শিল্পায়নে উৎসাহ বাড়াবে কর্মসংস্থান

শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর কর কমানো হচ্ছে আগামী বাজেটে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমে আসবে। এ ছাড়া রপ্তানি বাণিজ্য ও শিল্পায়ন সম্প্রসারণ করতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ (শুল্কমুক্ত) সুবিধার আওতা বাড়ানো হচ্ছে, যা নতুন করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আরও বাড়াতে কয়েকটি নতুন সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– টেক্সটাইল খাতের কিছু পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক, ইলেকট্রিক্যাল কেবল এবং স্যানিটারি সামগ্রী। এ সুবিধার আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ধারিত করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিয়ে শুল্ক ছাড় করাতে পারবে।
এ ছাড়া একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ (সিবিডব্লিউ) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন রপ্তানি পণ্যের বিকাশে সহায়তা দিতেই মূলত এই প্রস্তাব। এতে বন্ড সুবিধার বাইরে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে; বাড়বে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যও। ফলে এসব খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কারণ, এ ব্যবস্থায় একাধিক প্রতিষ্ঠান একই বন্ড সুবিধা ব্যবহার করতে পারে। ফলে আলাদা লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজন হয় না এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কমে আসে।’
বর্তমানে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর শর্ত পূরণ করে নিজস্ব বন্ড লাইসেন্স নিতে হয়। এতে অনেক ছোট ও আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার বাইরে থেকে যায় এবং উচ্চ শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে বাধ্য হয়– যোগ করেন শামস মাহমুদ। তিনি জানিয়েছেন, ভারত, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থা সফলভাবে চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
অন্যদিকে, ভ্যাট নেট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আগামী বাজেটে ‘ফিক্সড ভ্যাট’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। যেসব ব্যবসায়ীর বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার নিচে থাকবে, তারা এ পদ্ধতির আওতায় আসবেন। দোকানের অবস্থান ও লেনদেনের ধরন অনুযায়ী তাদের মাসিক ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হবে। তবে এ শ্রেণির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
দেশ জুড়ে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনতে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় পৌনে ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে তা বাড়িয়ে ২০ লাখ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সারা দেশে ভ্যাট নেট সম্প্রসারিত হবে।
এরই মধ্যে দেশের ৪৬৫টি বণিক সমিতির কাছে সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে এনবিআর। সেই তালিকা ধরেই প্রথম ধাপে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর কাজ শুরু হবে– এমন তথ্য দেন এনবিআর সংশ্লিষ্টরা।
তবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, অতীতে চালু থাকা প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সাময়িক স্বস্তিদায়ক হলেও বাস্তবে এটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। অনেক বড় দোকান ও শোরুমও নিজেদের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেখিয়ে বছরে মাত্র কয়েক হাজার টাকা প্যাকেজ ভ্যাট দিয়ে পার পেয়ে যেত। ফলে প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন করা সহজ হতো এবং রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। এ কারণে ২০১৯ সালে প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য হয় এনবিআর।
ভ্যাট জাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে ব্যাংকে চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) খুলতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার বেশি, তাদের বাধ্যতামূলক ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে এবং প্রতি তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হবে।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সঞ্চয় উৎসাহিত করতে আগামী বাজেটে ব্যাংকে জমা অর্থের ওপর আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এ সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হতে পারে। বর্তমানে কোনো গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে বছরে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকলে আবগারি শুল্ক দিতে হয় না। তবে ৩ লাখ ১ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা হলে ১৫০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হয়।
এদিকে যাত্রীসেবার কথা বিবেচনায় রেখে মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে। টিকিটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলে সরকারের প্রায় ৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতো। তবে যাত্রীদের ভাড়া বৃদ্ধি এড়াতে আগামী অর্থবছরেও মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট না বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিশুখাদ্যকে আরও সাশ্রয়ী করতে আমদানি করা শিশুখাদ্য সামগ্রীর শিল্প কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমতে পারে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, জনসাধারণের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মসলার ওপর বর্তমানে থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে খেজুর আমদানির ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্কও তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব থাকছে আগামী বাজেটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্য তেল, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি ও ভোগ্যপণ্য। এগুলোর ওপর বর্তমানে ৫, ২ ও ১ শতাংশ উৎসে কর আছে, যা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুল্ককর কাঠামো যৌক্তিকীকরণে আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে ২০টি পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে কিছু ভোগ্যপণ্য ও প্রসেসড ফুড, প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং সামগ্রী, প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজ, কিছু শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি যন্ত্রাংশ, আমদানিনির্ভর বিলাসপণ্য এবং কিছু বাণিজ্যিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক, বাইক উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্থানীয়ভাবে ভ্যাট এবং আয়কর ছাড় দেওয়া হবে আগামী বাজেটে।




