টয়লেটের ক্লিনার লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্বে

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
সূর্য তখন পুবদিকে কেবল উঁকি দেয়। চাবির গোছা নিয়ে হাজির আব্দুর রাজ্জাক। ব্যবহারকারীরা আসার আগেই সেরে রাখেন কিছু কাজ। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পাবলিক টয়লেটের গেট খোলা আর পরিষ্কার রাখা তার গুরুভার। এর বাইরেও আছে। টয়লেটের ঠিক ওপরের দুই ফ্লোরে লাইব্রেরি। সিটি করপোরেশনের এ জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র খোলার দায়িত্বও তার। লাইব্রেরিয়ান আছেন, আসেন কালেভদ্রে। আব্দুর রাজ্জাকই যেন সব!
লাইব্রেরি থেকে নামতেই হালকা ছিপছিপে গড়নের রাজ্জাকের সাথে দেখা এই প্রতিবেদকের। কথায় বরিশালের আঞ্চলিকতার টান। প্রতিবেদকের বাড়িও বরিশাল শুনে আকর্ণ হাসিতে সরল স্বীকারোক্তি, ‘পাঠাগার খোলার দায়িত্ব আমার। বন্ধও আমিই করি। দেখেশুনে রাখি আরকি।’
টয়লেটের দারোয়ান যদি তদারকির দায়িত্বে থাকেন, তাহলে সেই লাইব্রেরির আর কিছু থাকে—পাঠকদের স্পষ্ট বিরক্তি। যদিও পাঠক আগে থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফুরসত কই তাদের? মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ালেই উল্টে যায় পাতা। প্রযুক্তির সাথে দৌড়াতে গিয়ে লাইব্রেরিমুখী মানুষের সংখ্যা কমেছে হু হু করে। তারসাথে ক্লিনারের কাছে তদারকির দায়িত্ব সঁপে দিলে— যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
আটটি লাইব্রেরি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)। তবে এর মধ্যে সচল শুধু একটিই। আজিমপুরের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ স্মৃতি পাঠাগার। প্রথম দেখায় যে কেউ ভুল করবেন পাবলিক টয়লেট ভেবে। বিশেষ করে বাইরে থেকে। লাইব্রেরির পথটি এমনভাবেই করা। ভবনের নিচতলাজুড়ে থাকা পাবলিক টয়লেটের গেটে গিয়েই জিজ্ঞাসা করতে হয়— লাইব্রেরির পথ কোথায়?
টয়লেটের পাশ ঘেঁষে সিঁড়ি বেয়ে লাইব্রেরির সন্ধান পেতে পেতেই ঘড়ির কাঁটা ১টা পার করে আরও আট পা এগিয়ে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল এক পাঠকে। তার হাতে ছিল মফিজুল ইসলাম মিলনের লেখা ‘অগ্রদূত বাংলা’ বইটি। ফিসফিস করে তাকে লাইব্রেরিয়ানের কথা জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর মিলল, ‘বাইরে আছেন।’ ফিরবেন কি না, জানা নেই ওই পাঠকের।
অনেকদিন পাঠাগারের দিকে সুদৃষ্টি দেওয়া হয়নি। এখন আমরা পর্যায়েক্রমে সবগুলো পাঠাগার চালুর উদ্যোগ নিয়েছি
সেলফ হাতড়ে মিলল সমরেশ মজুমদারের ‘স্বপ্নেই এমন হয়’। সঙ্গে একটি দৈনিক সংবাদপত্র নিয়ে খানিকটা আড়াল করে বসার পরও চোখে পড়ল অনেক কৌতূহলী মুখ। এক নারী পাঠক ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার এমনভাবে দেখছেন, যেন মনে মনে বলছেন— ‘এ আবার কে? আমরা আসি চাকরির পড়া পড়তে... তিনি সমরেশ নিয়ে বসেছেন!’ শেষ পর্যন্ত চোখাচোখি হতেই লজ্জিত ভঙ্গিতে চোখ নামালেন বইয়ের পাতায়।
দ্বিতীয়তলায় আটজন পাঠক ছিলেন গত সোমবার (২০ এপ্রিল)। নারী ও পুরুষ সমান অনুপাতে। আরও এক জায়গায় মারাত্মক মিল। সবার হাতেইচাকরির বই। বাসা ছেড়ে লাইব্রেরিতে পড়ছেন চাকরির পড়া। কারও হাতে ‘শিক্ষক নিবন্ধন অ্যানালাইসিস’; ‘রিসেন্ট জব সল্যুশন’ও ছিল। বই রেখে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলেন একজন। কয়েক চেয়ার পরেই চাকরির পড়া পড়তে পড়তে ঘুমে ঢুলুঢুলু করছিলেন এক পাঠক। ঢুলুঢুলু করতে করতেই টেবিলে হাত ত্রিভুজ আকৃতি করে তারওপর মাথা রাখলেন। পাড়ি দিলেন ঘুমের রাজ্যে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাগ নিয়ে বের হওয়া ওই তরুণ ফিরে এসে ফের তুলে নিলেন বই ।
আড়াইটা পার। তখনো ফেরেননি লাইব্রেরিয়ান। পাঠকের সংখ্যা বেড়ে ১১। এরমধ্যে ঘুমিয়ে পড়া তরুণটি হঠাৎউঠে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া। হাতে তুলে নিলেন রিমোট। কক্ষে অপরিচিত প্রতিবেদককে দেখে নিচ্ছিলেন তির্যকভাবে। দৃষ্টিতে এমন তীক্ষ্ণতা—যেন প্রতিবেদক বড় কোনো অপরাধে অভিযুক্ত।
তৃতীয়তলায় গিয়ে মেলে ৯ পাঠক। চাকরির বই তাদের সামনেও। সেলফে রাখা মোটামুটি সব বইও চাকরির।
ভারি উদাস হয়ে বসেছিলেন সাঈদ আল মামুন। ঢাকা কলেজের ২০২৩ সালের স্নাতকোত্তর। চাকরির ভাবনাই তার ধ্যানজ্ঞান। একসময় মননশীল বই পড়লেও এখন ঠাওর হচ্ছে—সেসব ছিল শুধুই কালক্ষেপণ।
পাঠক আছে, চাকরির হলেও—বই আছে, আছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সব থাকলেওনেই লাইব্রেরিয়ান। ঘড়ির কাঁটা ৫টা ছুঁই ছুঁই। তখনো পর্যন্ত দেখা মেলেনি লাইব্রেরিয়ান মিতু আক্তারের। রাত ৮টার দিকে ফোন করলে বেলা দেড়টা পর্যন্তথাকার কথা আওড়ালেন। অল্প টাকার চাকরি বলে বেশি সময় দেওয়াটা সম্ভব নয় বলেও যুক্ত করেন।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘অনেকদিন পাঠাগারের দিকে সুদৃষ্টি দেওয়া হয়নি। এখন আমরা পর্যায়েক্রমে সবগুলো পাঠাগার চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। সঙ্গে পাঠক বাড়াতে কুইজসহ নানা আয়োজন থাকবে।’
চব্বিশের সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রাণদানকারী মুগ্ধর নামে লাইব্রেরিটি পরিচালনা করে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পাঠকরা সবাই নিবন্ধিত। মাসে ৪০০ টাকা ফি ছাড়াও শুরুর মাসে তাদের গুনতে হয়েছে এক হাজার টাকা এককালীন। ১১০ সদস্য থেকে কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসে আয় করে ৪৪ হাজার টাকা। আর ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছে এককালীন জমা, যা পুরোটাই পায় এই ফাউন্ডেশন। সিটি করপোরেশন শুধু কাগুজে অভিভাবক!

