মানুষের চিকিৎসার খরচ জুগিয়ে নিঃস্ব ইয়াকুব

এক অসহায়ের হাতে ওষুধ দিচ্ছেন ইয়াকুব আলী। ছবি: আগামীর সময়
তিনি ডাক্তার নন; কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে গ্রামের পর গ্রাম হেঁটে বেড়ান। বাড়ি বাড়ি ঘুরে খোঁজ নেন অসুস্থ-অসহায় মানুষের। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী নিজের বা সংগ্রহ করা টাকায় তাদের কিনে দেন ওষুধ। সত্তরোর্ধ্ব এই ব্যক্তির নাম ইয়াকুব আলী। এলাকার মানুষ তাকে ডাকেন ‘ডাক্তার ইয়াকুব ভাই’ বা ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার সিট-হরিপুর গ্রামের সুক্টিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইয়াকুব আলী এক যুগ ধরে হতদরিদ্র মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষিজীবী মৃত শুকুর আলী মণ্ডল ও মৃত বুদিমন বেওয়ার মেজো ছেলে ইয়াকুব আলী। ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাসের পর অভাবের কারণে পড়াশোনা আর এগোয়নি। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় এক যুগ আগে। শহরের শহীদ ডা. আবুল কাশেম ময়দানের পাশে এক অসহায় রোগীকে চিকিৎসার টাকার অভাবে হাহাকার করতে দেখেন। পাশ দিয়ে অনেক মানুষ হেঁটে গেলেও ফিরে তাকাননি কেউ। ইয়াকুব আলী নিজ খরচে ওই রোগীকে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান এবং চিকিৎসার সব খরচ মেটান। আত্মতৃপ্তি আর সেই মানুষটির কৃতজ্ঞতা তাকে মানবসেবার পথে টেনে আনে।
এরপর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ইয়াকুব আলীর গন্তব্য রোগীদের বাড়ি। রোগীর অবস্থা বুঝে কখনো তাদের নিয়ে যান স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের কাছে, কখনোবা সরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র দেখে ওষুধ কিনে পৌঁছে দেন রোগীদের বাড়িতে। সদর উপজেলাসহ আশপাশের ২০-২৫টি গ্রামে তার এই মানবিক পদচারণা।
তবে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে আজ নিজেই নিঃস্বপ্রায় ইয়াকুব। মানুষের ওষুধ কিনতে গিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিও। সংসারের প্রয়োজনে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে প্রায় এক মাস জেলও খেটেছেন। কয়েক বছর আগে হারিয়েছেন স্ত্রীকে। নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগলেও টাকার অভাবে অনেক সময় নিজের ওষুধই কিনতে পারেন না ইয়াকুব আলী। তার তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলে চাকরি করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। এখন ছেলেদের দেওয়া টাকা এবং সমাজের কিছু বিত্তবান ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় চলছে তার এই মানবসেবা।
সদর উপজেলার সিট-হরিপুর গ্রামের আমেনা বেগম বললেন, ‘ইয়াকুব ভাই যেভাবে আমাদের মতো গরিব মানুষের বাড়িতে এসে বিনামূল্যে ওষুধ দিয়ে যান, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমাদের কাছে তিনিই সবচেয়ে বড় ডাক্তার।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য শামসুল আলমের কথা, ‘ইয়াকুব আলীর মতো নিঃস্বার্থ সমাজসেবক আজকালকার দিনে মেলা ভার। মানুষের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ও ওষুধ কিনতে গিয়ে তিনি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আড়াই বিঘার মতো জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে আজ তিনি নিজেই নিঃস্ব।’
ইয়াকুব আলীর ছেলে তৌহিদ হাসান বললেন, বাবা মানুষের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। একসময় ঋণের দায়ে জেলও খেটেছেন। সন্তান হিসেবে অনেক সময় কষ্ট হতো। কিন্তু বাবার এই ত্যাগ আর মানুষের ভালোবাসা দেখে এখন আমাদের বুক গর্বে ভরে যায়। বর্তমানে দুই ভাই চাকরি করে যতটুকু পারি বাবাকে টাকা দিই। আমরাও চাই এই আনন্দের মধ্যেই বেঁচে থাকুন বাবা।
জীবনে নিজের প্রাপ্তি নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই ইয়াকুব আলীর। বললেন, ‘যত দিন বেঁচে থাকব, এ কাজ করে যাব। মানবসেবা করে আমি আনন্দ পাই। দরিদ্র মানুষের দোয়াই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’




