ঢাকার বুকে সতেরো শতকের ইউরোপীয় সমাধিভূমি

ছবি : লেখক
ব্যস্ত শহরের ভিড় ছাপিয়ে নারিন্দার নিঝুম কোণে নিশ্চুপে শুয়ে আছে এক প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র— সতেরো শতকের ইউরোপীয় কবরস্থান। কালের নিয়মে আজ তার বহু এপিটাফ ও স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে গেলেও শত শত কবরের মধ্যে আজও সজীব এক ভিনদেশি জনপদের মায়াবী ইতিহাস। ভাগ্য অন্বেষণে আসা সেই ইউরোপীয়দের আগমন, বসতি ও চিরনিদ্রার এক করুণ উপাখ্যান লিখেছেন বাবু আহমেদ
ঢাকায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বা ইউরোপীয়দের একমাত্র সমাধিক্ষেত্র পুরান ঢাকার নারিন্দায়। অনেকে এটিকে নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থানও বলে থাকেন। খুব সম্ভবত সতেরো শতকের শুরুতেই এই সমাধিক্ষেত্রটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। মোগল রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠা ব্রিটিশরাজের সূচনার অনেক আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ও ঢাকায় প্রচুর ইউরোপীয়র সমাধি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এদের মধ্যে বেশকিছু অজানা সমাধিও রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী, যাজক, সৈনিক, নাবিক, বিচারক, চিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নারী ও শিশুসহ নানা পেশা ও বয়সের মানুষের সমাধি রয়েছে এখানে। নিজের দেশ ছেড়ে ভাগ্যের সন্ধানে আসা এ মানুষগুলো আজ এই বাংলার মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত।
সমাধি বা কবর সব ধর্মের মানুষের জন্যই এক নীরব, স্থির ও স্মৃতিকাতর স্থান। নারিন্দা সমাধিতে তখনকার সময়ের অনেক বিদেশি নামিদামি মানুষের কবরও রয়েছে। এসব সমাধির এপিটাফ বা স্মৃতিফলক কলকাতায় তৈরি করা হতো; কারণ তখন ঢাকায় কষ্টিপাথর ও মার্বেল পাথরের এপিটাফ বানানোর মতো কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। এই সমাধিক্ষেত্রে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সমাধিফলকটি ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দের। তবে একটা কথা আমি নিজের মনকে সবসময় বোঝানোর চেষ্টা করেছি— গত চার দশকে আমার ক্যামেরায় ধারণকৃত যত দলিল বা স্থাপত্য দেখেছি, প্রথমবার ফ্রেমবন্দি করার পর ভেবে নিয়েছি পরে এখানে এলে সেটির দেখা আর পাব তো? ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আসলেই অনেক কিছু আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
অতি মূল্যবান কষ্টিপাথর ও মার্বেল পাথরের তৈরি প্রিয়জনদের স্মৃতিফলক, এমনকি ভাস্কর্যগুলোও অ্যান্টিক পাচারকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
নিজের দেশ ছেড়ে ভাগ্যের সন্ধানে আসা এ মানুষগুলো আজ এই বাংলার মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত। সমাধি বা কবর সব ধর্মের মানুষের জন্যই এক নীরব, স্থির ও স্মৃতিকাতর স্থান
১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশপ হেবার যখন ঢাকায় আসেন, তখন তিনি এই সমাধিক্ষেত্রটিকে অবহেলিত, জঙ্গলাকীর্ণ, পরিত্যক্ত ও অস্বাভাবিক মাত্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এফ বি ব্র্যাডলি-বার্ট ঢাকায় এলে এই সমাধিক্ষেত্রটির জরাজীর্ণতার চিহ্ন তার চোখেও ধরা পড়ে। তবে তখন পর্যন্ত প্রতিটি সমাধির এপিটাফ অক্ষত অবস্থায় ছিল বলে জানা যায়। গত চার দশক ধরে এই সমাধিক্ষেত্রটি আমার ক্যামেরার লেন্সের মধ্য দিয়ে আমার ভেতরে এক ভিন্নতর ও গভীর ভাবাবেগপূর্ণ অনুভূতির সৃষ্টি করেছে।
সমাধিক্ষেত্রের গোটা অংশটি তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশে রয়েছে ১৭২৪ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের প্রাচীনতম সমাধিগুলো, দ্বিতীয় অংশে ১৮৫০ থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতা তথা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ পর্যন্ত নির্মিত সমাধি এবং বাকি অংশ জুড়ে রয়েছে সমসাময়িককালে নির্মিত স্থানগুলো।
শ্রেণিভেদে এই কমপ্লেক্সে ছয় ধরনের সমাধি রয়েছে। টাইপ-এ সমাধির কোনো সংস্থান বা শিলালিপি নেই। টাইপ-বি সমাধিগুলো অসাধারণ আকৃতি ও নকশাসমৃদ্ধ। টাইপ-সি, ডি ও ই সমাধিগুলো চারকোনা বা পিরামিড আকৃতির; বলা যায়, এই সমাধিগুলোয় অপেক্ষাকৃত পুরাতন ও প্রাদেশিক সমাধিক্ষেত্রগুলোর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। আর টাইপ-এফ হচ্ছে এই সমাধিস্থলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বিস্ময়কর নিদর্শন, যা চন্দ্রাতপের আদলে নির্মিত মন্দিরাকৃতির ইমারতগুলো। গোলাকার, বর্গাকার ও অষ্টভূজাকৃতির এসব চন্দ্রাতপে ডোরিক ও আইয়োনিক স্তম্ভের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
সংক্ষেপে বর্ণনা করলেও একটি স্মৃতিফলক আমাকে আজও বিস্মিত করে। ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশপ হেবার এই সমাধিক্ষেত্রে এসে সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় একটি সমাধির কথা উল্লেখ করেন, যা তার বর্ণনামতে মুসলিম রীতিতে তৈরি ‘কলম্বো’ সাহেবের সমাধি। তবে এই ‘কলম্বো’ সাহেব কে ছিলেন, তা আজ পর্যন্ত এক রহস্য। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই সমাধিক্ষেত্রের এপিটাফগুলো ধীরে ধীরে চুরি হতে থাকে। আমার আর্কাইভেও এমন অনেক এপিটাফের ছবি আছে, যা এখন আর সমাধিক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না।
চিরনিদ্রায় শায়িত এই ভিনদেশি মানুষগুলো আজও সুরক্ষিত নন। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে তোলা নারিন্দা খ্রিস্টান সমাধির দুটি অসাধারণ আলোকচিত্র ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে; পাশাপাশি মুসলিম রীতিতে নির্মিত এর প্রাচীন প্রবেশদ্বারের ছবিও সেখানে রয়েছে।
সমাধির ভেতরের রহস্যময় ‘কলম্বো’ সাহেবের সমাধিটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপত্যের তালিকাভুক্ত। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এর ভেতরের প্রচুর মূল্যবান এপিটাফ চুরি হয়ে গেলেও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কোনো হেলদোল দেখা যায়নি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে গত চার দশক ধরে ক্যামেরার লেন্স দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখ খোলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু উদাসীন প্রশাসন যেন সব দেখেও চোখ বন্ধ করে রেখেছে।





