ছেলের জীবিকা বাঁচাতে মোটরসাইকেল নিয়ে তেলের লাইনে মা

ছবি: আগামীর সময়
সড়কের দুরবস্থা ও গণপরিবহনের সীমিত সুযোগে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হাজারো মানুষ। অনেকে আবার জীবিকা নির্বাহ করেন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে। তবে চলমান জ্বালানি সংকটে তাদের অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন জীবিকা বাঁচাতে। এমন পরিস্থিতিতে এক মায়ের নীরব সংগ্রাম জ্বালানি সংকটের বাস্তব চিত্র হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল)। শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ ডেলমা ফিলিং স্টেশনের সামনে শত শত মোটরসাইকেলের সারি। প্রখর রোদে সেই সারিতে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিথীকা রানী বৈদ্য (৪৫)। তার চাহিদা মাত্র কয়েক লিটার পেট্রল, যা ঘুরিয়ে দিতে পারে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলচালক ছেলে সাগর বৈদ্যের জীবিকার চাকা।
সাগর বৈদ্যের আয়ের ওপর নির্ভর করে তার তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের সংসার। টানা জ্বালানি সংকটে তার আয়ের পথ প্রায় বন্ধ। বাধ্য হয়ে মাঠে দিনমজুরের কাজ করেছেন তিনি। তীব্র দাবদাহে ছেলের এমন কষ্টকর শ্রম মেনে নিতে পারছেন না মা বিথীকা রানী। আর সেই মমতাই তাকে ঠেলে দিয়েছে এক কঠিন অপেক্ষার দিকে।
বুধবার রাত থেকে ছেলের মোটরসাইকেল নিয়ে পেট্রল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বিথীকা রানী। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মুন্সীগঞ্জের ডেলমা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় তার সঙ্গে, তখনো তেল পাননি তিনি।
ক্লান্ত কণ্ঠে বিথীকা রানী বললেন, ‘আমার ছেলে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালায়। তেল না পেয়ে সে এখন কাজ করে মাঠে। এই রোদে মাঠে কাজ করতে ওর অনেক কষ্ট হয়। তাই আমি তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে আছি দু’দিন ধরে। যদি আজ তেল পাই, তাহলে আবার সে মোটরসাইকেল চালাবে।’
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি তেল বিতরণ ঘিরে শ্যামনগরের ডেলমা ফিলিং স্টেশনে ঘটনা ঘটে মারধরের। এতে টানা পাঁচ দিন বন্ধ ছিল তেল সরবরাহ। পরে মুন্সীগঞ্জসহ তিনটি ইউনিয়নে সীমিত পরিসরে তেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা প্রশাসন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নে শুরু হয় তেল সরবরাহ। তবে দুর্ভোগ কমেনি।
অভিযোগ, সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল পাচ্ছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা। এরপর সাধারণ মানুষের জন্য সীমিত তেল বরাদ্দ রাখা হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকেই ভাঙছে নিয়ম। অন্যদিকে তেলের জন্য হাহাকার করছে সাধারণ মানুষ।
মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য দেবাশীষ গায়েন জানান, কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে তেল দেওয়া বন্ধ ছিল। এখন প্রশাসন ও স্থানীয়দের সমন্বয়ে আবার শুরু হয়েছে তেল সরবরাহ। সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে তেল পাবে সবাই।
স্থানীয় সমাজকর্মী শেখ কামরুজ্জামান বলেছেন, ‘উপকূলীয় এ অঞ্চলের অধিকাংশ বেকার জীবিকা নির্বাহ করেন মোটরসাইকেল চালিয়ে। এ সংকটে তারা এখন আরও বেশি অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে।’
‘সরকারের উচিত এ পেশায় নিয়োজিত মানুষকে সহায়তা করা। আয় কমতে থাকলে শুধু তাদের পরিবারই নয়, দুর্গম এলাকার মানুষের জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে’— যোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। দেশে তেলের সংকট নেই, সরকার এমন কথা বললেও মানুষ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ায় বেড়ে গেছে চাহিদা। দিন দিন যানবাহনের ভিড় বেড়েই চলছে ফিলিং স্টেশনে।

