যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী
থিসিস জমার ২ দিন আগেই কেন নিখোঁজ লিমন

জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। ছবি: সংগৃহীত
জামিল আহমেদ লিমন যেদিন নিখোঁজ হন তার দুদিন পরই ছিল থিসিস জমা দেওয়ার তারিখ। তার আগেই রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যান তিনি। সঙ্গে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তার বান্ধবী নাহিদা বৃষ্টিকেও। দুজনেই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট শিক্ষার্থী।
গত ১৬ এপ্রিল দুজনকে সর্বশেষ দেখা যায়। এরপর থেকে মিলছে না কোনো খোঁজ। নিখোঁজের এক সপ্তাহ পরেও সন্ধান না পাওয়ায় দুজনকে বিপজ্জনক তালিকায় রেখেছে পুলিশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন লিমন। তাকে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে তার বাসায় দেখা যায়। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
বৃষ্টিকেও একই দিন সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভারনমেন্টাল সায়েন্সেস বিল্ডিংয়ে শেষবার দেখা যায়। তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করছিলেন। দুজনের নামেই নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, লিমনের বাসা থেকে বৃষ্টির সর্বশেষ অবস্থানস্থল প্রায় ১০ মিনিটের দূরত্বে। তারা দুজন বন্ধু এবং একসঙ্গে থাকতে পারেন বলে ধারণা।
শুক্রবার বিকেল ৫টার কিছু আগে তাদের এক পারিবারিক বন্ধু যোগাযোগ করতে না পেরে বিষয়টি পুলিশকে জানান। এরপরই নিখোঁজ সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয় এবং তাদের তথ্য ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আলোচনায় লিমনের থিসিস
লিমনের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, তিনি পরিবেশ বিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে পড়ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, লিমনের থিসিসের বিষয়বস্তু ছিল ফ্লোরিডার প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর ডাটা সেন্টারের প্রভাব নিয়ে৷
ইউএসএ টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেনারেটিভ এআই মডেলসহ ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলো মূলত সংরক্ষিত থাকে বড় বড় 'ডেটা সেন্টারে'। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তের মতো ফ্লোরিডাতেও এখন অগণিত ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে। পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা করে সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে স্থানীয়রা। সাধারণ মানুষের ওপর বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে যন্ত্র শীতল করার জন্য অত্যধিক পানি খরচ— সব মিলিয়ে এই ডেটা সেন্টারগুলোর আশপাশের বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে।
ফ্লোরিডার প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারগুলো নিয়েও জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ। ডেটা সেন্টারগুলোর কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা এখন অনেকের জন্যই উদ্বেগের কারণ। অত্যধিক সম্পদ ভোগকারী এই স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অনলাইনে এবং আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও জোরালো হচ্ছে প্রতিবাদ।
ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১০৭টি ডেটা সেন্টার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১০ম স্থানে ফ্লোরিডা। এই ডাটা সেন্টার প্রজেক্টগুলোর পেছনে রয়েছে বড় বড় টেক কোম্পানিগুলো। ধারণা করা হচ্ছে লিমনের থিসিস সম্ভবত তাদের বিরুদ্ধে।
এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ১০ বিজ্ঞানী নিখোঁজ বা নিহত
সিএনএনের প্রতিবেদন বলা হয়, ম্যাসাচুসেটসে নিজ বাসভবনের বাইরে গুলিতে নিহত হয়েছেন একজন পারমাণবিক পদার্থবিদ ও এমআইটি অধ্যাপক। নিউ মেক্সিকোর বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন বিমান বাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল। আর লস অ্যাঞ্জেলেসে হাইকিংয়ে গিয়ে হদিস মিলল না এক অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারের।
তারা সেই অন্তত ১০ জন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত, যারা যুক্তরাষ্ট্রের অতি সংবেদনশীল পারমাণবিক ও মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। সম্প্রতি তারা মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। এই ঘটনাগুলো এখন জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এর পেছনে কোনো অশুভ বা নাশকতামূলক তৎপরতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে অনলাইনে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়ছে।
এফবিআই জানিয়েছে, নিখোঁজ ও মৃত বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তারা। সঠিক উত্তরের সন্ধানে তারা জ্বালানি বিভাগ, যুদ্ধ বিভাগ এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করছে।
এর পাশাপাশি, রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন হাউস ওভারসাইট কমিটি ঘটনাগুলো তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এ বিষয়ে তারা এফবিআই, প্রতিরক্ষা বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ এবং নাসার কাছ থেকে বিস্তারিত ব্রিফিং চেয়েছে।
তবে প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট একে অপরের থেকে ভিন্ন। কিছু ঘটনায় অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের আলামত আছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো অপরাধমূলক তৎপরতার চিহ্ন মেলেনি। অন্তত দুটি ঘটনায় পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনের পূর্বের অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত টানাপড়েনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই মামলাগুলোর মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক খুঁজে পায়নি।
হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান ও রিপাবলিকান সদস্য জেমস কোমার 'ফক্স নিউজ সানডেতে' বলেছিলেন, ‘এটি শুধু কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কংগ্রেস এ নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমাদের কমিটি এখন একে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারণ আমরা বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছি।’
বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তাদের পরিবারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কমিউনিটিতে এখন দুশ্চিন্তা। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা জানিয়েছেন, তারা সার্বক্ষণিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সন্তোষজনক কোনো খবর এখনো তাদের কাছে নেই। পুলিশ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু জানাচ্ছে না।



