রংপুর অঞ্চলে শ্রমজীবীদের দুর্গতি
‘বউ-ছাওয়া নিয়া কষ্টে আছি, খালি এক গ্লাস পানি খ্যায়া আসচু’
- শাপলা বিক্রি করে পেটে ভাত

কৃষি শ্রমিকরা বছরের এই সময়টাতে প্রত্যেকদিন কাজের সন্ধানে ছুটে চলেন নানা দিকে। ছবি: আগামীর সময়
রংপুর নগরীর বাহাদুরসিংহ এলাকার ৭০ বছর বয়সের আব্দুর রহমান। কাজের অভাবে এখন তার স্ত্রী-সন্তানসহ খেয়েপরে বাঁচাই দায়। জীবন বাঁচাতে খালবিল থেকে শাপলা তুলে বিক্রি করেন তিনি, যা শহরের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ফুল হিসেবে কেনেন। কেউ কেনেন সবজি হিসেবে খাওয়ার জন্য।
আগের দিন দুপুর থেকে শাপলা তুলে বিক্রি করেন পরদিন। দু’দিনে আয় হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। খেয়ে না খেয়ে চলছে সংসার। শুধু আবদুর রহমানই নন, এই সময়টাতে এলাকায় কাজ না থাকায় রংপুর অঞ্চলের শ্রমজীবীদের দুর্গতি চরমে। তার ওপর জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় বেড়েছে দুর্ভোগ।
আলুসহ শেষ হয়েছে রবি ফসল উত্তোলন। মাঠের বোরো ধানের কাটামাড়াই শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষিকাজ না থাকায় রংপুর অঞ্চলের কৃষি শ্রমিকরা এখন বেকার। মৌসুমি এই বেকারত্বের কারণেই সংসারে টানাপড়েন।
রংপুরে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। বিশেষ করে তিস্তার চরাঞ্চলসহ গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও তারাগঞ্জ এলাকার কৃষি শ্রমিকরা বছরের এই সময়টাতে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ছুটে চলেন নানা দিকে। সকালবেলায় দল বেধে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। কাজের আশায় ছুটে যান শহরে। প্রত্যেকের সাইকেলের পেছনে বাঁধা থাকে ডালি, কাস্তে, কোদাল, দা, খন্তাসহ কাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম।
শ্রমিকের হাট নামে পরিচিত রংপুর শহরের শিমুলবাগ, জামতলা মোড়, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, বেতপট্টি কিংবা রেলওয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করেন তারা। কাজ মিললে ভালো, না মিললে বাড়ি ফেরেন খালি হাতে।
শিমুলবাগে কাজের আশায় অপেক্ষায় ছিলেন কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষ। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। গঙ্গাচড়ার শংকরদহ চরের আলীমুদ্দিনের ভাষ্য, ‘পত্যেকদিন বিয়ানে (সকালে) আল্লার নামে বাড়ি থাকি বেড়াই, যদি কাম জোটে। ছাওয়াগুলার (সন্তানদের) মুখোত খাওন দেওয়া নাগবেতো! কিন্তুক একদিন কাম (কাজ) জোটে তো তিনদিন খালি হাতে নিরাশ হয়্যা ফিরি যাওয়া নাগে।’
সাইকেল চালিয়ে শ্রমিকের হাটে আসেন ছালাপাক চরের আব্দুস সবুর (৬৫)। ক্ষুধায় ঘামছিল শীর্ণকায় শরীর। গায়ে ছেঁড়া গেঞ্জি ও পরনে লুঙ্গি। ‘কাইল থাকি বউ-ছাওয়া নিয়া কষ্টে আছি। সকালে খালি এক গ্লাস পানি খ্যায়া আসচু। কাম জোটলে খরচ করি বাড়িত যাইম, না জোটলে আইজও না খ্যায়া থাকা নাগবে।’
বেলা বাড়ায় ধীরে ধীরে অন্তত ২০ জন মানুষ কাজের সন্ধানে জড়ো হন শিমুলবাগ এলাকায়। তারা জানান, কাজ জুটলে ৫০০ টাকা হাজিরা পাওয়া যায়। বাসাবাড়িতে মাটি কাটা, বালু ফেলা কিংবা ঘরের খুঁটি লাগানোর কাজ করেন। কখনো দল বেধে চুক্তিতে, আবার কখনো বা একাই সারাদিনের জন্য শ্রম বিক্রি করেন। তবে বর্তমানে দিন খারাপ যাচ্ছে, সপ্তাহে তিন দিনের বেশি কাজও মিলছে না। এলাকায় কাজের সুযোগ না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে বলেও জানান তারা।
উন্নয়ন গবেষকদের মতে, প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়ায় খাদ্য সংকটে পড়তে হয় নিম্ন আয়ের মানুষের। বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে কর্মসংস্থানের অভাব।
রংপুরের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ। তার মতে, কর্মহীন মানুষের মূল স্রোতধারায় আনতে না পারলে দারিদ্র্য কমবে না। তাই কৃষিনির্ভর এই এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপন করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই।


