ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা রাষ্ট্রপতি, ২০০ গজ দূরে আমি

৪৫ বছর আগে এক বর্ষণমুখর রাতের কথা। সারা রাত বৃষ্টি হচ্ছিল। অঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের গ্যালারির নিচের বাসায়। বাবার চাকরির সূত্রে এখানেই বসবাসের সুযোগ আমার। মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি কানে বাজার আগেই হঠাৎ ব্রাশফায়ারের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বাঁচব কি মরব, এই ভয়ে চৌকির নিচে গিয়ে মেঝেতে শুয়ে আশ্রয়। মনে হচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে গুলি চলে যাচ্ছে। কখন না মাথার খুলি উড়ে যায়। কলেমা পড়ছি, আল্লাহকে ডাকছি।
সার্কিট হাউসের সামনের রাস্তার সঙ্গেই লাগোয়া রুমে থাকতাম আমি ও ছোট চাচা। এরপরের রুমে বাবা, দেয়ালের কারণে সেটি অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত। বাবার রুমে গিয়ে যে আশ্রয় নেব, সে উপায়ও নেই। কারণ গুলির পর গুলি।
ব্রাশফায়ার থামল। মনে হচ্ছে এই বুঝি রক্ষা পেলাম। কিন্তু না। পরক্ষণেই আবার থেমে থেমে গুলি। ভয়ে শরীর কাঁপছে। কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর থামল গুলি। এবার আর কিশোর মনকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে গুলির শব্দ এখানেই শেষ। চৌকির নিচ থেকে বের হওয়ার শক্তি ও সাহস কোনোটাই পাচ্ছিলাম না। ঘরে ঢুকে মেরে ফেলে কি না আমাদের, এই ভয়ে অস্থির।
গুলির শব্দ একেবারেই থেমে গেছে। ভোরের আলো ফুটছে। কাজীর দেউড়ি থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত সার্কিট হাউসের সামনের রাস্তায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ। আশপাশের ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ রাস্তায় নামেনি। অথচ প্রতিদিন এই সময় প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য সেনাসদস্যরা দৌড়াতেন। তাদের বুটের (জুতার) শব্দের ছন্দ কানে বাজত, শুনতে ভালোই লাগত। আজ তারাও নেই। সার্কিট হাউসের সামনের খোলা মাঠে আকাশে উড়ছে প্রচুর কাক। তাদের গগনবিদারী কা-কা চিৎকার। বাসায় বাবা-চাচারা বলাবলি করছেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কি বেঁচে আছেন? আমি স্কুলে যাব কি যাব না, এটা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব।
কৌতূহলী কিশোর মন জানালায় উঁকি দিলাম ২০০ গজ দূরের সার্কিট হাউসের দিকে। জনমানব নেই। নীরব, নিস্তব্ধ নিত্য কোলাহলের এই সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ। সার্কিট হাউসের সামনের খোলা মাঠে চলত ভোরবেলার ফুটবল খেলা। রাতের ভয়াবহতায় সেদিন পুরো মাঠ শূন্য।
গুলির শব্দের সাথে যে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতির জীবন শেষ হয়ে গেল, সেটি জানলাম অন্তত পাঁচ ঘণ্টা পরে। তাও সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে গিয়ে। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্র।
সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, সু পরে হেঁটে পৌনে ৭টায় রওনা দিলাম স্কুলে। মূল রাস্তা এড়িয়ে স্টেডিয়ামের ভেতর দিয়ে বের হলাম। গোয়ালপাড়ার পথ ধরে রেলস্টেশন পার হয়ে স্কুলে পৌঁছলাম। স্কুলের পরিবেশ স্বাভাবিক। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সহপাঠীদের অনেকে জানতেন না রাতের গোলাগুলির এই খবর। আমি দু-একজন সহপাঠীর কাছে রাতের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। ক্লাস শুরু হলো। রোল কলও হলো। কতক্ষণ পর ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল। তার আগে শ্রেণি শিক্ষক জানালেন, রেডিওতে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কতিপয় সেনাসদস্যের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন সার্কিট হাউসে। আমার কাছেও ঘটনার বর্ণনা শুনতে চাইলেন শ্রেণি শিক্ষক আতিকুর রহমান। আমি বললাম। ছাত্র-শিক্ষক সবাই শুনলেন সেই ভীতি জাগানিয়া ব্রাশফায়ারের কাহিনি।
ঘটনার এত কাছে ছিলাম দূরত্ব হিসাব করলে মাত্র ২০০ গজ। অথচ নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর জানতে সময় লাগল ৫ ঘণ্টা! কারণ প্রযুক্তি এখনকার মতো এত উন্নত ছিল না। খবর পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার ছিল একমাত্র মাধ্যম। এত টিভি চ্যানেল তখন ছিল না। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের যুগ শুরু হয়েছে অনেক বছর পর।
এত কাছ থেকে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের নীরব সাক্ষী হয়তো অনেকেই। কিন্তু কম বয়সী ছাত্র হিসেবে আমি বাদ যাই কীভাবে? সাংবাদিকতা শুরু করি ১৯৯২ সালে। ৪৫ বছর আগের স্মৃতিতে অনেক ধুলো জমেছে। স্মৃতি হাতড়ে সেদিনের ভয়াবহতার কিছু চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা। সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বছর পর চাঞ্চল্যকর বিষয়টির অবতারণা। এবং এটি এখনো প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি।
জিয়াউর রহমান ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন, তখন তার বয়স মাত্র ৪৫ বছর।
ইতিহাস ঘেঁটে আরও একটু জেনে নেওয়া যাক। ৪৬ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫৫ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে বিপথগামী একদল সেনাসদস্যের হাতে ঢাকার ধানমন্ডির বাসভবনে নিহত হয়েছিলেন।
গোলাগুলি হয়েছে ঠিকই কিন্তু কখনোই আমাদের মনে হয়নি জিয়াউর রহমানকে হত্যার জন্য এই পরিকল্পনা। ব্রিটিশদের তৈরি সার্কিট হাউসের দোতলায় রাত্রিযাপন করছিলেন তিনি। ২৯ মে কর্মব্যস্ত দিন শেষে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। শান্তির ঘুম আর শেষ হলো না। চিরনিদ্রায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হলো বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, মুক্তির স্বপ্ন ধারণ করা এক রাষ্ট্রপতির প্রাণ। মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে জেড ফোর্স বলা হতো। এই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। নিয়তির নির্মমতায় আবার প্রাণও দিলেন এই চট্টগ্রামে। নাটকীয়তায় ভরা এক বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ অধ্যায়।
যে পথে স্কুলে গিয়েছিলাম, সেই একই পথে হেঁটে বাসায় ফিরি। বাসায় এসে উঁকি মেরে সার্কিট হাউসের দিকে তাকিয়ে দেখি পরিস্থিতি থমথমে। সীমানা দেয়ালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তা পুলিশের কেউ নেই। সেনাবাহিনীর দুই-তিনটি জিপ দেখা গেল। অথচ আগের দিন এই সার্কিট হাউসের চারপাশে ৩০ ফুট অন্তর অন্তর পুলিশ পাহারা দিচ্ছিল। সার্কিট হাউসের মূল গেটে পুলিশের বিশাল টিম থাকত। কিন্তু তাদেরও দেখা গেল না। আতঙ্কে-ভয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরাও এগোতে সাহস পেল না। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। আকাশ মেঘলাই ছিল। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম। বাবা বললেন, আমি থাকব। তুমি তোমার জেঠার সাথে বাড়ি চলে যাও। কথামতো বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। স্টেডিয়ামের ভেতর দিয়ে গোয়ালপাড়া হয়ে কদমতলীর বাস স্টেশন। মূল সড়ক এড়িয়ে গেলাম নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে।
কদমতলীতে এসে বাসে উঠলাম। কিশোর মনে বারবার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল, কেন এই হত্যাকাণ্ড? কেন এতে জড়ালেন সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার? কিসের স্বার্থ, কিসের দ্বন্দ্ব? কোনো কিছুতেই উত্তর খুঁজে পেলাম না। বাস শুভপুর ব্রিজের কাছে যাওয়ার পর সেনাবাহিনী আর এগোতে দিল না। ব্রিজের দুই পাশে নিরাপত্তাচৌকি বসানো হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। হত্যাকারীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তাই সাধারণের যাতায়াত উভয় দিকে বন্ধ। কী করব, উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে জেঠার চাকরি সূত্রে বারইয়ারহাটে এক রেল কর্মকর্তার বাসায় আশ্রয়। দুই দিন থাকলাম সেখানে। ততক্ষণে আমাদের চোখ-কান থাকত টিভি ও রেডিওতে। এই হত্যাকাণ্ডে মেজর জেনারেল মঞ্জুর জড়িত, সেটি প্রকাশ পেল। মঞ্জুরকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। ধরা পড়লেন মঞ্জুর। মারাও গেলেন আততায়ীর গুলিতে। তিন দিন পর পরিস্থিতি একটু শান্ত হয়।
আমরা আবার রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশে। শুভপুর ব্রিজ হেঁটে পার হলাম। এই সময় সেনাবাহিনী আমাদের ব্যাগ তল্লাশি করল। কিছু না পেয়ে তারপর ছাড়ল। ব্রিজের ওপার থেকে আবার নতুন বাসে উঠে রওনা দিলাম। প্রচণ্ড বৃষ্টি। বাড়িতে পৌঁছলে মা-দাদি-ফুফু সবাই এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন। নিরাপদে ফিরতে পেরেছি, এটাই যেন এক বড় সান্ত্বনা তাদের কাছে।
রফিকুল বাহার, যুগ্ম সম্পাদক, আগামীর সময়






