ও আলোর পথযাত্রী...

ছবি: আগামীর সময়
আইনস্টাইনের ভুলোমনের কথা কমবেশি সবারই জানা। নিজের টেলিফোন নম্বর তো বটেই, বাড়ির ঠিকানাটি পর্যন্ত লিখে রাখতেন ছোট্ট নোটবুকে। এর পেছনে যুক্তিও ছিল খাঁড়া। কেউ এ বিষয়ে কৌতূহলী হলে বলতেন, ‘নোটবুকে যা লিখে রাখা যায়, অযথা সেটি কেন মাথায় রাখতে যাব?’ তারপরও ভুলে যেতেন নিজের বাড়ির ঠিকানা। একে-ওকে জিজ্ঞাসা করে যখন নিজের বাড়িতে পৌঁছাতেন, দরজা খুলে দেওয়া স্ত্রীকে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করতেন, ‘আপনি যেন কে?’
আইনস্টাইনের এমন কাণ্ডের কথা ভূরি ভূরি। খোদ সেই আইনস্টাইনের একটি জগৎখ্যাত কথা আছে, ‘আপনার কিছু মনে থাকুক আর নাইবা থাকুক; পাবলিক লাইব্রেরিটি কোন দিকে— সেই খোঁজটি অবশ্যই জেনে রাখতে হবে।’ কথাটির অবশ্য একটি দার্শনিক ভিত্তি আছে। পাঠাগারকে বলা হয়, ‘সভ্যতার বাতিঘর’। আর কে না জানে, বাতিঘরহীন জাহাজ উত্তাল সমুদ্রে দিগভ্রান্ত মাছের সমান। আইনস্টাইনের সেই কথার সূত্র ধরেই আজ তুলে ধরছি রাজধানীর তিন প্রান্তের তিনটি পাঠাগারের কথা।
বস্তির ‘বইঘর’
‘কড়াইল’ নামটি শুনলেই প্রথমে মাথায় আসে সেখানকার বস্তির কথা। সেই বস্তির খবর বলতে মাঝেমধ্যে অগ্নিকাণ্ড, দরিদ্র মানুষের আহাজারি ও সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্প। এ ছাড়া আছে প্রদীপের নিচের অন্ধকারের আখ্যান। মাদক, ছিনতাই, আধিপত্য নিয়ে খুনখারাবি। সেই বস্তিতেও শত প্রতিকূলতার মধ্যে হৃতিক রোশনের ‘সুপার থার্টি’ মুভির মতো আলো জ্বেলে আসছে ‘শহীদ রুমী স্মৃতি পাঠাগার’। চলুন ঘুরে আসা যাক সেখানে।
মহাখালী ওয়্যারলেস গেট পেরিয়ে বউবাজার। এর শেষপ্রান্তে কড়াইল নৌঘাটের পাশেই মাঝারি আকারের শ্যাওলা রঙের টিনের অস্থায়ী ঘর। সামনে গেলে দেখা মেলে সাদা সাইনবোর্ডের ওপর লাল রঙে লেখা ‘শহীদ রুমী স্মৃতি পাঠাগার’। ওপরে গোটা গোটা হরফে লেখা স্লোগান— ‘পাঠাগার হোক মানুষ গড়ার হাতিয়ার’। কড়াইল বস্তির শিশু-কিশোররাই এ পাঠাগারের সদস্য। বিকেল ৩টায় খোলা হয় গুমটিঘর। রাত ৮টা পর্যন্ত চলে পাঠচক্র। ভাড়া করা ছোট্ট ঘরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে ক্র্যাক প্লাটুনের শহীদ কমান্ডো শাফী ইমাম রুমীর ছবি। রুমীর পাশেই শহীদজননী জাহানারা ইমামের দীপ্ত মুখ। আছেন বিপ্লবী প্রীতিলতা, মাস্টারদা সূর্য সেন, ক্ষুদিরামও। মাটিতে শতরঞ্জি পেতে বই পড়ছে সেখানকার শিশু-কিশোররা।
পাঠাগারটি গড়ার পরিকল্পনা আসে রাফসানুল এহসান সাজ্জাদের মাথায়। সেটা ২০১৪ সালের ১ অক্টোবরের কথা। তখন তিনি কাজ করতেন ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে। কাজ ছিল দুস্থ পরিবারের শিশুদের স্কুলগামী করা। সেই কাজ করতে করতেই এ পাঠাগারের প্ল্যান। সাতজনকে নিয়ে গড়ে তোলেন এ দুঃসাধ্য কাজ। সবার উদ্যোগে একে একে সংগ্রহ করা হয় বই। এভাবে চলতে চলতে আজ সেখানে কয়েক হাজার বইয়ের ভান্ডার। গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, জীবনী— কী নেই সেখানে? তবে পাঠাগারের স্লোগান যেহেতু ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বানানো, তাই পঠনেই সীমাবদ্ধ নেই তাদের কার্যক্রম। সমাজের মানুষ হিসেবে সামাজিক কাজে প্রতিনিয়ত নিয়োজিত থাকেন পাঠাগারের খুদে সদস্যরা। এই যেমন করোনায় বিপন্ন মানুষের পাশে থাকা থেকে শুরু করে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ, বন্যায় অসহায় মানুষের মাঝে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া থেকে বৃক্ষরোপণ— দেশের নানা সংকটে এক হয়ে ওঠে তারা। এমনকি পাঠাগারটি চলেও বস্তিবাসীর টাকায়। তারাই জ্বালিয়ে রেখেছে এ ক্ষুদ্র ‘শিখা চিরন্তন’।
গ্রামের ‘অপরাজিতা’
ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় পাড়ার বড়ভাইদের কাছ থেকে সেবা প্রকাশনীর বই ধার করে পড়তেন মনিরুল ইসলাম। সেই থেকে বইয়ের প্রেমে পড়া। তখন বাবার কাজের সূত্রে থাকতেন ঢাকার দনিয়া এলাকায়। বাবা মারা গেলে চলে যান গ্রামের বাড়ি বরিশালে। সেখানে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। কিন্তু বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তখনো বুকের বাঁ পাশে স্পন্দিত। ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশেই ঢাকার বিখ্যাত পুরনো বইয়ের আস্তানা নীলক্ষেত। সেখানকার ফুটপাত থেকে সরু গলি পেরিয়ে যখন যা পেয়েছেন, কিনেছেন। বই পড়ার নেশা তখন ভূতের মতো পেয়ে বসে তাকে। এভাবে জমতে থাকে বইয়ের বিশাল কালেকশন। এইচএসসির পর বরিশাল মেডিকেল কলেজ। সেখান থেকে এমবিবিএস করার পর ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত।
নগরীর কোলাহল ছেড়ে ঢাকার অদূরে গ্রামীণ নীরবতা পেতে ডা. মনিরুল ইসলাম চলে যান কেরানীগঞ্জে। সেটা ২০২০ সালের কথা। করোনাকাল। এর মাঝেই ভাড়া নেন দুই কামরার ঘর। নিজের সংগ্রহের বইগুলো হয়ে ওঠে ডা. মনিরুলের সাবলেট। কিন্তু বইয়ের পরিমাণ এতই ছিল যে, সেখানে ঠাঁই মিলছিল না সবার। বছরতিনেক পর কেরানীগঞ্জের আঁটিবাজারের বাহেরচরের তিন রাস্তার মোড়ে ভাড়া নেন একটি দোকানঘর। সেখানেই সযতনে তুলে রাখেন নিজের জমানো রতনগুলো। দোকানের নাম দেন ‘অপরাজিতা পাঠাগার’। একটা সময় পাঠাগার থেকে বিনামূল্যেই পড়া যেত। কিন্তু বিনা পয়সার বিপত্তি অনেক। পাঠের তাগাদাও কম থাকে গ্রাহকদের। তাই এখন বইপ্রতি রাখা হয় ১০ টাকা ভাড়া। শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান-ইতিহাসের বইয়ের পাশাপাশি সেই পাঠাগারে আছে দূরবীন, অণুবীক্ষণ ও দূরবীক্ষণ যন্ত্র। রাতের অন্ধকারে গ্রামের শিশুদের নিয়ে দূর আকাশের তারা দেখা ডা. মনিরুলের আরেক প্রেম।
উত্তাল দিনে ‘বই-যুদ্ধ’
সময়টা ১৯৮৮ সাল। স্বৈরাচারী এরশাদের সামরিক শাসন। সেই শাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল রাজপথ। এদিকে বামপন্থি ছাত্র নেতাকর্মীদের চলছে গোপন বৈঠক। আড়ালে মাথার ওপর মার্কসবাদী চেতনাঋদ্ধ অগ্রজদের আশীর্বাদের হাত। সেসব গুপ্ত দিনে গড়ে ওঠে ‘শহীদ শহীদুল্লা কায়সার স্মৃতি পাঠাগার’। ঠিকানা ২৭২ পূর্ব নাখালপাড়া। এরপর ১৯৮৯ সালের ৩ মার্চ। পুরোদমে যাত্রা শুরু হয় পাঠাগার-আন্দোলন। বদলে যায় নাম। রাখা হয় ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার’। এর দ্বার খোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সঙ্গে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামান বীরউত্তম, প্রখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত। বিভিন্ন সময় আসেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ, কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী জায়া পান্না কায়সার, আনু মুহাম্মদসহ আরও অনেকে।
‘নিষিদ্ধ’ নকশালিস্টদের মতো প্রতিনিয়ত বদলে যেতে থাকে পাঠাগারের আস্তানা। বারবার বাড়ি বদলে নষ্ট হয় বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বই। প্রায় সাড়ে আট হাজার বইয়ের ভান্ডার নিয়ে বর্তমানে পাঠাগারটি থিতু হয়েছে ৪৯১ পশ্চিম নাখালপাড়ায়।
পাঠাগারের ঘর ভাড়া জোটে সাবেক সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের গণচাঁদায়। বর্তমান সদস্যের সংখ্যা নেহাত কম নয়, সাড়ে তিনশ। প্রতিনিধি প্রায় অর্ধশত গ্রাহক দেওয়া-নেওয়া করেন বই। শুধু পাঠেই সীমাবদ্ধ নয় এর কার্যক্রম। ওই যে বললাম, ‘নিষিদ্ধ নকশাল’। তাই অবিশ্রান্তভাবে চলছে বই নিয়ে পাঠচক্র, বিষয় ঘিরে আলোচনা, দেশ-বিদেশের সিনেমা দেখা। এরই পাশাপাশি জাতীয় দিবসে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, সাধারণ জ্ঞান, গল্প-প্রবন্ধ লেখার প্রতিযোগিতা। সদস্যদের নিয়ে হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক এ আন্দোলনের সঙ্গে চলে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ, ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। পাঠাগার থেকে রাজপথে নেমে আসা এসব যোদ্ধাকে তাই শোনাতে চাই সলিল চৌধুরীর সেই জাগানিয়া গান : ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না...।




