জন্মদিনে আবদুল আলীম স্মরণ
নদীমাতৃক দেশের প্রধান শিল্পী আবদুল আলীম

শিল্পী আবদুল আলীম। ছবি : সংগৃহীত
নদীর বুকে যখন জোয়ার আসে, পাড় ভাঙার আগে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে সুর ওঠে জলের আলোড়নে। প্লাবনের মতো একটি কণ্ঠ বাংলার আকাশে-বাতাসে এখনো ভেসে বেড়ায়— একই সঙ্গে পদ্মার সর্বনাশা টান আর মেঘনার কূলে ঘর বাঁধার মায়া মনে করিয়ে দেয়। সেই কণ্ঠটি আবদুল আলীমের।
নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাটিমাখা এক মানুষের ছবি, যিনি সাধারণ পাজামা-পাঞ্জাবি পরে উঠে আসতেন মঞ্চে, অথচ সামান্য না হলে নয় বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গতে গানে টান দিতেই সৃষ্টি করতেন এক ঘোরলাগা জগৎ। এত বছর পরেও তার গান শুনলে মনে হয়, তিনি যেন কোথাও চলে যাননি; তার সুর আমাদেরই আলো হাওয়ার জঠরে কোথাও যেন আছে, শুধু একটু কান পেতে শোনার অপেক্ষা।
জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই, মানে আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে। চারপাশে তখন সবুজ ধানখেত আর আঁকাবাঁকা মেঠো পথের অবিভক্ত ভারত নামে ইংরেজদের করদরাজ্য। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা বলতে কিছু নাই, তাই ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোতে পারেননি আবদুল আলীম। কিন্তু বই-খাতার বাইরেও যে একটা জগৎ আছে, সেটা তিনি বুঝেছিলেন খুব ছেলেবেলাতেই। গ্রামোফোনের রেকর্ডে কান পেতে গান শুনতেন আর নিজে নিজে গলা সাধতেন। বাবা ইউসুফ আলী হয়তো ভাবতেন, ছেলেটি বাউন্ডুলে হবে; কিন্তু গ্রামের লোকে তখনই বুঝে গিয়েছিল, এই ছেলের গলায় সোনা মাখানো। পালা-পার্বণে যখন উঠে গাইতেন, হাঁটুরে মানুষও থমকে দাঁড়িয়ে যেত।
আজ তার মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও এক বিষাদমাখা বাস্তবতা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আবদুল আলীমের পাঁচ শতাধিক গানের মধ্যে মাত্র আড়াইশ থেকে তিনশ গান লিপিবদ্ধ রয়েছে। শ দেড়েক গান পাওয়া যায় রেকর্ডেড। বাকি গানগুলো যেন কুয়াশায় হারিয়ে গেছে।
১৩-১৪ বছর বয়সেই ভাগ্য তাকে ঠেলে দিল সে সময়ের ভারতের রাজধানী কলকাতার দিকে। স্থানীয় এক গুণগ্রাহী তার গানে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিয়ে গেলেন শহর কলকাতায়, পরিচয় করিয়ে দিলেন সংগীতের এক বিশাল জগতের সঙ্গে। সৈয়দ গোলাম আলীর কাছে গানের তালিম নেওয়ার সুযোগ পেলেন। মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে মেগাফোন কোম্পানির হয়ে রেকর্ড করলেন ‘ও তোর মোস্তফাকে দে না মাগো’ আর ‘আফতাব আলী বসলো পথে’। এত অল্প বয়সে এমন শক্তিশালী ও পোক্ত কণ্ঠস্বর শুনে কলকাতার সংগীত মহল চমকে উঠেছিল।
এরপর যা ঘটল, তা যেন রূপকথার গল্প। আলীয়া মাদ্রাসার এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে কিশোর আলীম ধরলেন, ‘সদা মন চাহে মদিনা যাবো’। দর্শক সারিতে বসেছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। প্রবল ব্যক্তিত্বের এই মানুষটি গান শুনতে শুনতে কেঁদে ফেললেন শিশুর মতো। অনুষ্ঠান শেষে জড়িয়ে ধরলেন আবদুল আলীমকে, বাজার থেকে কিনে দিলেন নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি, জুতো-মোজা। এরপর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্নেহ, লোকসঙ্গীতের আরেক পুরোধা আব্বাসউদ্দীন আহমদের পরামর্শ—সবই যেন তার জীবনের পথ করে দিচ্ছিল। দোতারার জাদুকর কানাইলাল শীলের শিষ্যত্বও গ্রহণ করলেন সে সময়ে।
১৯৪৭ সালে ইংরেজশাহী বিদায় নিলো, হলো দেশভাগ। কলকাতার রঙিন সাংস্কৃতিক জীবন ছেড়ে ১৯৪৮ সালেই আলীম পাড়ি দিলেন নিজের দেশ, পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায়। শুরুতে কিছুদিন বড় ভাইয়ের কাছে থাকলেও অচিরেই জিন্দাবাহার দ্বিতীয় লেইনের একটি বাড়িতে উঠলেন, যেখানে তখন থাকতেন আব্দুল লতিফ, আব্দুল হালিম চৌধুরীর মতো ভবিষ্যতের প্রথিতযশা শিল্পীরা।
তাদের পরামর্শে, নিজের সামান্য চেষ্টায় আর দরাজ গলার যে কাউকে কাঁদিয়ে দিতে পারামূলক কণ্ঠের জোরে অচিরেই ঢাকা বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দিলেন, যেখানেই শুরু হলো তার প্রকৃত সাধনা। মমতাজ আলী খান, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, বেদারউদ্দীন আহমদের মতো গুণী ওস্তাদদের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের দীক্ষা নিলেন ঠিক শিষ্য হয়ে না, দেখতে দেখতে। বেতারে গান করতে করতেই তাঁর প্রাণের টান টের পেলেন, বাংলার মাটির গানকে তুলে নিলেন গলায়। তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, মারফতি, দেহতত্ত্ব ও পল্লীগীতির একনিষ্ঠ এক কণ্ঠ।
আবদুল আলীমের কণ্ঠস্বর ছিল এক বিস্ময়। এতটাই শক্তিশালী যে স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের সময় মাইক্রোফোন অনেক দূরে সরিয়ে রাখতে হতো, নইলে আওয়াজ বিকৃত হয়ে যেত। অথচ সেই একই গলায় যখন তিনি ধরতেন ‘দিবানিশি কান্দিরে তোর নদীর কূলে বইয়া’, তখন মনে হতো বুকের ভেতর যেন কেউ আলতো করে আদরের হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তিনি শুধু গ্রামের মানুষদেরই মুগ্ধ করেননি; একইভাবে শহুরে শিক্ষিত শ্রোতাও তার গানের মর্মকথায় ডুবে যেতেন, হয়তো ফিরে যেতেন পথে পথে বাউলের গান করা নিজের গ্রামে।
কথিত আছে, একবার অনুষ্ঠান শেষে ট্রেনে ফেরার পথে আখাউড়ার মানুষ ট্রেন থামিয়ে ফেলেছিল কয়েক ঘণ্টার জন্য। তারা আবদুল আলীমের গান শুনতে চেয়েছিল। আরেকবার যখন তিনি গান থামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সহশিল্পীরা নাকি সটকে পড়েছিলেন। এতটাই সম্মোহনী যাদুকরী ছিল তার পরিবেশনা।
বাঙালীর শুরুর দিকে চলচ্চিত্র ঋদ্ধ হয়ে উঠেছিল আবদুল আলীমের কণ্ঠবেদনে। সেসময়ের পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ দিয়ে শুরু করে প্রায় পঞ্চাশটি ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন আবদুল আলীম। ‘সুজন সখী’, ‘লালন ফকির’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘রূপবান’, ‘সুতরাং’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’—ছায়াছবির তালিকা দীর্ঘ। ‘লালন ফকির’ ছবিতে তার গাওয়া গানগুলো যেন ফকিরি দর্শনেরই প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছিল, আর ‘সুজন সখী’র জন্য তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, তবে তা জীবদ্দশায় নয়।
ক্ষীনতনু সঙ্গীতজীবনে তিনি পাঁচ শতাধিক গান রেকর্ড করেন, যার প্রতিটি গানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বাংলার নদী-মাঠ-মাটি আর মাটি-মানুষের গভীর জীবনবোধ। তার গাওয়া ‘সর্বনাশা পদ্মা নদীরে’, ‘হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ’, ‘মেঘনার কূলে ঘর বাঁধিলাম’, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’, ‘পরের জায়গা পরের জমি’, ‘দুয়ারে আইসাছে পাল্কী’, ‘নাইয়া রে নায়ের বাদাম তুইলা’—এসব গান তাকে সময়ের সীমানা পেরিয়ে করেছে কালজয়ী।
পাকিস্তান আমলে লাহোরে এক সঙ্গীত সম্মেলনে একে একে পাঁচটি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন আবদুল আলীম, বিস্ময়কর না? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে পদক (মরণোত্তর ১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর ১৯৯৭), প্রেসিডেন্ট প্রাইড অব পারফরম্যান্স—এ সবই তাকে সম্মানীত করে রাষ্ট্রের সম্মানীত হওয়া। পেশাগত জীবনে তিনি ঢাকা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের লোকগীতি বিভাগের অধ্যাপকও ছিলেন, যেখানে ছাত্ররা তাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত।
আবদুল আলীমকে যারা দেখেছেন, তার সন্তানেরা নানা সময় গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন। প্রায় প্রত্যেকেই বলেছেন, এত খ্যাতিমান হয়েও তিনি কখনো সাধারণ জীবনকে ছেড়ে যাননি। ছোটখাটো গড়ন ছিলো, চোখে গভীর দৃষ্টি, মুখে ছিলো এক নিরাভরণ সরলতা। মঞ্চে কখনো জমকালো পোশাকে ওঠেননি; তার চিরপরিচিত পোশাক ছিল সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। জনপ্রিয়তা তাকে কখনো পারেনি মোহগ্রস্ত করতে।
আবদুল আলীমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোহরাব হোসেন তার স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন, আলীমের একটি আজব ভয় ছিল—উঁচু জায়গা ও বিমানে চড়া। বিদেশ গমনের সরকারি প্রতিনিধি দলের নাম শুনলেই নাকি তিনি বিমানের কথা ভেবে ঘামতে শুরু করতেন। বড় মাপের এই সরলতা যেন তার ভাটিয়ালি সুরের সাধারণ জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কালজয়ী এ মহান শিল্পীর মহাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল অত্যন্ত অকালে। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে, ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আবদুল আলীম।
জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই, মানে আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে। চারপাশে তখন সবুজ ধানখেত আর আঁকাবাঁকা মেঠো পথের অবিভক্ত ভারত নামে ইংরেজদের করদরাজ্য।
আজ তার মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও এক বিষাদমাখা বাস্তবতা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আবদুল আলীমের পাঁচ শতাধিক গানের মধ্যে মাত্র আড়াইশ থেকে তিনশ গান লিপিবদ্ধ রয়েছে। শ দেড়েক গান পাওয়া যায় রেকর্ডেড। বাকি গানগুলো যেন কুয়াশায় হারিয়ে গেছে। রেডিও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ কেন্দ্রে তার প্রায় দেড়শ গান পড়ে ছিল অযত্নে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক যোগাযোগের পর সম্প্রতি মাত্র ১২টি গান ফেরত এসেছে। বড় ছেলে শিল্পী জহির আলীম ও মেয়ে নূরজাহান আলীমের কণ্ঠে আক্ষেপ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাবার গানের চর্চা দিন দিন কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাদেরই বরাতে জানা গেল, বাংলাদেশ টেলিভিশনের আর্কাইভ থেকেও আলীমের ভিডিও রেকর্ডিংগুলো অবহেলায় নষ্ট হয়েছে।
শিল্পীর সন্তানেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘আব্দুল আলীম ফাউন্ডেশন’ গড়েছেন। নূরজাহান আলীম তৈরি করছেন ‘রঙ্গিলা নায়ের মাঝি’ নামে একটি তথ্যচিত্র। বাবার জন্মস্থান তালিবপুরে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছেন, সেখানকার মাটি আজও আলীমের গান ভোলেনি। সেখানকার স্কুলের শিক্ষক, গ্রামের মানুষজন আলীমের মেয়েকে দেখতে ভিড় জমান, গান শোনার আবদার করেন, ‘আব্দুল আলীম মেলা’ করার প্রস্তাব দেন। এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে, শিকড়ের কাছেই ফিরে আসে সব সুর।
আবদুল আলীম বলতেন, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া...’ তার সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন সুরের ভেতর। এই দুনিয়া তার জন্য গড়া হয়েছিল, যাতে বাঙালি মাটি ও পানির যে গভীর ভাষা, তাকে তিনি চিরায়ত করে তুলতে পারে। এখন দায়িত্ব এ প্রজন্মের, এই সময়ের মানুষদের—শুধু তাকে স্মরণ করার জন্য নয়, বরং সত্যিকারের সংরক্ষণ ও চর্চার জন্য এগিয়ে আসা, যাতে ভবিষ্যতের কেউ যখন রূপসী বাংলার নদীর পাড়ে বসে গেয়ে ওঠে ‘কে যাসরে, ভাটির নাও বাইয়া, আমার ভাই বইনরে কইয়ো নাইয়র নিতে আইয়া, তোরা কে যাস, কে যাস...’





