প্রয়াণস্মরণে লুই বুনুয়েল
ইউরোপের আর্ট-মাস্টার না মেক্সিকোর এন্টারটেইনার? বুনুয়েল আসলে কে?

লুই বুনুয়েল
আমি আজ আপনাদের এমন এক চলচ্চিত্রকারের গল্প শোনাব, যাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিস্ময়কর দ্বৈত জগৎ আর তাকে বলা হয় ফাদার অব সিনেম্যাটিক সুররিয়ালিজম। তাঁর নির্মাণের একদিকে ইউরোপের শানিত আর্ট-সিনেমা— ‘বেল দ্য জুর’-এর নিষিদ্ধ কল্পনার দুনিয়া, ‘দ্য ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়া’র আজব স্বপ্নলোক। অন্যদিকে আরেক জগৎ—মেক্সিকোর ধুলোমাটি, স্টুডিওর টিনের শেড, যেখানে পট-বয়লার বানাতে বানাতে এক মানুষ নিজের মনের গহিন থেকে তুলে এনেছিলেন বিস্ফোরক সব সিনেমা।
যারা বুনুয়েল-ভক্ত তারা নিশ্চয়ই এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছেন। আর যারা এখনও বুনুয়েলের কোনো ছবি দেখেননি, তারা হয়তো ভাবছেন, ‘ওটা তো দুর্বোধ্য আর্ট ফিল্ম হবে!’ কিন্তু আমি বলব, বুনুয়েলের সিনেমা হলো এমন এক রকমের টাইম-বোমা; জনপ্রিয় গল্প, মেলোড্রামা কিংবা কমেডির মোড়কে তিনি এমন সব প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যা আমাদের তথাকথিত ভদ্রসমাজের ঘুম হারাম করে দেয়। আর এই বিস্ময়কর সব সিনেমার বুনুয়েল-অধ্যায়টা লেখা হয়েছে মেক্সিকো নামের যে দেশটাতে, যাকে তিনি নিজের করে নিয়েছিলেন, সেইখানে বসেই।
যে মানুষটা পরাবাস্তববাদী বিপ্লবের সন্তান, যিনি স্যালভাদর দালির সঙ্গে মিলে বানিয়েছিলেন ‘আঁ শিয়েন আঁদালু’ (১৯২৯)—যেই ছবির শুরুতে এক যুবকের হাতে ক্ষুর এসে কাটে একটি মেয়ের চোখের মনি— সেই মানুষটিই বিশ বছর পর মেক্সিকান স্টুডিওর আলোয় দাঁড়িয়ে বানাচ্ছেন পারিবারিক মেলোড্রামা, কমেডি, এমনকি স্টার-নির্ভর লোকগল্প! প্রথম শ্রোতা হিসেবে এটা শুনলে চমকে ওঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু বুনুয়েলের জীবনটাই তো এমন চমকে ভরা। সেই চমকের গল্পই আজ করবো তাকে নিয়ে এই লেখায়, তার প্রয়াণদিনে, তাঁকে ভালোবাসতে বাসতে।
জন্ম ঠিক ১৯০০ সালে, স্পেনের কালান্দার এক কঠিন ক্যাথলিক ধনী পরিবারে। জেসুইট স্কুলের শৃঙ্খল থেকে পালিয়ে তরুণ লুইস ঢুকেছিলেন মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে, যেখানে তাঁর বন্ধু ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, সালভাদর দালির মতো ভবিষ্যতের কিংবদন্তিরা। তারপর প্যারিস। সেখানে ১৯২৮ সালে দালির সঙ্গে মাত্র তিন দিনে স্বপ্ন আর কল্পনার আদান-প্রদানে লিখে ফেললেন ‘আঁ শিয়েন আঁদালু’-এর চিত্রনাট্য। ছবিটি দর্শককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। সেখানে কোনো কারণ-পরম্পরা নেই, নেই চেনা বাস্তবতার ছায়া; বরং একের পর এক স্বপ্নময় ইমেজ বিঁধছে দর্শকের মনের গভীরে। এরপর ‘লা দর’ (১৯৩০)—আরও ভয়ংকর, আরও বিদ্রুপাত্মক। যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্সের পাশে দেখা যায় গায়ে গোবর মাখা গরু শুয়ে আছে বিলাসী খাটে; খ্রিস্টের মতো এক মানুষ হাঁটছেন, অথচ শেষে বেরিয়ে আসেন অন্ধকার ইচ্ছার প্রতিমূর্তি। প্যারিসের দর্শক হলে কালি ছুড়েছিলেন, পত্রিকায় নিন্দার ঝড় উঠেছিল, আর ছবিটা নিষিদ্ধ হয়েছিল চল্লিশ বছরের জন্য।
কিন্তু বিস্ফোরক শুরু করলেই তো ক্যারিয়ার গড়া যায় না। স্বপ্নের প্যারিস থেকে বাস্তবের ধাক্কায় বুনুয়েল গিয়ে পড়লেন আমেরিকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও তার ঠিক পরে পরে, নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-এ চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু দালির আত্মজীবনী বেরোনোর পর বুনুয়েলের অতীত নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে, আর তিনি হারান সবধন নীলমনি চাকরিটা। হলিউডে গিয়ে কপাল খুলল না—স্রেফ ডাবিংয়ের ছোটখাটো কাজ ছাড়া কিছুই জুটল না। যে মানুষটা সিনেমার ভাষা পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁকে তখন ভাবতে হচ্ছে, জীবনের কী হবে? আর খাবেনই বা কী?ঠিক সেই ভাঙা সময়ে, ১৯৪৬ সালে এক বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ঢুকে পড়লেন মেক্সিকোয়। কোনো বড় পরিকল্পনা ছিল না, অথচ সেই দেশই হয়ে উঠল তাঁর দ্বিতীয় জন্মভূমি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মেক্সিকো সিটি ছিল প্রাণবন্ত এক কসমোপলিটান কেন্দ্র, স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালানো অজস্র শিল্পী-বুদ্ধিজীবীর নিরাপদ আশ্রয়। তারই আবহে বুনুয়েল খুঁজে পেলেন যেনো তার নিজের জায়গা। ১৯৪৯ সালে তিনি স্প্যানিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে পুরোদস্তুর মেক্সিকান নাগরিক হয়ে গেলেন। এরপর শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা— টানা প্রায় আঠারো বছরে তিনি মেক্সিকোর স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যে থেকে বানিয়ে ফেললেন একুশটি ছবি।এখানেই বুনুয়েল-কিংবদন্তির আসল চমক। মেক্সিকোর স্টুডিও তখন বানাত একই ছাঁচে গড়া কমেডি, নাচ-গানের মেলোড্রামা, রোম্যান্টিক ট্র্যাজেডি। বুনুয়েল সেই ছাঁচগুলোই নিলেন, কিন্তু ভেতরে আক্ষরিক অর্থেই ভরে দিলেন বিষ। তিনি বুঝেছিলেন, বিপ্লব শুধু রূপে নয়, বিষয়ের আড়ালে থেকেও আঘাত করে। ফলে ‘সুসানা’ (১৯৫১) নামের ছবিতে দেখা গেল, ঝড়ের রাতে জেল থেকে পালানো এক তরুণী এসে ঢোকে এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে। চকচকে মেক্সিকান মেলোড্রামার সব উপকরণ আছে—সুন্দরী নায়িকা, প্রাসাদতুল্য হর্ম্য, প্রেম-ভালোবাসা। অথচ বুনুয়েল দেখালেন, সেই মেয়ে কীভাবে একে একে পরিবারের পিতৃমূর্তি, পুত্র, এমনকি খামারের চাকরকেও যৌন আবেশে পাগল করে দিয়ে পুরো সংসারটাকে গুঁড়িয়ে দেয়। কোনো নৈতিক শিক্ষা নেই, নেই অশ্রুভেজা সমাপ্তি। বরং বুনুয়েল বলতে চান, তোমাদের এই পবিত্র পরিবার-ব্যবস্থাটা আসলে কতখানি ঠুনকো, নারীর লাগামছাড়া কামনার সামনে কত অসহায়! এই ছবি একই সঙ্গে কালো কমেডি আর সমাজের ওপর দিয়ে বুলডোজার-চালিয়ে দেয়া এক সমালোচনা। পাসোলিনির ‘তেওরেমা’র কয়েক বছর আগেই বুনুয়েল বুঝিয়ে দিলেন, একজন বহিরাগত কীভাবে একটা বুর্জোয়া পরিবারের ভিত পুরোপুরি নড়িয়ে দিতে পারে।






