কাবার কিসওয়া: ভালোবাসা, ঐতিহ্য ও ঈমানের প্রতিচ্ছবি
- কাবার গিলাফ: মুসলিম উম্মাহর আবেগ ও আত্মার প্রতীক
- কাবার গিলাফ পরিবর্তন: প্রক্রিয়া, ইতিহাস ও তাৎপর্য
- কিসওয়া তৈরির গল্প: কারিগরি, খরচ ও ঐতিহ্য

সংগৃহীত ছবি
পবিত্র কাবা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের নামাজের দিকনির্দেশনা এই ঘরকে ঘিরেই। আর এই কাবা শরিফকে আচ্ছাদিত করে রাখা কালো বস্ত্র যাকে কাবার গিলাফ বা কিসওয়াতুল কাবা বলা হয়। তা শুধু একটি কাপড় নয়; বরং এটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে ভালোবাসা, সম্মান, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
কিসওয়া পরিবর্তনের সময় ও প্রক্রিয়া
প্রতি বছর ইসলামি চন্দ্রবর্ষের ৯ জিলহজ, অর্থাৎ হজের আরাফাতের দিনে কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হতো। এটিই ছিল সুদীর্ঘ সময়ের কিসওয়াতুল কাবা পরিবর্তনের নিয়ম। এই দিনটি বেছে নেওয়ার পেছনেও ছিল গভীর তাৎপর্য। এ সময় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত হাজিরা আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করেন, আর সেই মুহূর্তেই কাবা নতুন আবরণে সজ্জিত হতো।
পুরনো কিসওয়া ধীরে ধীরে খুলে ফেলা হতো এবং নতুন কিসওয়া অত্যন্ত যত্ন ও মর্যাদার সঙ্গে কাবার ওপর পরানো হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে হজযাত্রীরে চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় আরাফঅতের দিনে গিলাফ পরিবর্তন খুব কঠিনতর কাজ হয়ে যায়। যার কারণে ২০২২ সাল থেকে এই সময় পরিবর্তন করে হিজরি নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ মহররম নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিসওয়ার উপাদান, নকশা ও প্রস্তুত করণ
বর্তমানে সৌদি আরব সরকার কিসওয়া প্রস্তুতের দায়িত্ব পালন করে। মক্কার একটি বিশেষ কারখানায় দক্ষ কারিগররা এটি তৈরি করেন। এই কারিগররা শুধু পেশাদার নন; তারা এটিকে ইবাদতের অংশ হিসেবেই দেখেন।
কিসওয়া মূলত উচ্চমানের কালো সিল্ক কাপড় দিয়ে তৈরি। এর ওপর সোনালি ও রূপালি সুতো দিয়ে কোরআনের আয়াত সূচিকর্ম করা হয়। প্রতিটি অক্ষর যেন আল্লাহর বাণীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ। ৬৫৮ বর্গমিটারের গিলাফটি তৈরিতে ৬৭০ কেজি কালো রেশম ব্যবহার করা হয়। ৪৭টি কাপড়ের টুকরা দিয়ে পুরো গিলাফ সেলাই করা হয়। ১৬ মিটার দৈর্ঘ্যের বিশ্বের সর্ববৃহৎ সেলাই মেশিনে করা হয় এসব কাজ। কারুকার্যের অনেক কাজ হাতে করা হয়।
২১ ক্যারেটের ১২০ কেজি স্বর্ণ ও ১০০ কেজি রুপার সুতা দিয়ে সেই কাপড়ে লেখা হয় পবিত্র কোরআনের আয়াত ও আল্লাহর গুণবাচক নাম। গিলাফের সব কাজ শেষ করতে ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে। সব এই গিলাফ তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ছয় মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই গিলাফকে বিশ্বের ব্যয়বহুল কাপড় বলে মনে করা হয়।
ইতিহাসে প্রথম কিসওয়া পরিবর্তন
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, কাবার গিলাফ পরিবর্তনের প্রথা প্রাচীন যুগ থেকেই চলে আসছে। ইসলামের আগেও আরবরা কাবাকে সম্মান জানিয়ে বিভিন্নভাবে ঢেকে রাখত।
পঞ্চম শতাব্দীর ইতিহাসে কাবাঘরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা বর্ণনা করেছেন ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশাম। তাদের বিবরণ অনুযায়ী, ইয়েমেনের হিমিয়ার রাজবংশের শক্তিশালী শাসক তুব্বা আবু কারিব আসাদ-ই সর্বপ্রথম কাবাঘরকে কিসওয়া দ্বারা আচ্ছাদিত করেন।
এই রাজার জীবনযাত্রা ছিল নাটকীয় পরিবর্তনে ভরপুর। শাসনের শুরুতে তিনি ছিলেন প্রচলিত পৌত্তলিক বিশ্বাসে আস্থাশীল। কিন্তু এক মর্মান্তিক ঘটনার পর তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়; তার পুত্র মদিনায় নিহত হলে তিনি প্রতিশোধ নিতে মদিনা ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন। ঠিক সেই সময় দুই জ্ঞানী ইহুদি ধর্মগুরু তাকে বিরত করেন। তাদের যুক্তি ও প্রজ্ঞায় প্রভাবিত হয়ে রাজা যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ান এবং পরবর্তীতে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেন।
মদিনা থেকে ফেরার পথে তিনি পৌঁছান মক্কায়। যাত্রাপথে কিছু শত্রুভাবাপন্ন গোত্র তাকে প্ররোচিত করেছিল; কাবাঘরে নাকি বিপুল ধনসম্পদ লুকানো আছে, যা লুট করা যেতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে থাকা ইহুদি পণ্ডিতরা তাকে সতর্ক করেন; এটি কোনো ধনভাণ্ডার নয়; বরং কাবা হল সৃষ্টিকর্তার উপাসনার পবিত্র ঘর, যা ইব্রাহিম (আ.) নির্মাণ করেছিলেন। তারা রাজাকে সম্মান ও পবিত্রতার সঙ্গে এই ঘরকে ঘিরে ধর্মীয় আচার পালনের পরামর্শ দেন।
রাজা তুব্বা মক্কায় কয়েকদিন অবস্থান করেন। এই সময়ে তিনি কাবা তাওয়াফ করেন, পশু কোরবানি দেন এবং সেই মাংস ও মধু স্থানীয় মানুষের মাঝে বিতরণ করেন। তিনি মাথা মুণ্ডন করে বিনয় ও আনুগত্যের প্রতীকও প্রকাশ করেন।
এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি স্বপ্নে পরপর তিনবার নির্দেশ পান কাবাঘরকে আচ্ছাদিত করার জন্য। প্রথমে তিনি সাধারণ কাপড় দিয়ে ঢাকেন, পরে আরও উন্নতমানের বস্ত্র ব্যবহার করেন এবং সর্বশেষে ইয়েমেনের উৎকৃষ্ট কাপড় দিয়ে কাবাকে আবৃত করেন। এই ধারাবাহিক প্রয়াসই ইতিহাসে প্রথম কিসওয়া প্রদানের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
শুধু তাই নয়, তিনি কাবাঘরের জন্য একটি দরজা ও তালার ব্যবস্থাও করেন; যা এই পবিত্র স্থানের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
ইসলামের আগমনের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এই প্রথাকে সুসংগঠিত রূপ দেন। খলিফাদের যুগে এই প্রথা আরও বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন শাসক কিসওয়া তৈরিতে অংশগ্রহণ করতেন এবং এটিকে নিজেদের জন্য সম্মানের বিষয় মনে করতেন।
মুসলিমদের আবেগ ও অনুভূতি
কিসওয়া পরিবর্তনের মুহূর্তটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের গভীরে স্পর্শ করে। যখন পুরনো কিসওয়া সরানো হয়, তখন মনে হয় যেন এক বছরের ইবাদত, কান্না, দোয়া; সবকিছু নতুনভাবে নবায়ন হচ্ছে। আর নতুন কিসওয়া পরানোর সময় মনে হয়; আল্লাহর ঘর নতুন আলোয়, নতুন ভালোবাসায় আলোকিত হচ্ছে।
যারা হজে গিয়ে এই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন, তাদের জন্য এটি এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। মনে হয়, দুনিয়ার সব কষ্ট, সব দুঃখ যেন এই পবিত্র ঘরের ছায়ায় এসে প্রশান্তিতে বিলীন হয়ে যায়।
কাবার কিসওয়া শুধু একটি কাপড় নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভালোবাসা ও ঈমানের প্রতীক। প্রতি বছর এর পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়; জীবনেও নতুন করে শুরু করার সুযোগ আছে, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ আছে।
পবিত্র মক্কার এই দৃশ্য যেন আমাদের অন্তরে চিরকাল জাগ্রত রাখে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বিনয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, এন. আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।

