ইউএফও রহস্যের আড়ালে কী?

সংগৃহীত ছবি
ভিনগ্রহের প্রাণী বা ইউএফও (আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট) একসময় অনেকের কাছেই ছিল নিছক কল্পকাহিনি। রূপকথার পরী, ভূত কিংবা অবাস্তব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মতোই এগুলোকে গুরুত্বহীন ভেবে পাশে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৭ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সে ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সেখানে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু বা ইউএফও নিয়ে গোপন গবেষণা চালিয়ে আসছে।
প্রতিবেদনটিতে সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা লুইস অ্যালিজোন্ডো বলেন, তিনি ‘অ্যাডভান্সড অ্যারোস্পেস থ্রেট আইডেন্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’ (এএটিআইপি) নামের একটি গোপন প্রকল্প পরিচালনা করতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আশপাশে এমন কিছু উড়ন্ত বস্তু দেখা গেছে, যেগুলো প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মানে না।
প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে নৌবাহিনীর পাইলটদের বিস্মিত প্রতিক্রিয়া শোনা যায়— তারা বলছিলেন, আকাশে একাধিক বস্তু বাতাসের বিপরীতে চলছিল এবং অস্বাভাবিকভাবে ঘুরছিল। এসব ভিডিও পরে পেন্টাগনও প্রকাশ করে, যা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে।
২০২১ সালের জুনে পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত দুই দশকে নৌবাহিনীর সদস্যদের দেখা ১৪০টির বেশি অজ্ঞাত উড়ন্ত ঘটনার ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেনি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, আকাশে এমন কিছু ঘটছে— যার ব্যাখ্যা জানা নেই।
২০২৩ সালে মার্কিন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডেভিড গ্রুশ কংগ্রেসে দাবি করেন, সরকার গোপনে ভেঙে পড়া মহাকাশযান এবং ‘অমানবিক জীবের নমুনা’ সংরক্ষণ করছে। এসব বক্তব্য মানুষের কৌতূহলকে আরও উসকে দেয় এবং অনেকেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেন, তাহলে কি সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণীরা পৃথিবীতে এসেছে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ২০২৩ সালে এক সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। তবে যাদের ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা— অ্যালিজোন্ডো বা ব্লিঙ্ক-১৮২ ব্যান্ডের গায়ক টম ডিলঞ্জের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এর পর তিনি আরও গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে পান, প্রচারিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল অনেক ক্ষেত্রেই নেই।
পেন্টাগন জানায়, এএটিআইপি নামে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রাম ছিল না এবং অ্যালিজোন্ডোর সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত নয়। প্রকৃতপক্ষে যে প্রোগ্রামটি ছিল, তার নাম ‘অ্যাডভান্সড অ্যারোস্পেস ওয়েপন সিস্টেমস অ্যাপ্লিকেশনস প্রোগ্রাম’ (এএডব্লিউএসএপি)।
এই প্রোগ্রামের সূচনা হয় এক অদ্ভুত ঘটনার মাধ্যমে। গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেমস ল্যাকাটস্কি উটাহর স্কিনওয়াকার র্যাঞ্চে গিয়ে এক রহস্যময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বলে দাবি করেন। দীর্ঘদিন ধরেই এই র্যাঞ্চটি অদ্ভুত সব ঘটনার জন্য পরিচিত— উড়ন্ত আলো, অজানা প্রাণী, পশু নিধন, এমনকি অন্য জগতের প্রবেশদ্বার নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে।
২০০৮ সালে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের একটি সরকারি চুক্তি পায় ব্যবসায়ী রবার্ট বিগলোর প্রতিষ্ঠান। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল উন্নত প্রযুক্তিগত হুমকি বিশ্লেষণ করা; কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ ব্যয় হয় নানা অস্বাভাবিক ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার অনুসন্ধানে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত অনেক প্রমাণই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একটি বিশাল উড়ন্ত চাকতির ছবি পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেটি আসলে কৃষিজমির দুটি সেচ বৃত্তের অপটিক্যাল বিভ্রম। আরেকটি ছবিকে মহাকাশযান মনে হলেও সেটি ছিল জানালায় প্রতিফলিত আলো। নৌবাহিনীর একটি আলোচিত ভিডিও নিয়েও বিশ্লেষক মিক ওয়েস্ট বলেন, সেটি সম্ভবত বিমানের ইঞ্জিনের তাপের প্রতিফলন।
এদিকে অ্যালিজোন্ডোর নিজের দাবিও বিতর্কের জন্ম দেয়। তার প্রকাশিত বইয়ে তিনি মানসিক শক্তি, দূরদর্শন এবং অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন, যা তার বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তবুও গণমাধ্যমের বড় অংশে এসব সমালোচনা খুব একটা গুরুত্ব পায়নি এবং ইউএফও নিয়ে আগ্রহ বরং আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভ্রান্তি, জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রবণতা— সব মিলিয়ে ইউএফও নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৬০-এর দশকের ঠান্ডা যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নানা আলোচিত ঘটনার সময়েও যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের আগ্রহ দেখা গিয়েছিল।
হার্ভার্ডের পদার্থবিদ অ্যাভি লোয়েব মনে করেন, মহাবিশ্বের অন্য কোথাও বুদ্ধিমান প্রাণী থাকা অসম্ভব নয়, তবে তারা পৃথিবীতে এসেছে— এমন প্রমাণ এখনো নেই। আমাদের নিকটতম সম্ভাব্য গ্রহ প্রক্সিমা বি পৃথিবী থেকে ৪ দশমিক ২ আলোকবর্ষ দূরে। বর্তমান প্রযুক্তিতে সেখানে পৌঁছাতে হাজার বছর সময় লাগবে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
সবকিছু মিলিয়ে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ভিনগ্রহের প্রাণীর আগমনের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং এই অনুসন্ধান মানুষের বিশ্বাস, কল্পনা এবং বাস্তবতার সীমারেখা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। হয়তো আমরা একা নই, আবার হয়তো সত্যিই একা।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

