ওয়াজুদ্দিনের পৃষ্ঠাগুলি

ছবি: আগামীর সময়
বয়স ১১ অব্দি কোনো গল্পের বই পড়িনি। পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে বই হতে পারে, তা ছিল কল্পনার বাইরে। তবে গল্প শুনতাম ওয়াজুদ্দিনের কাছে। তিনি ছিলেন গ্রামের গার্লস স্কুলের পিয়ন। আমরা কয়েকজন তার পেছন পেছন ঘুরতাম।
নদীর কোল ঘেঁষে ছিল স্কুলটা। এ দুইয়ের মাঝখানে একচিলতে রাস্তা। কাঁচা সড়কের মাটিতে দূর্বা ঘাস— ঠিক যেন প্রাকৃতিক কার্পেট। পা ছড়িয়ে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে গল্প বলতেন ওয়াজুদ্দিন। চোখ চলে যেত নদী পার হয়ে ওপারের গাছগুলির মাথার ওপর দিয়ে সুকোমল সুনীল আকাশে।
ঘোর নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম গল্প বলিয়ের মুখের দিকে। পলকহীনভাবে। ইনিয়ে-বিনিয়ে লতিয়ে-লতিয়ে জড়িয়ে-জড়িয়ে গল্প বলতেন। চরের বালুর মতো চিকচিক করত ওয়াজুদ্দিনের চোখ। মুখের বলিরেখা সংকুচিত প্রসারিত হতো। চোয়ালটা কঠিন ছাঁচে ফেলে কুটনি বুড়ির কূটচালের সংলাপ আওড়াতেন। লালপরী, নীলপরী, পাতালপুরী, রাক্ষসনগরীর গল্প। গল্প হতো সুয়োরানী-দুয়োরানীর। আরও কত যে গল্প।
নদীটির নাম শীতলক্ষ্যা। এখন রোগা-পাতলা হয়ে গেলেও সে সময় ছিল পূর্ণ যৌবনে। নদীর পাড় ধরে গল্প শুনতে শুনতে পৌঁছে যেতাম মাঝেরচরের মুখে। স্কুল থেকে কিলোমিটার খানেক দূরে। যেখানে নদী দুই ভাগ হয়ে গেছে। লক্ষ্যার সেই দুরন্ত ফেনিল মুখে ঢেউগুলো বিদায়ী নৃত্য করত। সেখানে গিয়ে শোনাতেন কঙ্কন দাসীর গল্প।
গল্প শেষে দুই ছিলিম তামাক টেনে ছুটতেন ঘণ্টা বাজাতে। ওয়াজুদ্দিনের ঘণ্টা না বাজলে স্যারেরা যে ক্লাস থেকে বের হতে পারতেন না। এমন ক্ষমতা ছিল! কত স্বপ্ন ছিল একদিন মেয়েদের স্কুলের সেই ঘণ্টা বাজাব। ওয়াজুদ্দিন দিতেন না। বলতেন, বড় হও, তখন দিব। আমি ওয়াজুদ্দিনের কাছে কখনো বড় হইনি!
১৯৮৫ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি। কলাবাগান বাসা। ভর্তি হই শহরের স্কুলে। সেবার ঢাকায় বসেছিল সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। রাজীব গান্ধী, মামুন আবদুল গাইয়ুম, জয়াবর্ধনে, জিয়াউল হক এসেছিলেন শহরে। শহর সেজেছিল লাল-নীল বাতিতে। শহর দেখার জন্য বের হয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে নিউ মার্কেটে উপস্থিত। এর আগে কখনো দেখিনি। মুগ্ধতা নিয়ে হাঁটছি। একসময় পৌঁছে যাই নীলক্ষেত। এ বই-সে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হাতে এলো ঠাকুরমার ঝুলি। পড়তে পড়তে দেখি সব আমার চেনা গল্প। ওয়াজুদ্দিন যেসব গল্প করতেন, তার প্রায় সবটাই আছে। গ্রামের সেই উপেক্ষিত মানুষটি কত আধুনিক ছিলেন।
পুরি খাব বলে পকেটে পুরেছিলাম দুই টাকা। সেই টাকা দিয়েই বইটি কিনে ফেললাম। প্রথম বই কেনা। পরম তৃপ্তি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। হেঁটে-ঘেমে একাকার হলেও আমার কোনো ক্লান্তি ছিল না। মন ছিল প্রসন্ন-প্রফুল্ল-পরিচ্ছন্ন। শান্ত কোমল আনন্দ ছিল অনুভবে।
বাসায় ফিরে তো থ! ‘হ্যাঁ, আউট বই পড়বে তুমি!’ তাৎক্ষণিক শাসানো। চলল কড়া শাসনও।
যদিও থামানো যায়নি। লুকিয়ে-চুরিয়ে আড়ালে-আবডালে পড়া চলত। চোখে ভাসে নীলক্ষেতের ছবি। কীভাবে আবার যাওয়া যায়। দিনের বেলা ঘুরতাম সেখানে। এই দোকানে একটু, ওই দোকানে একটু পড়তাম। সাধ্য ছিল না কেনার। আর্থিক দুরবস্থা। পাঁচ ভাইবোন। সবার লেখাপড়ার খরচ চালানো কঠিন ছিল বাবার। টিউশনি বা এটা-সেটা করে কোনোরকমে চলত।
প্রায় প্রতিদিন যাওয়া-আসা করতে দেখে মকবুলের মায়া হলো। তিনি বই ভাড়া দিতেন। আমার কাছ থেকে টাকা নিতেন না। এই আমার পড়ার দরজা খুলে গেল।
বইয়ের পোকা হয়ে গেলাম। রাশিয়ান বই মিলত। রাদুগা প্রকাশনী, প্রগতি প্রকাশনী; মস্কো থেকে আসত। যেমন তার কাগজ, তেমনই অলংকরণ। মুগ্ধ হয়ে পড়তাম আর দেখতাম। লাল প্রচ্ছদের রুশ দেশের উপকথা, কালো প্রচ্ছদের উভচর মানুষ— চোখে ভাসে এখনো। এসব বই পড়েছি নীলক্ষেতের ফুটপাতে বসে দাঁড়িয়ে। জুলভার্নের সাগরতলে বা রহস্যের দ্বীপ পড়ে মুগ্ধতার রেশ ছিল কয়েক সপ্তাহ।
সেবা প্রকাশনীর বইয়ের জন্য বসে থাকতাম। জমা হওয়ার সাথে সাথে পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। কিন্তু টাকা না থাকায় পড়তে পারতাম না। চেয়ে থাকতে হতো কখন ফ্রি পাব। মকবুল দিলে তবেই পড়তাম।
বাসা থেকে কিছু না বললেও তাদের মনোভাব বদলায়নি। আত্মীয়স্বজন এলে তাদের সাথে গল্প হতো আমাকে নিয়ে, ‘লেখাপড়ায় ভালোই ছিল, কিন্তু আউট বই পড়ে গোল্লায় যাচ্ছে!’
ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। এরপর আর সমস্যা হয়নি। বই আর বই। কেন্দ্রের মানুষগুলোও ছিল পড়ুয়া। কাজও ছিল বই নিয়ে। জ্যাক লন্ডনের অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস হোয়াইট ফ্যাং, আরেকজান্ডার দ্যুমার তিন মাস্কেটিয়ার আর নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির ইস্পাত দিয়ে ইংরেজি, ফরাসি আর রুশ সাহিত্য পড়তে লাগলাম। হাসান আজিজুল হকের লেখা সক্রেটিস, মণি বাগচির জীবনী শতকে দিয়ে জীবনী পাঠ চলল মাসের পর মাস। হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন— যা পাই সবই পড়ি। এর মধ্যে কেন্দ্রের সুবাদে অনেক লেখকের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়। তাদের মধ্যে প্লেটোর সংলাপখ্যাত সরদার ফজলুল করিমের শিশুতোষ আচরণ চোখে লেগে আছে।
পরিচয় হয় শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের সাথে— আমার পড়ার জগৎ তিনি পাল্টে দিয়েছেন। আগে রবীন্দ্রনাথে অনীহা ছিল। এখন মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া বাঙালির চিন্তা-জগৎ অচল পুরোপুরি। আমীরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে বসতেন। নিজে পড়তেন, আমাদের শোনাতেন। ২৫ বৈশাখ, ২২ শ্রাবণে আয়োজন করে আমাদের রবীন্দ্রনাথ পড়ে শোনাতেন।
৩০ জুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ থেকে কবিতা পড়ে শোনান আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস। ১৯১২ সালে লন্ডনের ওই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ নিজেও ছিলেন। এ ঘটনা সামনে রেখে বিশ্বের রবীন্দ্রপিপাসুরা কবিতা পাঠ করেন। গভীর আগ্রহে উদযাপন করেন আন্তর্জাতিক রবীন্দ্রকাব্যপাঠ দিবস। ৩০ জুন কোনোদিনই ভোলেন না আমীরুল ইসলাম। সেদিন রবীন্দ্রনাথ পড়বেন-ই পড়বেন। মানুষের মনে শিল্পবোধ উসকে দেওয়ার জন্য আমীরুল ইসলাম অদ্বিতীয়। আমার কিঞ্চিত পাঠাভ্যাসে এই শিশুসাহিত্যিকের বড় অবদান।
ছোটবেলায় বই পড়ার আগেই পড়েছিলাম ‘জীবন্ত বই’ ওয়াজুদ্দিনের পৃষ্ঠাগুলি। মাঝে ছিল বই পড়তে বাধা। তা আজ আর নেই। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোখের দৃষ্টি। কষ্ট হয় পড়তে। তারপরও বই পড়ার নেশা আমার কাটে না।
এমন যদি হয়— পড়ার দৃষ্টি গেছে চলে, তখন কি আর কোনো ওয়াজুদ্দিন গল্প শোনাবে আমায়...

