তবু বলছি, প্রতিভার অপব্যবহারেও আপনি ছিলেন অসম্ভব এক প্রতিভাধর’’।
সত্যিই কি নিজের অভিনয় প্রতিভার অপচয় করেছিলেন তিনি? সিনেমার জনপ্রিয় ধারায় নিজেকে আরও বর্ণময় করে তুলতে, বাংলা সিনেমায় নিজের অবস্থানকে এক এবং অদ্বিতীয় করে রাখতে কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি হননি? কবি ও গদ্যকার সুবিমল মিশ্র উত্তম কুমার প্রসঙ্গে একটি লেখয় লিখেছিলেন, ‘‘উত্তম কুমার বাংলার হিরো। বাঙালির হিরো। সে চা খায়, সিগারেট খায়, হুইস্কিও খায়, নায়িকাদের জড়িয়েও ধরে পর্দায় কিন্তু কখনো চুমু খায় না’’। পর্দায় নায়িকার সঙ্গে চুম্বন দৃশ্যই কি একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তাকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা দিতে পারত? নাকি বাঙালি দর্শকের কাছে ৫৪ বছর বয়সী উত্তম কুমার চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করা ছাড়াই অমরত্ব পেয়ে গেলেন?
দর্শকদের মনের ঠিক কোন জায়গায় কড়া নেড়েছিলেন তিনি? আসলে তিনি একটি সময়ের সংস্কৃতিকেই পাল্টে দিয়েছিলেন নিজের বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় দিয়ে। আর কোনো বাঙালি অভিনেতার পক্ষে এই কাজটি করা সম্ভব হয়নি। তার চলাফেরা, পোশাক, চুলের কাট-সবকিছুই হয়ে উঠেছিল পুরুষ দর্শকদের অনুকরণের বিষয়। কারণ হাজার হাজার নারী যে উত্তম কুমারকে ভালোবাসতেন। নায়ককে তারা পর্দা থেকে নিজেদের জীবনের আরাধ্য পুরুষ বলে স্থান দিয়েছিলেন হৃদয়ে।
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার ভালোবাসার উড়ো গল্পও একদা সৃষ্টি করেছিল অজস্র তরঙ্গ। তাদের দুজনের প্রেমের বাঘ যদি সত্যি সত্যি হেমন্তের অরণ্যে বের হয়ে পড়তো তাহলে এই মহানায়কের রাজ্যপাট এভাবে কি অটুট থাকতো? কষ্ট পেয়েছিলেন উত্তম কুমার প্রেম পূর্ণতা না পাওয়ায়? সিনেমার বাইরে একান্ত ব্যক্তিগত কোনো বেদনার অরণ্যে পথ হারিয়েছিলেন হয়তো। তাই উত্তম কুমারের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, ‘ওর বুকে মালা দিতে পারব না। ওখানে বড্ড কষ্ট।’
কোন কষ্টের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন সুচিত্রা সেন? কোন গোপন আগুন চারপাশে হাজার ভক্ত আর স্তাবকদের ভিড়ের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে নিঃশব্দে পুড়িয়েছিল? অভিনয় দিয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রায় দুইশ সিনেমায় অভিনয় করেছেন নায়কের ভ‚মিকায়। অসংখ্য হিট সিনেমা তার সঞ্চয়ে। হয়ত বলা যায়, সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমার চরিত্রটি-ই ছিল আসল উত্তমের মতো মানবিক, অসহায়, বাউন্ডুলে, আশ্রয়প্রার্থী এবং উদাসীন। নিজের অফস্ক্রিন জীবনটাই চরিত্রের গল্প হতে গিয়ে তার গল্প হয়ে উঠল।




