এআই ক্যামেরার জালে আটকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ট্রানজিট লাউঞ্জে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমেল হাওয়া। চারপাশে নানা দেশের হাজারো মানুষের ব্যস্ত কোলাহল। এরই মধ্যে নিভৃতে হাঁটছিলেন এক যাত্রী। লন্ডন থেকে আসা এই যাত্রীর পরবর্তী গন্তব্য ছিল এশিয়ার কোনো এক ‘নিরাপদ’ শহর। চোখে চশমা, চেনা অবয়ব আড়ালের চেষ্টা। কিন্তু নিয়তি ততক্ষণে ডানা মেলেছে মাথার ওপর। বিমানবন্দরের ছাদ থেকে নিঃশব্দে তাকিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) একজোড়া চোখ। সেই যান্ত্রিক চোখ স্ক্যান করল তার মুখমণ্ডল। মুহূর্তেই থমকে গেল সব দম্ভ। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পুলিশপ্রধান, আজ দুবাই পুলিশের হাতে বন্দি।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বেনজীর আহমেদ অবশেষে ধরা পড়েছেন। গত শুক্রবার দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এআই ক্যামেরায় শনাক্তের পর দেশটির পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পরোয়ানার বলে আটক করা হয় তাকে। এ কাজে সহযোগিতা করে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। আটকের এ খবর জানাজানির পর ঢাকায় খোদ পুলিশেরই অনেক সদস্য বলছেন, দুবাই পুলিশের হাতকড়ায় দম্ভচূর্ণ হলো বেনজীরের।
দুবাই বিমানবন্দরে এআই ক্যামেরায় শনাক্তের পর বেনজীরকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেয় দেশটির পুলিশ। লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশে করেছিলেন যাত্রা। দুবাইয়ে ট্রানজিট শেষে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হলে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সেখানেই তাকে করা হয় গ্রেপ্তার। এর আগে বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক এআইভিত্তিক ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিতে তার পরিচয় নিশ্চিত করে তা মিলিয়ে দেখা হয় ইন্টারপোলের তথ্যভাণ্ডারে।
দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এমন এক কর্মকর্তা আলাপকালে জানালেন, বেনজীর আহমেদ লন্ডন থেকে থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। দুবাইয়ের বিমানবন্দরে ট্রানজিটে নামার পর অন্য যাত্রীর মতোই ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আসেন তিনি। আর তখনই বিমানবন্দরের এআই ক্যামেরা স্ক্যান করে তার মুখমণ্ডল। স্ক্যানের তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধীদের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে বেনজীর আহমেদের নামে থাকা ইন্টারপোলের সতর্কতাসংকেত (নোটিস) আসে সামনে। এরপর দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় শাখা যাচাই করে বিষয়টি। কিছু সময়ের মধ্যেই তাকে আটক এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখানো হয় গ্রেপ্তার।
তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি পুলিশের ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলছিলেন, ‘এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। একই সঙ্গে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালী হোক না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
গত ১২ জুন বেনজীরকে গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, শিগগিরই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই নোটিসের মাধ্যমে ইন্টারপোল সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানায়। ১২ জুন আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বললেন, গ্রেপ্তারের দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি ও অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে এনসিবি (ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগকারী পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখা)।
জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে পুলিশ। এর আগে দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালত জারি করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। দুদকের পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি আবেদন করে ইন্টারপোলে। গত বছরের ১১ এপ্রিল আবেদনটি পাঠানোর পর ইন্টারপোল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে জারি করে রেড নোটিস। একই সঙ্গে ওই নোটিসের বরাতে ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বেনজীরকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানানো হয়।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিলেন আইজিপি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যাতে নাম নাম ছিল বেনজীরেরও।
২০২৪ সালের শুরুতে তার বিপুল সম্পদ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে সাবেক এই পুলিশপ্রধানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। হাইকোর্টও অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেয়। অনুসন্ধানে বেনজীর এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে জমি, ফ্ল্যাট, কোম্পানির শেয়ার এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্যসহ বিপুল সম্পদের খেঁাজ পায় দুদক। আদালতের আদেশে বিভিন্ন সময়ে শত শত বিঘা জমি, একাধিক ফ্ল্যাট, কোম্পানির শেয়ার এবং ব্যাংক হিসাব জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়। তবে এর আগেই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সপরিবারে দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানালেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে কমিশনের ছয়টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা দুটি মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে জারি করা হয়েছিল রেড নোটিস। ওই নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতেই দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও বললেন, দুদকের মামলার পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুসরণ করেই কাজ চলছে এ বিষয়ে।
দুদকের আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, বিদেশে অবস্থানরত কোনো আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ফলে বিষয়টি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেনজীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে দুদক।


