বিশ্বকাপ
কেপ ভার্দের নায়ক ৪০ বছরের ‘দাদু’

স্পেনের বিপক্ষে ৭টি সেভ করে কেপ ভার্দের নায়ক ভোজিনহা। ছবি: সংগৃহীত
আধুনিক ফুটবল তার সময়ের একটা বড় অংশ ব্যয় করে কিশোর প্রতিভাদের খোঁজে। প্রতি মৌসুমেই একজন নতুন ১৬ বছর বয়সী বিস্ময়বালক উঠে আসে, ১৭ বছরের কোনো প্রতিভা দেখা দেয়-গাড়ি চালানোর বয়স হওয়ার আগেই যে খেলার মোড় বদলে দিতে তৈরি। ক্লাবগুলো তরুণদের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। সমর্থকেরা মেতে থাকেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে।
পুরো ফুটবল দুনিয়াটাই যেন আগামীকে আজকের আগেই খুঁজে পাওয়ার এক অদ্ভুত নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। আর ঠিক তখনই এক বিশ্বকাপ এসে হাজির হলো, যেখানে টুর্নামেন্টের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় তারকা হলেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা, যার ডাকনাম ‘দাদু’।
স্পেন অবশ্য কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে মাঠ ছেড়েছে একরাশ হতাশা নিয়ে, যা ছিল এই টুর্নামেন্টের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অঘটন। খেলা শেষে ভোজিনহা কেঁদে ফেলেছিলেন; সতীর্থরা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল, আর উদযাপনে মেতে উঠেছিল আস্ত একটি দ্বীপরাষ্ট্রসহ অন্য কিছু বড় দেশও। ৯০ মিনিট ধরে, ঠেকানোর মতো যা কিছু ছিল তার সবই তিনি রুখে দিয়েছেন। আর সম্ভবত, সেই সঙ্গে তিনি ফুটবলের হারিয়ে যাওয়া একটি ধারণাকেও রক্ষা করেছেন, সময় সবসময় প্রতিপক্ষ নয়।
ইয়ামালের বয়স ১৮ বছর ৩৪২ দিন, আর ভোজিনহার ৪০ বছর ২২ দিন। দুজনের বয়সের পার্থক্য ২১ বছর ৪৫ দিন,বিশ্বকাপ ইতিহাসে একই ম্যাচে মুখোমুখি হওয়া দুই প্রতিপক্ষ ফুটবলারের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। ইয়ামালের বাবার চেয়েও দুই বছরের বড় তিনি।
ম্যাচে তার সেভ ৭টি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে ৪০ বা তার বেশি বয়সী কোনো গোলরক্ষক এক ম্যাচে তার চেয়ে বেশি সেভ করেছেন মাত্র একজন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নিজের ৪১তম জন্মদিনে ব্রাজিলের বিপক্ষে উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিংবদন্তি প্যাট জেনিংস করেছিলেন ১০টি সেভ।
ম্যাচে ভোজিনহার। ৪২টি পাসের ২৯টিই পৌঁছেছে সতীর্থদের কাছে। লং বলের সাফল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ।
তার আসল নাম জোসিমার দিয়াস। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে বিশ্বকে বুঁদ করে রাখা বোটাফোগোর ফুল-ব্যাক ‘জোসিমার’-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার এই নামকরণ করা হয়েছিল। তবে ডাকনামটি এসেছিল অন্য এক সূত্রে। তিনি বড় হয়েছেন তার দাদা-দাদীর কাছে। তাদের এতই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে, একসময় সবাই তাকে ‘ভোজিনহা’ বা ‘ ছোট দাদু’ বলে ডাকতে শুরু করে।
ব্যাপারটার মধ্যে দারুণ একটা সৌন্দর্য আছে। যেখানে বিশ্বকাপের মঞ্চে এত এত খেলোয়াড় নিজেদের নিখুঁতভাবে তৈরি করা ব্র্যান্ড, স্লোগান আর মার্কেটিং কৌশল নিয়ে হাজির হন, সেখানে কেপ ভার্দের এই রূপকথার নায়ক মাঠে নেমেছিলেন স্রেফ শৈশবের এক মজার ডাকনাম সঙ্গী করে।
আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে ঘেরা কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জের মতোই, এই গল্পটাও ঘিরে আছে বিস্ময় নিয়ে।
‘ভোজিনহা’ নামটা শুনলে কোনো বিশ্বশক্তিকে রুখে দেওয়ার মতো গোলরক্ষকের কথা মাথায় আসে না। এটি কোনো বিশ্বকাপ তারকার নাম হতে পারে না। এমনকি একজন পেশাদার অ্যাথলেটের নাম হিসেবেও এটি বড্ড বেমানান। এটি এমন এক মানুষের ডাকনাম, যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তার আত্মীয়স্বজনরা গভীর স্নেহে ‘দাদু’ বলে ডেকে যান।
এই মানুষটিই রুখে দিলেন এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ও প্রতিভাবান আক্রমণভাগকে। স্পেন মাঠে নেমেছিল আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সব হাতিয়ার নিয়ে। যেখানে ছিল তারুণ্য, গতি আর নতুনত্ব। যে দেশ লামিন ইয়ামালকে বিশ্বের সামনে এনেছে এবং যারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই প্রতিভার এক অফুরন্ত খনি আবিষ্কার করে চলেছে। অন্যদিকে, কেপ ভার্দে মাঠে নেমেছিল এমন এক অভিজ্ঞ গোলরক্ষককে নিয়ে, এই টুর্নামেন্টে আসার আগে যার কোনো ক্লাবই ছিল না। এটি ছিল যেন দুটি ভিন্ন দর্শনের লড়াই। ভবিষ্যতের বিপক্ষে সময়, প্রতিশ্রুতির বিপক্ষে স্থায়িত্ব, ১৭ বছরের চপলতার বিপক্ষে ৪০ বছরের পরিপক্বতা। আর, সেই ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে ঘড়িই জিতে গেল।
ফুটবল জীবনের এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে ৪০ বছর বয়সী কাউকে ‘টিকে থাকা এক জীবন্ত জীবাশ্ম’ হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন ৪০ বছর বয়সী ডাক্তার তখন তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থাকেন। একজন ৪০ বছর বয়সী শিক্ষকের সামনে পড়ে থাকে আরও কয়েক দশক। ৪০ বছর বয়সী একজন সাংবাদিক প্রায়শই আগের চেয়েও বেশি দায়িত্ব পান। কিন্তু এই বয়সের একজন ফুটবলারকে উপস্থাপন করা হয় এক পরিসংখ্যানগত বিস্ময় বা কোনো জাদুঘরের প্রাচীন সামগ্রীর মতো। ঠিক এই কারণেই ভোজিনহা এত দ্রুত সবার সহানুভূতি ও ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছেন। যে খেলা তারুণ্যকে এক মলাটবদ্ধ নেশায় পরিণত করেছে, সেখানে তিনি এসে মনে করিয়ে দিলেন যে-অভিজ্ঞতাও এক ধরনের প্রতিভা হতে পারে।
বিশ্বকাপে যখন কোনো ছোট দল এমন চমকপ্রদ জয় বা ড্র ছিনিয়ে নেয়, তখন কোনো টেলিভিশন চ্যানেলই সেই আবেগের পুরোটা ধারণ করতে পারে না। এটি হাইলাইটসে আসে না, পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, আর ম্যাচ রিপোর্টেও এর জায়গা হয় না। সেটি হলো-অসম্ভাব্যতা পার করে আসার সেই ভারী অনুভূতি। সেখানে পৌঁছানোর জন্য পাড়ি দেওয়া দীর্ঘ পথ।
কেপ ভার্দের জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি।
এই বিশ্বকাপের আয়োজক অনেক শহরের চেয়েও এটি আকারে ছোট। কয়েক দশক ধরে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ফুটবল ম্যাচ জেতা ছিল না, বরং মহাসাগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপগুলোর ওপর একটা আস্ত দেশ গড়ে তোলাই ছিল মূল লড়াই। এমন এক দেশ, যার সীমানার ভেতরের চেয়ে বাইরের দেশগুলোতেই বেশি কেপ ভার্দেনিয়ান বসবাস করেন। আর সেই দেশটিই আজ এখানে এসে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফুটবল সবসময় আমাদের বিশ্বাস করাতে ভালোবাসে যে, সবকিছু কেবল তরুণদেরই প্রাপ্য। পরবর্তী দুর্দান্ত গল্পটি সবসময় সামনেই অপেক্ষা করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটাই, যা এখনো ঘটেনি। কিন্তু এই সোমবার, বিশ্বকাপের সেরা গল্পটি ছিল একদম আলাদা।
এটি ছিল জোসিমার নামের এক মানুষের গল্প, চার দশক আগের এক বিশ্বকাপ তারকার নামে যার নামকরণ করা হয়েছিল; যাকে পৃথিবী আজ ‘ভোজিনহা’ ( দাদু) নামে চেনে, যিনি ৪০ বছর বয়সে এসেও এমন এক অসম্ভব স্বপ্ন তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যা ভাবাই যায় না।
সম্ভবত এটি আমাদের জন্য একটি সময়োপযোগী বার্তা- সব ভবিষ্যৎ সময়ের আগে এসে হাজির হয় না। কখনো কখনো তা চল্লিশ পার হওয়ার পর আসে।
বছরের পর বছর ধরে ফুটবল শুধু পরবর্তী বিস্ময়বালকের খোঁজ করে গেছে। কিন্তু অন্তত আজকের দিনটির জন্য, বিদায়ী প্রজন্মই সব আলো কেড়ে নিল।




