সিনেমার বাজারকে সারা বছর সচল রাখতে চাই

শাকিব খান। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
ঢাকাই চলচ্চিত্রের দীর্ঘ সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা শাকিব খান। তিনি এখন ব্যক্তিগত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহতাব হোসেন
যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে সময় কাটছে?
যুক্তরাষ্ট্রে এলে নিজের মতো করে সময় কাটাই। এখানে দেশের অনেক শিল্পী ও পরিচিত মানুষ আছেন; সুযোগ হলে তাদের সঙ্গে দেখা করি, আড্ডা দিই। পাশাপাশি কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করি। নিয়মিত জিমে যাই, কেনাকাটা করি। এখানে আমার কিছু আত্মীয় আছেন, তাদের সঙ্গেও সময় কাটাই। আমার মনে হয়, কাজের ফাঁকে প্রত্যেক মানুষেরই নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা উচিত। এতে মন ভালো থাকে, নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে আবারও নতুন উদ্যমে কাজে ফেরা যায়।
এর আগে প্রায় ৯ মাস যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। কখনো মনে হয়েছিল, আপনি চলচ্চিত্র জগৎ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন?
চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলাম। তখন করোনা মহামারীর তৃতীয় পর্যায় চলছিল। পরিস্থিতি এতই অনিশ্চিত ছিল যে নিউ ইয়র্ক, লন্ডনসহ বিশ্বের অনেক বড় শহর আবারও বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। যৌথ প্রযোজনায় আমার একটি সিনেমার শুটিংয়ের পরিকল্পনা ছিল লন্ডনে। কিন্তু কভিড পরিস্থিতির কারণে সেটি আর এগোয়নি। তখন যুক্তরাষ্ট্রে আমার আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি আমাকে সেখানে কিছুদিন থেকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ৯ মাস থাকতে হয়েছিল। তবে কখনোই মনে হয়নি, চলচ্চিত্র জগৎ থেকে হারিয়ে যাচ্ছি। হয়তো পর্দায় নিয়মিত দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নতুনভাবে, আরও ভালোভাবে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিশ্বাস করি, একজন শিল্পী কিছু সময় আড়ালে থাকতে পারেন, কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে তার জায়গা থাকলে তিনি কখনো হারিয়ে যান না।
দেশে ফিরে নতুন করে আপনার ক্যারিয়ারের পুনরুত্থান ঘটবে, ভাবতে পেরেছিলেন?
ভালো কাজের প্রতি নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর দর্শকের ভালোবাসা থাকলে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, এটি সবসময় বিশ্বাস করেছি। দেশের বাইরে থাকলেও চলচ্চিত্র থেকে কখনো নিজেকে আলাদা ভাবিনি। ফিরে এসে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছি, আর দর্শক যেভাবে আমাকে গ্রহণ করেছেন এবং ভালোবেসেছেন, সেসবই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
‘প্রিয়তমা’র পর এমনকি দেশের হলিউড সিনেমার দর্শকও আপনার সিনেমা দেখতে শুরু করেন। এ বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
‘প্রিয়তমা’র পর বাংলা সিনেমার যাত্রা উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এটি বাংলা সিনেমার জন্য নতুন সম্ভাবনার একটি দরজা খুলে দিয়েছে। আমাদের সম্ভাবনা, মেধা ও দর্শক আছে। সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে একদিন বাংলা সিনেমা শুধু দেশের দর্শককে নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শকের নিয়মিত পছন্দের তালিকায়ও জায়গা করে নেবে। সেই দিন খুব দূরে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেক্ষাগৃহে বসে নিজের সিনেমা দেখেছিলেন। সে অনুভূতি কেমন ছিল? আশপাশের দর্শক কী বলেছিল মনে পড়ে?
নিজের দেশের সিনেমা হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে বসে দর্শকদের সঙ্গে দেখার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। পর্দায় যখন বাংলা সিনেমা চলছিল, আর আশপাশের দর্শকের হাসি, আবেগ, উচ্ছ্বাস ও প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম, তখন ভেতরে এক ধরনের গর্ব কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি চলচ্চিত্র দেখছি না; বাংলা সিনেমাকে বিশ্বের কাছে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল— সেখানে শুধু বাঙালি দর্শকই ছিলেন না, বিভিন্ন বয়স ও ভিন্ন ধরনের সিনেমাপ্রেমীরা উপভোগ করছিলেন। কেউ গল্পের প্রশংসা করছিলেন, কেউ নির্মাণের মান নিয়ে কথা বলছিলেন, আবার অনেকে বলছিলেন— বাংলা সিনেমা এখন আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগোচ্ছে। দর্শকের এই ভালোবাসা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে। কারণ তখন মনে হয়— আমাদের সিনেমার সম্ভাবনা অনেক বড়। ভালো গল্প, মানসম্মত নির্মাণ এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বাংলা সিনেমা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। সেই বিশ্বাসই আমাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়।
সে সময় এয়ারপোর্টে হাজার হাজার ভক্ত হাজির হয়েছিল, ঢাকার একদিক কার্যত অচল ছিল, সে সময়ের অনুভূতিটা কেমন ছিল?
আমার দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটেছিল, যা আমি জীবনে কোনো দিন ভুলতে পারব না। শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের কোনো শিল্পীর দেশে ফেরাকে ঘিরে এর আগে এমন দৃশ্য দেখা গেছে কি না, আমার জানা নেই। সেদিন ঢাকায় নেমে দেখি বৃষ্টি হচ্ছে। এয়ারপোর্টে নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনের সবাই আমাকে ভীষণ আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন; কিন্তু তখনো আমি কল্পনাও করতে পারিনি, এয়ারপোর্টের বাইরে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে। গাড়িতে ওঠার আগে বাইরে তাকিয়ে দেখি— দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার ভক্ত আমাকে বরণ করে নিতে এয়ারপোর্টের সামনে অপেক্ষা করছেন। চারদিকে শুধু মানুষের ঢল আর ভালোবাসা। এয়ারপোর্ট থেকে আমার দেশে ফেরার মুহূর্তটি বিভিন্ন টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল। সেদিন আমি সত্যিই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ নয় মাস দেশের বাইরে থাকার পরও সেদিন উপলব্ধি করেছি, মানুষ আমাকে ভোলেনি; বরং আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা আরও বেড়েছে। সেই দিনের ভিডিও ফুটেজগুলো এখনো দেখলে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। বাসায় ফিরে সেদিন একা একা অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। পুরো ঘটনাটা আজও আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। আমার এবং আমার ফ্যামিলির মানুষের কাছেও দিনটি আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেদিনই আমি নিজের কাছে একটি প্রতিশ্রুতি করেছিলাম—আমাকে আরও ভালো কাজ করতে হবে। যারা আমাকে এত ভালোবাসে, এতটা সময় ধরে পাশে থাকে, তাদের জন্য আমাকে আরও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। তাদের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার সবচেয়ে বড় উপায় হলো ভালো সিনেমা উপহার দেওয়া।
এখন আপনি জনপ্রিয় নায়ক, কিন্তু একটা সময় আপনার শৈশব ছিল; সে সময়টা কেমন ছিল?
অধিকাংশ মানুষের কাছেই শৈশবজীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও নির্ভার সময়। তখন পড়াশোনা আর খেলাধুলা ছাড়া তেমন কোনো চিন্তা বা দায়িত্ব থাকে না। আমার শৈশবও অনেকটা তেমনই ছিল— খুব আনন্দে, স্বাধীনভাবে এবং পরিবারের ভালোবাসায় কেটেছে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, দুষ্টুমি, স্কুল— সব মিলিয়ে দারুণ কিছু স্মৃতি আছে। এখন জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে অনেক সময় সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তখন মনে হয়, যদি আবার একবার শৈশবের সেই দিনগুলোয় ফিরে যেতে পারতাম! শৈশবের সরলতা, আনন্দ আর নির্ভার সময়গুলো সত্যিই খুব বিশেষ।
সে সময় বাবা-মায়ের শাসন কেমন ছিল, খুব কড়া?
শাসন তো ছিলই। আমার শৈশব যেমন বাবা-মায়ের আদর ও ভালোবাসায় কেটেছে, তেমনি প্রয়োজনের সময় কড়া শাসনও ছিল। তখন হয়তো অনেক কিছু ভালো লাগত না; কিন্তু এখন বুঝি— সেই শাসনের পেছনেও ছিল আমাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা। তবে সময় বদলেছে। এখনকার শিশুদের ক্ষেত্রে শাসনের ধরনও অনেক বদলে গেছে। শাসন মানেই মারধর— আমি সেটা মনে করি না, আর ব্যক্তিগতভাবেও আমি সেটাকে সমর্থন করি না। ভালোবাসা, বোঝানো, সময় দেওয়া এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেও একটি শিশুকে শৃঙ্খলা শেখানো সম্ভব। আমার মনে হয়, সন্তানদের শুধু আদর করলেই হয় না; আবার অতিরিক্ত কঠোরতাও ঠিক নয়। আদর, যত্ন, সময় এবং প্রয়োজনীয় শাসনের মধ্যে একটা সুন্দর ভারসাম্য থাকা জরুরি। কারণ সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে অনেক সময় শিশুরা ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল পথে চলে যেতে পারে।
ঠিক নায়ক হওয়ার বাসনা কোন মুহূর্তে মনে হয়েছিল? সিনেমায় কীভাবে সুযোগ পেলেন, সেই গল্পটা শুনতে চাই
নায়ক হওয়ার বাসনা কোনো এক মুহূর্তে হঠাৎ তৈরি হয়নি; ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি ভালোবাসা ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা হলে গিয়ে মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখতাম। তখন আমি তরুণ, একবার বন্ধুদের সঙ্গে এফডিসিতে শুটিং দেখতে গিয়েছিলাম। এফডিসি দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। তখনই একজন ফটোগ্রাফার কিছু ছবি তুলে দিয়েছিলেন। সেই ছবিগুলো দেখে একজন পরিচালক আমাকে খুঁজে বের করে নায়ক হওয়ার প্রস্তাব দেন। আমি যেমন চমকে গিয়েছিলাম তেমনি বিস্মিত হয়েছিলাম; কিন্তু বাড়িতে জানাতে বাবা রাজি ছিলেন না। আম্মাকে অনেক অনুরোধ করে রাজি করাই। তিন মাস সময় নিয়েছিলাম। সেই তিন মাস থেকে আজ কখন যে ২৭ বছর হয়ে গেল টেরই পাইনি।
প্রথম সিনেমা দেখে আপনার বাবা-মা কি মন্তব্য করেছিলেন?
আম্মা খুব খুশি ছিলেন; কিন্তু বাবার কাছে মনে হয়েছিল সিনেমা খুব রিস্কি জায়গা। কিছুটা ভয়ে ছিলেন, কারণ আমি সিনেমায় আসায় তিন বছর আগেই সালমান ভাই (সালমান শাহ) মারা গিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে বাবা শুরুতে এসব কারণে অমত ছিলেন; কিন্তু ধীরে ধীরে যখন মানুষ আমাকে পছন্দ করতে শুরু করল তখন থেকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।
শুরুর ঢাকার সংগ্রামের জীবনে আপনি যেসব মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান, কে কীভাবে আপনাকে হেল্প করেছিল?
এ কথা অনেকবারই বলেছি। আমার জীবনের শুরুর দিকের সংগ্রামের সময়ে অনেক মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সমর্থন পেয়েছি। তাদের প্রত্যেকের অবদান আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি; কিন্তু এত মানুষের নাম এই মুহূর্তে আলাদা করে বলা হয়তো সম্ভব নয়। কারণ, আমার পথচলায় ছোট-বড় অনেকেই কোনো না কোনোভাবে পাশে ছিলেন, সাহস দিয়েছেন, সুযোগ করে দিয়েছেন কিংবা এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তাদের কথা মনে পড়লে খুব আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। মহান আল্লাহ যেন তাদের সবাইকে মাফ করে দেন এবং জান্নাত নসিব করেন। আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষের সাফল্য কখনোই শুধু তার একার হয় না। আমার আজকের অবস্থানের পেছনেও অনেক মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও অবদান রয়েছে। আমি তাদের সবার প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ এবং আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
শাবনূরের সঙ্গে কাজ করেছেন, তার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শাবনূর মানুষ হিসেবে ভীষণ চমৎকার এবং একজন শিল্পী হিসেবে অসাধারণ। তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও সবসময়ই খুব ভালো। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব একটা স্বকীয়তা ছিল— খুব স্বাভাবিক, সহজাত এবং আবেগপূর্ণ অভিনয় দিয়ে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। আমি সবসময়ই মনে করি, শাবনূর আনবিটেন। তার অভিনয়, জনপ্রিয়তা এবং দর্শকদের সঙ্গে যে গভীর সংযোগ সেটা সত্যিই অনন্য। অনেক শিল্পী আসবেন, নিজেদের জায়গা তৈরি করবেন; কিন্তু শাবনূর তার নিজস্ব অবস্থানে সবসময়ই বিশেষ এবং অতুলনীয়।
চলচ্চিত্রের এই আঙিনা সহজ নয়, খ্যাতিমানরাই বাধাপ্রাপ্ত হন, সালমান শাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। আপনাকে নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। সবচেয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন কখন?
অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এখানে এমন ঘটনা হয়তো একটু বেশি দেখা যায়। আমার ক্যারিয়ারে অনেকবার আমাকে থামিয়ে দেওয়ার বা ব্যান করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলাম, যখন দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় ‘শিকারী’র পর ‘নবাব’ সিনেমায় কাজ করছিলাম। সেই সময় কিছু মানুষ, যাদের আমি সত্যিকার অর্থে শিল্পী হিসেবে মূল্যায়ন করি না, তারা হঠাৎ করেই রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের ছায়ায় সামনে চলে আসেন। তারা নিজেদের কাজের চেয়ে সমিতিকেন্দ্রিক বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। অথচ সেই সময় চলচ্চিত্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় একটা সময় ছিল। কিছু মানুষ তখন কয়েকজন সিনিয়র শিল্পীকেও বিভিন্নভাবে ভুল বুঝিয়েছিলেন এবং তাদের প্রভাবিত করেছিলেন। এরপর আন্দোলনের মাধ্যমে আমাকে থামিয়ে দেওয়ারও অনেক চেষ্টা হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সিনিয়র শিল্পীরা বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছিলেন। পরে তারা আমাকে নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির কথাও জানিয়েছেন। এরপর সবার সঙ্গে আমার সম্পর্কও আবার স্বাভাবিক ও সুন্দর হয়েছে। তবে ওই সময় আমার দেশের মানুষ আমাকে যেভাবে ভালোবেসেছেন এবং সমর্থন দিয়েছেন, তা আমি কখনো ভুলব না। দর্শক যেন আমাকে আগলে রেখেছিলেন। ‘নবাব’ মুক্তির পর তারা সিনেমাটিকে দারুণভাবে গ্রহণ করেন এবং সেটি বড় সাফল্য পায়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, মালয়েশিয়া, ওমান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশেও সিনেমাটি তুমুল সাড়া ফেলে এবং ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়। সেই সময় দেশে-বিদেশে আমার অনেক ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন ‘তোমরা শাকিব খানকে যতবার আটকানোর চেষ্টা করবে, আমরা ততবার ভালোবাসা দিয়ে তাকে আরও শক্ত করে পাশে রাখব।’ দিন শেষে সেটাই সত্যি হয়েছে। আমার বিশ্বাস, মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। নানা বাধা, সমালোচনা কিংবা প্রতিকূলতা এসেছে; কিন্তু প্রতিবারই দর্শকদের ভালোবাসা আমাকে আরও শক্তভাবে ফিরে আসার সাহস দিয়েছে। দিন শেষে সবসময় ভালোবাসারই জয় হয়েছে।
আপনি শিল্পীদের পাশে দাঁড়ান; কিন্তু সেগুলো প্রচারে আসে না, কেন?
প্রকৃত শিল্পীরা অন্য শিল্পীর বিপদে পাশে দাঁড়াবেন এটাই তো স্বাভাবিক। এসব নিয়ে প্রচার করার কী আছে? এটা তো নতুন বা ব্যতিক্রমী কোনো বিষয় নয়। একজন প্রকৃত শিল্পী আরেকজন শিল্পীর সম্মান, কষ্ট ও প্রয়োজনের জায়গাটা বোঝেন। আর এসব কথা বলে বেড়ান তারাই, যাদের হয়তো দেখানোর মতো আর কিছু নেই তাই সবকিছুকেই ‘শো-অফ’-এ পরিণত করেন।
পরের সিনেমা নিয়ে কী ভাবছেন?
সবার আগে ‘সোলজার’ মুক্তি পাবে। ২০২৭ সাল থেকে বছরে অন্তত চারটি সিনেমায় কাজ করার চেষ্টা করব। কারণ, আমাদের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি সিনেমার নিয়মিত প্রদর্শনী। নতুন সিনেমার অভাবে অনেক প্রেক্ষাগৃহ টিকে থাকতে পারছে না, এমনকি কিছু সিঙ্গেল স্ক্রিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু ঈদ কেন্দ্র করে নয়— সারা বছরই দর্শক যেন নতুন সিনেমা দেখতে পারেন, সেটাই আমি চাই। আমার পরিকল্পনা আছে, ঈদের বাইরে অন্তত দুটি সিনেমা মুক্তি দেওয়ার। আমার ক্যারিয়ারের অনেক সফল সিনেমা ঈদ উৎসবের বাইরে মুক্তি পেয়েছে। তাই ভালো গল্প, মানসম্মত নির্মাণ এবং দর্শকের প্রত্যাশা— এই তিনটি বিষয়ের সম্মিলন থাকলে মুক্তির সময়টা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
পুরোদস্তুর সংসারী হবেন কবে?
এর উত্তর এখনই দিয়ে দিলে তো পরের সাক্ষাৎকারে আর কোনো রহস্যই থাকবে না! বিভিন্ন দেশের তারকারা সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে আসেন, আপনার তেমন ইচ্ছা আছে?
কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছিলাম না, এখনো নেই। বিশ্বাস করি, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন শিল্পী। শিল্পীরা সবার। তারকা হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। অনেক সময় আমার অজান্তেই কেউ দূর থেকে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এসব দেখে ব্যক্তিগত অবস্থান বা বিশ্বাস সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক নয়।




