দেউলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
আইনি জটিলতায় দ. কোরিয়ায় আটক ১৮৮ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে এখন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাড়ি জমান দক্ষিণ কোরিয়ায়। বিশেষত ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স বা ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন তারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় দেউলিয়া হবার কারণে ১৮৮ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর টিউশন ফির টাকা আটকে আছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।
দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিংইয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তির উদ্দেশ্যে টিউশন ফি পরিশোধের পরও ভিসা না পাওয়া এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম দেউলিয়া পরিস্থিতির মুখে পড়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। দীর্ঘ সাত মাস ধরে প্রায় ২৪৪ জন শিক্ষার্থীর কোটি কোটি টাকা আটকে থাকার পর অবশেষে কোরিয়ান আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ভুক্তভোগীদের। তবে এরই মধ্যে এজেন্সির ভূমিকা, দেরিতে আইনজীবী পাঠানো ও অর্থের গন্তব্য নিয়ে শিক্ষার্থী ও এজেন্সি উইকেয়ারের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তুমুল বিতর্ক ও কাদা ছোড়াছুড়ি।
শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় বেসামরিক দেউলিয়া প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়েছিল। তবে গত ২৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠন করে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেউগু রিহ্যাবিলিটেশন কোর্টে আবেদন জানান। এর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম ও কোরিয়ান আইনজীবীর যৌথ প্যানেল গত ২৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪৪ জন শিক্ষার্থীর পাওনা অর্থ ফেরতের জন্য রিহ্যাবিলিটেশন কোর্টে আবেদন জমা দেন।
আদালতের অনলাইন পোর্টালের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মামলার কেস নম্বর ২০২৬ দেউলিয়াত্ব পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং দেনাদার হিসেবে রয়েছে ওনসিয়ক অ্যাকাডেমি। মামলাটি গত ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই রিহ্যাবিলিটেশন কোর্ট গ্রহণ করে এবং এ বছরের ২৮ আগস্ট আবেদন প্রক্রিয়াকরণের দিন ধার্য করেন। সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের পাওনা দাবির আবেদনপত্র জমা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বর্তমানে বিষয়টি আদালতের তদারকিতে থাকলেও ব্যাংকের ঋণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন এবং অগ্রাধিকারমূলক পাওনাদারদের দাবি মেটানোর পর শিক্ষার্থীদের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হলেও তা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
২৪৪ জন শিক্ষার্থীর পক্ষে প্রতিনিধি রাসেল মাহমুদ হৃদয় তার বক্তব্যে সরাসরি উইকেয়ার এজেন্সির বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় গত ৩ জুলাই দেউলিয়া প্রক্রিয়ায় গেলেও এজেন্সি দুই মাস পর ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে আইনজীবী পাঠায়। যে শিক্ষার্থীরা ব্যাংকে সরাসরি ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা করে জমা দিল, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন এই ছিনিমিনি?”
তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি সংস্থা বোয়েসেল-এর মাধ্যমে যাওয়া শিক্ষার্থীরা যখন রিফান্ড পাচ্ছে, তখন এজেন্সির আওতাধীন শিক্ষার্থীরা কেন সাত মাস ধরে বঞ্চিত হচ্ছে? বাংলাদেশ সরকার ও কোরিয়ান সরকারের যৌথ উদ্যোগে দ্রুত এই সংকট সমাধানের দাবি জানান তিনি।
কোরিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর মো. তারাযুল ইসলাম এ বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আগামীর সময়কে জানান “যেহেতু ব্যাপারটিতে দুইটি দিক রয়েছে, একটি হচ্ছে দেউলিয়া হলে আইনি সমাধান ও দেউলিয়া না হলে আইনি সমাধান; সেহেতু আদালত যেটি সিদ্ধান্ত দিবেন তার উপরে সবকিছু নির্ভর করছে। তাই বিচারাধীন একটি বিষয় নিয়ে অগ্রীম কিছু বলা যাচ্ছেনা। তবে আমরা এডুকেশন মিনিস্ট্রি ও আইনজীবীর সাথে কথা বলেছি এবং এ ব্যাপারে শিক্ষার্থী ভাইবোনদের যতটুকু সম্ভব আমরা সহযোগিতা করবো।”
শিক্ষার্থীদের যাবতীয় অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিয়ে উইকেয়ার এজেন্সির সিইও মো. ইফতেখার রহমান আগামীর সময়কে জানান, “আন্তর্জাতিক শিক্ষা মান যাচাই ব্যবস্থা (আইইকিউএএস) সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় আমরা শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়া ও টিউশন ফি জমাদানের কাজটি করেছি। বিদেশে ভর্তি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন পরামর্শক সমিতি (এফএসিডি-ক্যাব) এবং দূতাবাসে আমরা সব ডকুমেন্টস জমা দিয়েছি। কোরিয়ান সরকার তাদের প্রক্রিয়া অনুযায়ী এগোচ্ছে, আমরা আমাদের জায়গা থেকে সব ধরনের সহায়তা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধান দেবে।”
শিক্ষার্থীদের হতাশার প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে উইকেয়ারের সিইও আগামীর সময়কে আরও জানান, “সাত মাস পর হঠাৎ করে উইকেয়ার 'সিরিয়াস' হয়েছে—কথাটি সত্য নয়। আমরা শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং জটিলতা কাটানোর চেষ্টা করেছি এবং আমাদের মাধ্যমে ১০-১২ জন শিক্ষার্থী টাকা ফেরতও পেয়েছেন। ৩ জুলাইয়ের আগে বিশ্ববিদ্যালয় এমন সংকটে পড়বে বলে কোনো অফিশিয়াল নোটিশ বা পূর্বাভাস আমাদের দেওয়া হয়নি। তাই আগে থেকে জেনে তথ্য গোপন করার প্রশ্নই ওঠে না।”
বাংলাদেশে থেকে আইনজীবী পাঠাতে বিলম্বের ব্যাখ্যায় তিনি জানান, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জটিল প্রক্রিয়াটি বাংলাভাষী একজন আইনজীবীকে সরাসরি কোরিয়ান আইনি প্যানেলের সাথে যুক্ত করে, সেই সংক্রান্ত ভিসা জটিলতা কাটাতে সময় লেগেছে। টাকা আটকে থাকার বিষয়ে পরিষ্কার করে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা কোনো টাকা উইকেয়ারের অ্যাকাউন্টে দেননি; টাকা গেছে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরিয়ান ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সুতরাং এজেন্সির কাছে টাকা আটকে রাখার কোনো সুযোগ নেই।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে কাজ করা ২৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে ২২১ জন উইকেয়ারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যার মধ্যে ১৮৮ জন বাংলাদেশি এবং বাকিরা নেপাল ও পাকিস্তানের। মানবিক দিক বিবেচনা করে অন্য এজেন্সির আরও ২৩ জন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকেও তারা এই আইনি লড়াইয়ে বিনামূল্যে যুক্ত করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কোরিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের পরামর্শ মেনেই আদালত তদারকি প্রক্রিয়ায় ক্লেইম ফাইল করা হয়েছে। মিথ্যা আশ্বাস না দিয়ে তিনি আহ্বান জানান, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা সম্ভব এবং উইকেয়ার শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবে।
আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানান, এখন বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালতের নির্ধারিত রিহ্যাবিলিটেশন প্রক্রিয়ার অধীনে থাকবে। আদালত শিক্ষার্থীদের দাখিল করা ক্লেইম পর্যালোচনা করবে এবং পরবর্তী সময়ে শুনানি ও অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।
শিক্ষার্থীদের পক্ষে নিয়োজিত কোরিয়ান আইনজীবী নিয়মিতভাবে আদালতের শুনানি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন এবং আদালতের নির্ধারিত আইন ও পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের বৈধ পাওনা অর্থ ফেরতের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একাধিক ধরনের ঋণ ও আর্থিক দায় রয়েছে। রিহ্যাবিলিটেশন কার্যক্রমে বিভিন্ন শ্রেণির পাওনাদারের দাবি আইন এবং আদালত অনুমোদিত অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিবেচিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অন্যান্য পাওনাদারদের পূর্বের বকেয়া ও আর্থিক দাবিও রয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।







