প্রয়াণস্মরণে লুই বুনুয়েল
ইউরোপের আর্ট-মাস্টার না মেক্সিকোর এন্টারটেইনার? বুনুয়েল আসলে কে?

লুই বুনুয়েল
আমি আজ আপনাদের এমন এক চলচ্চিত্রকারের গল্প শোনাব, যাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিস্ময়কর দ্বৈত জগৎ আর তাকে বলা হয় ফাদার অব সিনেম্যাটিক সুররিয়ালিজম। তাঁর নির্মাণের একদিকে ইউরোপের শানিত আর্ট-সিনেমা— ‘বেল দ্য জুর’-এর নিষিদ্ধ কল্পনার দুনিয়া, ‘দ্য ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়া’র আজব স্বপ্নলোক। অন্যদিকে আরেক জগৎ—মেক্সিকোর ধুলোমাটি, স্টুডিওর টিনের শেড, যেখানে পট-বয়লার বানাতে বানাতে এক মানুষ নিজের মনের গহিন থেকে তুলে এনেছিলেন বিস্ফোরক সব সিনেমা।
যারা বুনুয়েল-ভক্ত তারা নিশ্চয়ই এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছেন। আর যারা এখনও বুনুয়েলের কোনো ছবি দেখেননি, তারা হয়তো ভাবছেন, ‘ওটা তো দুর্বোধ্য আর্ট ফিল্ম হবে!’ কিন্তু আমি বলব, বুনুয়েলের সিনেমা হলো এমন এক রকমের টাইম-বোমা; জনপ্রিয় গল্প, মেলোড্রামা কিংবা কমেডির মোড়কে তিনি এমন সব প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যা আমাদের তথাকথিত ভদ্রসমাজের ঘুম হারাম করে দেয়। আর এই বিস্ময়কর সব সিনেমার বুনুয়েল-অধ্যায়টা লেখা হয়েছে মেক্সিকো নামের যে দেশটাতে, যাকে তিনি নিজের করে নিয়েছিলেন, সেইখানে বসেই।
যে মানুষটা পরাবাস্তববাদী বিপ্লবের সন্তান, যিনি স্যালভাদর দালির সঙ্গে মিলে বানিয়েছিলেন ‘আঁ শিয়েন আঁদালু’ (১৯২৯)—যেই ছবির শুরুতে এক যুবকের হাতে ক্ষুর এসে কাটে একটি মেয়ের চোখের মনি— সেই মানুষটিই বিশ বছর পর মেক্সিকান স্টুডিওর আলোয় দাঁড়িয়ে বানাচ্ছেন পারিবারিক মেলোড্রামা, কমেডি, এমনকি স্টার-নির্ভর লোকগল্প! প্রথম শ্রোতা হিসেবে এটা শুনলে চমকে ওঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু বুনুয়েলের জীবনটাই তো এমন চমকে ভরা। সেই চমকের গল্পই আজ করবো তাকে নিয়ে এই লেখায়, তার প্রয়াণদিনে, তাঁকে ভালোবাসতে বাসতে।
জন্ম ঠিক ১৯০০ সালে, স্পেনের কালান্দার এক কঠিন ক্যাথলিক ধনী পরিবারে। জেসুইট স্কুলের শৃঙ্খল থেকে পালিয়ে তরুণ লুইস ঢুকেছিলেন মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে, যেখানে তাঁর বন্ধু ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, সালভাদর দালির মতো ভবিষ্যতের কিংবদন্তিরা। তারপর প্যারিস। সেখানে ১৯২৮ সালে দালির সঙ্গে মাত্র তিন দিনে স্বপ্ন আর কল্পনার আদান-প্রদানে লিখে ফেললেন ‘আঁ শিয়েন আঁদালু’-এর চিত্রনাট্য। ছবিটি দর্শককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। সেখানে কোনো কারণ-পরম্পরা নেই, নেই চেনা বাস্তবতার ছায়া; বরং একের পর এক স্বপ্নময় ইমেজ বিঁধছে দর্শকের মনের গভীরে। এরপর ‘লা দর’ (১৯৩০)—আরও ভয়ংকর, আরও বিদ্রুপাত্মক। যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্সের পাশে দেখা যায় গায়ে গোবর মাখা গরু শুয়ে আছে বিলাসী খাটে; খ্রিস্টের মতো এক মানুষ হাঁটছেন, অথচ শেষে বেরিয়ে আসেন অন্ধকার ইচ্ছার প্রতিমূর্তি। প্যারিসের দর্শক হলে কালি ছুড়েছিলেন, পত্রিকায় নিন্দার ঝড় উঠেছিল, আর ছবিটা নিষিদ্ধ হয়েছিল চল্লিশ বছরের জন্য।
কিন্তু বিস্ফোরক শুরু করলেই তো ক্যারিয়ার গড়া যায় না। স্বপ্নের প্যারিস থেকে বাস্তবের ধাক্কায় বুনুয়েল গিয়ে পড়লেন আমেরিকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও তার ঠিক পরে পরে, নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-এ চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু দালির আত্মজীবনী বেরোনোর পর বুনুয়েলের অতীত নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে, আর তিনি হারান সবধন নীলমনি চাকরিটা। হলিউডে গিয়ে কপাল খুলল না—স্রেফ ডাবিংয়ের ছোটখাটো কাজ ছাড়া কিছুই জুটল না। যে মানুষটা সিনেমার ভাষা পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁকে তখন ভাবতে হচ্ছে, জীবনের কী হবে? আর খাবেনই বা কী?
ঠিক সেই ভাঙা সময়ে, ১৯৪৬ সালে এক বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ঢুকে পড়লেন মেক্সিকোয়। কোনো বড় পরিকল্পনা ছিল না, অথচ সেই দেশই হয়ে উঠল তাঁর দ্বিতীয় জন্মভূমি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মেক্সিকো সিটি ছিল প্রাণবন্ত এক কসমোপলিটান কেন্দ্র, স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালানো অজস্র শিল্পী-বুদ্ধিজীবীর নিরাপদ আশ্রয়। তারই আবহে বুনুয়েল খুঁজে পেলেন যেনো তার নিজের জায়গা। ১৯৪৯ সালে তিনি স্প্যানিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে পুরোদস্তুর মেক্সিকান নাগরিক হয়ে গেলেন। এরপর শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা— টানা প্রায় আঠারো বছরে তিনি মেক্সিকোর স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যে থেকে বানিয়ে ফেললেন একুশটি ছবি।
এখানেই বুনুয়েল-কিংবদন্তির আসল চমক। মেক্সিকোর স্টুডিও তখন বানাত একই ছাঁচে গড়া কমেডি, নাচ-গানের মেলোড্রামা, রোম্যান্টিক ট্র্যাজেডি। বুনুয়েল সেই ছাঁচগুলোই নিলেন, কিন্তু ভেতরে আক্ষরিক অর্থেই ভরে দিলেন বিষ। তিনি বুঝেছিলেন, বিপ্লব শুধু রূপে নয়, বিষয়ের আড়ালে থেকেও আঘাত করে। ফলে ‘সুসানা’ (১৯৫১) নামের ছবিতে দেখা গেল, ঝড়ের রাতে জেল থেকে পালানো এক তরুণী এসে ঢোকে এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে। চকচকে মেক্সিকান মেলোড্রামার সব উপকরণ আছে—সুন্দরী নায়িকা, প্রাসাদতুল্য হর্ম্য, প্রেম-ভালোবাসা। অথচ বুনুয়েল দেখালেন, সেই মেয়ে কীভাবে একে একে পরিবারের পিতৃমূর্তি, পুত্র, এমনকি খামারের চাকরকেও যৌন আবেশে পাগল করে দিয়ে পুরো সংসারটাকে গুঁড়িয়ে দেয়। কোনো নৈতিক শিক্ষা নেই, নেই অশ্রুভেজা সমাপ্তি। বরং বুনুয়েল বলতে চান, তোমাদের এই পবিত্র পরিবার-ব্যবস্থাটা আসলে কতখানি ঠুনকো, নারীর লাগামছাড়া কামনার সামনে কত অসহায়! এই ছবি একই সঙ্গে কালো কমেডি আর সমাজের ওপর দিয়ে বুলডোজার-চালিয়ে দেয়া এক সমালোচনা। পাসোলিনির ‘তেওরেমা’র কয়েক বছর আগেই বুনুয়েল বুঝিয়ে দিলেন, একজন বহিরাগত কীভাবে একটা বুর্জোয়া পরিবারের ভিত পুরোপুরি নড়িয়ে দিতে পারে।
এর পরের বছরই বানালেন ‘এল ব্রুটো’ (১৯৫২)। নাম শুনলে মনে হয় কোনো রেসলার-ছবি। নায়ক পেদ্রো আরমেন্দারিজ, মেক্সিকান সিনেমার সুপারস্টার। কিন্তু বুনুয়েলের হাতে ‘এল ব্রুটো’ হয়ে উঠল এক বিষণ্ণ দানব, যার পেশিশক্তি অসীম, অথচ নিজের জীবনটাকে সে গুছিয়ে রাখতে পারে না। এক শোষক বাড়িওয়ালা তাকে ব্যবহার করে দরিদ্র ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করতে, আবার সেই বাড়িওয়ালার স্ত্রী (কাতি হুরাদোর অনবদ্য অভিনয়) তাকে ফাঁদে ফেলে নিজের খেলার পুতুল বানায়। মাচিসমো, অর্থাৎ পুরুষালি দাপটের যে সংস্কৃতি, তাকে বুনুয়েল এখানে দেখালেন একই সঙ্গে ভয়ংকর আর করুণ করে— যে মানুষটা পাথর ভাঙার শক্তি রাখে, সে-ই আবার একটা নারীর কারসাজিতে ভেঙে চুরমার টুকরো টুকরো হয়ে যায়। মেক্সিকোর স্টুডিও চাইত একটা মারদাঙ্গা বিনোদন; পেল এক তীব্র শ্রেণি-রাজনীতির দলিল।
বুনুয়েল মেক্সিকোতে এসে প্রথম বড় চমক দেখিয়েছিলেন ‘লস অলভিদাদোস’ (১৯৫০) দিয়ে। এটা নির্মম বাস্তবতার ছবি। মেক্সিকো সিটির বস্তিতে বেড়ে ওঠা একদল কিশোর, যাদের নেতা ‘এল জাইবো’—সদ্য সংশোধনাগার থেকে পালানো এক হিংস্র তরুণ। ছবির কাহিনি সরল— এক বাচ্চা ছেলে পেদ্রো, তার বন্ধুহারা একাকিত্ব, আর ভয়ংকর সেই জাইবোর প্রভাবে পিষ্ট হওয়া। কিন্তু বুনুয়েল ক্যামেরার সামনে যা ঘটালেন, তা মেক্সিকোর চলচ্চিত্রে অভাবনীয়। বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক গাব্রিয়েল ফিগেরোয়া, যিনি তখন এমিলিও ফের্নান্দেসের ছবিতে আলো-ছায়ার কাব্য রচনা করে জাতীয় গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, বুনুয়েলের নির্দেশে সরে এলেন সেই কাব্যিকতা থেকে। নির্দেশ পেলেন, পোড়া রোদ আর ধুলোর ভেতর দিয়ে কিশোরদের মুখ ফুটিয়ে তুলতে হবে, কোনো কৃত্রিম মহিমা নয়। একটি দৃশ্যে পেদ্রোর মা তাকে আদর করতে গিয়ে হঠাৎ যেন শ্বাসরোধ করতে শুরু করেন— মায়ের ভালোবাসা আর মৃত্যুভয় মিশে একাকার। আর শেষ দৃশ্যে পেদ্রোর লাশ শহরের আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। মেক্সিকান সমালোচকরা ক্ষেপে গেলেন। বললেন, এ তো জাতির মুখে চপেটাঘাত! সিনেমা হলে দর্শক বিক্ষোভ দেখাল। ছবিটার তখনই কবর হয়ে যেত, যদি না কবি ও কূটনীতিক অক্তাভিও পাজ ব্যাপারটা কানে নিতেন। ১৯৫১ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘লস অলভিদাদোস’ বুনুয়েলকে এনে দেয় সেরা পরিচালকের পুরস্কার, আর পৃথিবী টের পায়, মেক্সিকোতে একজন 'দিকপাল' তৈরি হচ্ছেন।
এরপর একের পর এক বিস্ময়। ‘এল’ (১৯৫২) ছবিতে বুনুয়েল ঢুকলেন এক ধনী, ভদ্র পুরুষের মনের ভেতর, যে কিনা প্রথম দেখাতেই এক তরুণীকে বিয়ে করে, কিন্তু ধীরে ধীরে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হয়ে ওঠে। স্ত্রীর প্রতিটি হাসি, প্রতিটি চাহনি তার কাছে হয়ে ওঠে অবিশ্বাসের প্রমাণ। ছবিটা এতটাই গভীরে গিয়ে পুরুষের মনস্তত্ত্বকে উল্টে দেখিয়ে দেয় যে— শোনা যায়, প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ জাক লাকাঁ তাঁর ছাত্রদের এই ছবি দেখতে বলতেন। ‘এল’-এর শেষ দৃশ্যে গির্জার ভেতর সেই স্বামী ও স্ত্রীর দেখা হয়, পুরোহিতের পায়ের কাছে তারা পাশাপাশি বসে। বুনুয়েল কোনো ব্যাখ্যা দেন না—মানুষের ভালোবাসা, ঈর্ষা, আর ধর্মের ভিড়ে মিলেমিশে থাকা পাগলামির এ এক অদ্ভুতুড়ে ছবি।
‘এক্সটারমিনেটিং এঞ্জেল’ (১৯৬২) সম্ভবত বুনুয়েলের মেক্সিকান পর্বের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং একই সঙ্গে মজাদার ছবি। কল্পনা করুন, একদল বুর্জোয়া অতিথি নৈশভোজ শেষ করে ড্রইংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। হঠাৎ কেউ একজন আবিষ্কার করলেন, কেউই আর দরজা দিয়ে বেরোতে পারছেন না। কোনো অদৃশ্য দেয়াল নেই, শুধু এক পাগল-করা মানসিক বাধা—‘ ভদ্রতার খাতিরে’ কেউ প্রথমে ওঠে চলে যেতে চান না, পরে দেখেন চাইলেও যেতে পারছেন না। দিন যায়, রাত যায়, ক্ষুধা-তৃষ্ণায়, ক্লান্তিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা। সমস্ত ভদ্রতার মুখোশ খুলে বেরিয়ে আসে পশুত্ব। আর এইসবের ভেতর দিয়ে কখনো হেঁটে যায় ভেড়ার পাল, কখনো টয়লেটের ভেতর দিয়ে ঢোকে কেউ। এক অনন্য সাদা-কালো দুঃস্বপ্ন, যেখানে সভ্যতার পাতলা আবরণটুকু সরিয়ে বুনুয়েল দেখিয়ে দেন, আমরা সবাই কত সহজেই বর্বর হয়ে যেতে পারি। অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায়, গদার যখন ‘উইকএন্ড’ বানাচ্ছিলেন, তখন নাকী মাথায় রেখেছিলেন এই ছবিটাকে!
আর ‘সাইমন অব দ্য ডেজার্ট’ (১৯৬৫) বুনুয়েলের মেক্সিকোয় করা শেষ ছবি। পঞ্চম শতকের এক খ্রিস্টান সাধু সিমিওন স্টাইলাইটস-এর গল্প, যিনি ঈশ্বরের ধ্যানে বছরের পর বছর মরুভূমির স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন। বুনুয়েলের হাতে সাধু সাইমন একরোখা, অথচ কিছুটা হাস্যকর চরিত্র। শয়তান বারবার ফিরে ফিরে আসে বিভিন্ন নারীর বেশে; কখনও সরল স্কুলছাত্রী, কখনও উস্কানিমূলক রমণী—সবকটিতেই সিলভিয়া পিনাল। ধর্মে বৈরাগ্যের চরম রূপকে বুনুয়েল দেখালেন একই সাথে মর্মস্পর্শী আর উদ্ভট করে। আর শেষ দৃশ্য—ষাটের দশকের এক জমজমাট নৈশক্লাবে হঠাৎ পৌঁছে যায় সাইমন, আর ধুম-ধাড়াক্কা রক সংগীতের মধ্যে বসে থাকেন হতভম্ব! এই অদ্ভুত, ধাক্কা দেওয়া সমাপ্তি বুঝিয়ে দেয়, বুনুয়েলের কাছে কিছুই পবিত্র নয়— এমনকি নিজের ছবির ট্র্যাজেডিও।
এখানেই শেষ নয়। 'উদারিং হাইটস’ উপন্যাসকে তিনি নিয়ে গেলেন মেক্সিকোর গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে (আবিসমোস দে পাসিওন, ১৯৫৪), যেখানে ক্যাথি ও হিথক্লিফের প্রেমে পাগলামো যেন ধুলোঝড়ের মতো ছুটে চলে। ‘মেক্সিকান বাস রাইড’ (১৯৫২) পাহাড়ি পথে এক ঝাঁকুনিমাখা বাসের ভেতর দিয়ে আঁকে মেক্সিকোর সমাজের এক হাস্যরসাত্মক ছবি; রাজনীতিবিদ, ধান্দাবাজ, লম্পট চালক—কেউ বাদ যায় না। ‘ইলিউশন ট্রাভেলস বাই স্ট্রিটকার’ (১৯৫৪)-এ দুই ট্রাম-শ্রমিক অবসরপ্রাপ্ত ট্রামটা চুরি করে রাতভর শহর ঘুরে বেড়ায়; চার্চ, রাষ্ট্র, বুর্জোয়া নীতি— সবাইকে ঠোক্কর মারে এই মাতাল যাত্রা।
‘দ্য ক্রিমিনাল লাইফ অব আর্চিবালদো দে লা ক্রুজ’ (১৯৫৫) এক খুনের নেশায় পাগল এক ধনী যুবকের কমেডি, যে যতবারই কাউকে খুন করতে যায়, ততবারই ভুক্তভোগী এমনিতেই মারা যায় বা কেটে পড়ে। মেয়েদের পা, পুতুল, মোমের মূর্তি—ফেটিশিজমের অদ্ভুত এক কোলাজ। ‘আ ওম্যান উইদাউট লাভ’ (১৯৫২) মোপাসাঁর গল্পের অভিযোজন, যেখানে বিবাহিত এক নারীর নীরব বিদ্রোহ, সমাজের নিষ্ঠুর উদাসীনতাকে বুড়ো আঙুল দেখায়। ‘দ্য ইয়ং ওয়ান’ (১৯৬০) তো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম—ইংরেজি ভাষার ছবি, আমেরিকার গভীর দক্ষিণের পটভূমিতে বর্ণবিদ্বেষ আর কামনার এক জ্বলন্ত দলিল, যেখানে জ্যাজ-সংগীতশিল্পী এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের ওপর মিথ্যা ধর্ষণের অপবাদ আসে, আর এক শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধের ভেতর জেগে ওঠে ঘৃণা আর লালসার অদ্ভুত মিশ্রণ।
মজার ব্যাপার হলো, মেক্সিকোর এই ছবিগুলো বহু বছর ধরে ফিল্ম-বোদ্ধারা অবহেলা করেছেন। বলেছেন, এগুলো বুঝি বুনুয়েলের ‘প্রস্তুতিপর্বের খসড়া’! অথচ সত্যিটা একেবারে উল্টো। মেক্সিকোর স্টুডিও-বাঁধা ব্যবস্থায় ঢুকে বুনুয়েল যা শিখলেন, তা হলো, জনপ্রিয় ছাঁচের ভেতর থেকেও কীভাবে প্রতিষ্ঠানের গোড়ায় ডিনামাইট রেখে শান্ত হয়ে নিজের কাজ করে যাওয়া যায়। দর্শক হলে বসে হাসতে হাসতে হঠাৎ অনুভব করবে, এই তো আমার সমাজের কথা, এই তো আমার পরিবারের কথা! তিনি বলতেন, “আমার সব ছবিই কমিক পরিস্থিতির ওপর তৈরি, কিন্তু সেগুলো খেলা হয় ট্র্যাজেডির সুরে।” এটাই বুনুয়েলের জাদু—তিনি কখনও সরাসরি বক্তৃতা দেন না। একটা অদ্ভুত স্বপ্ন, একটা উদ্ভট কাকতালীয় ঘটনা, কিংবা হঠাৎ ফেটে পড়া এক দৃশ্যের ভেতর দিয়ে তিনি ধর্ম, পুঁজিবাদ, যৌনতা, পুরুষতন্ত্রের সেকেলে চিন্তার ভিত নাড়িয়ে দেন।
আর এই মানুষটা নিজে কেমন ছিলেন? কল্পনা করুন এক বৃহদাকার, টাক-পড়া মাথা, পাথুরে চোখের মানুষ, যিনি কাঠের তক্তার ওপর শুতেন, প্রতিদিন ঘণ্টা দুয়েক হাঁটতেন, আর নিয়ম করে এক লিটার অ্যালকোহল খেতেন। সাংবাদিক-সাক্ষাৎকার সহ্য করতে পারতেন না। বন্ধু কার্লোস ফুয়েন্তেস লিখেছেন, বুনুয়েলের সঙ্গে গোরস্থানের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। কিন্তু আমার ভয় হয়, হোটেলের খালি ঘরে একা একা মরে পড়ে থাকতে, স্যুটকেস অর্ধেক খোলা, নাইট টেবিলের ওপর শুটিং স্ক্রিপ্ট। আমার জানতে ইচ্ছে করে, কোন হাতের আঙুলগুলো আমার চোখ বন্ধ করবে।”
নিজের নির্মাণ-পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলতেন, “আমি একটা ধারণা দিয়ে শুরু করি, অথবা একটা শারীরিক, খুব সাধারণ কোনো অ্যাকশন দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে কুড়িটা আইডিয়া এসে জড়ো হয়। কোনো যুক্তি দিয়ে নয়, বরং অযৌক্তিকভাবেই আসে। কিছু ছবি মাথায় আসে, কিছু বাতিল করি।” এই সরল অথচ গভীর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া— যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবের কোনো সীমান্ত নেই— তাই বারবার ফিরে এসেছে তাঁর ছবিতে। ‘ভিরিদিয়ানা’ যখন স্পেনের সেন্সরশিপকে ফাঁকি দিয়ে বানালেন, তখনো একই কৌশল—‘নির্দোষ’ স্ক্রিপ্ট জমা দিয়ে শুটিং-এ পুরো ছবিটা উল্টে দিলেন, আর কানে প্রথম পুরস্কার জিতে এনে ভ্যাটিকানের চরম নিন্দা জোটালেন আনতদীর্ঘ কপালে।
বুনুয়েলকে তাই শুধু ইউরোপীয় ‘অথর ফিল্মমেকার’ (অতর) ভাবা এক ধরনের সাংস্কৃতিক অন্ধত্ব। তিনি নিজেই বলতেন, পরাবাস্তববাদ তাঁকে শিখিয়েছে মানুষ কখনোই মুক্ত নয়, তবু যা সে কখনো হতে পারবে না, তার জন্যই লড়াই করে— এটাই ট্র্যাজিক। মেক্সিকো ছিল তাঁর সেই লড়াইয়ের ময়দান। সেখানেই তিনি নিজের স্টাইল পাকাপোক্ত করলেন, সেখানেই বুঝলেন কীভাবে ফিল্ম-স্টুডিওর দেয়ালের ভেতরেও স্বাধীন থাকা যায়। মেক্সিকো তাঁকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, দিয়েছে একটি সৃষ্টিশীল ভাষা, যে ভাষায় তিনি বানাতে পারলেন ‘লস অলভিদাদোস’-এর মতো পাথর-কঠিন সত্য, ‘এল’-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক দহন, ‘সাইমন অব দ্য ডেজার্ট’-এর মতো উদ্ভট আধ্যাত্মিকতা।
আপনারা যাঁরা এখনও বুনুয়েলের জগতে ঢোকেননি, আমি বলব, ভয় পাবেন না। তাঁর ছবিতে ধাঁধা আছে, কিন্তু সেটা হলো আমাদের নিজেদের চেনা জগতের ভেতরেই লুকোনো সংকেত সমাধানের ধাঁধা। একটি হাত এগিয়ে আসে ভালোবাসায়, অথচ সেই হাতই হয়তো অধিকার আদায়ে গলা টিপে ধরতে পারে। একটা খাবারের টেবিল হয়ে উঠতে পারে কারাগার। এক কিশোরের চোখের ভেতর ফুটে উঠতে পারে গোটা সমাজের ক্ষয়। আর এই পুরো যাত্রায় আপনি হাসবেন, শিউরে উঠবেন, কখনো কখনো নিজের অজান্তেই ভাববেন— আরেহ! এ তো আমাদের গল্প! বুনুয়েল আমাদের সেই আয়নাটা ধরিয়ে দিয়েছেন, যেটায় তাকালে আমরা বুঝতে পারি, সভ্যতার চাকচিক্যের নিচে আমরা সবাই কতটা অদ্ভুত, কতটা ভঙ্গুর, আর কতটা অসম্ভব-সম্ভব মানবিক। মেক্সিকো থেকে ওঠা সেই আয়নার প্রতিফলন আজও বিশ্ব-সিনেমায় জ্বলজ্বল করছে, এবং বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, সত্যিকারের বিপ্লব কখনো চিৎকার করে আসে না; সে আসে স্বপ্নের মতো, মৃদু হেসে, আর থেকে যায় মনের গভীরে, বন্য এক বুনুয়েল হয়ে।







