যুক্তরাষ্ট্রের নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের নিয়ে উদ্ভট জল্পনা, ক্ষুব্ধ স্বজনরা

প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল গ্রিলমায়ারের হত্যাকাণ্ড অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উসকে দেওয়া কয়েকটি ঘটনার মধ্যে একটি।
আমেরিকার অত্যন্ত গোপন আর গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণার সাথে যুক্ত অন্তত ১০ জন বিজ্ঞানীর নিখোঁজ বা মৃত্যু নিয়ে এখন উত্তাল নেট দুনিয়া। অনলাইনে গোয়েন্দাগিরি করা একদল মানুষ দাবি করছেন, এর পেছনে বিশাল কোনো ষড়যন্ত্র লুকানো আছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই পর্যন্ত এখন মাঠে নেমেছে। তবে যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের মতে এসব মনগড়া গল্প কেবলই ‘ঘৃণ্য’ জল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল গ্রিলমেয়ার গত ফেব্রুয়ারিতে নিজের বাড়িতেই খুনের শিকার হন। তার স্ত্রী লুইস গ্রিলমেয়ার বলেন, তার স্বামী এসব আজগুবি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুনলে রীতিমতো হাসতেন। লুইসের মতে, কার্লকে হত্যার পেছনে কোনো গোপন বৈজ্ঞানিক রহস্য নেই। বরং এক প্রতিবেশী ভুল বুঝে প্রতিশোধ নিতে তাকে গুলি করেছে। ঘাতক ফ্রেডি স্নাইডারকে পুলিশ ধরেছে এবং তার বিচারও চলছে।
জল্পনাকারীরা এই ১০ জনকে এক পাল্লায় মাপলেও তাদের পেশা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এই তালিকায় যেমন বড় বিজ্ঞানী আছেন, তেমনি আছেন একজন প্রশাসনিক সহকারী, একজন প্রকৌশলী, এমনকি একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীও। কেউ মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করতেন, আবার কেউ ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করতেন। তাদের সবার মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়াকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করছেন একদল শৌখিন গোয়েন্দা।
কার্ল গ্রিলমেয়ারের খুনের পেছনে কোনো মহাকাশ রহস্য ছিল না। কয়েক মাস আগে এক ব্যক্তি রাইফেল নিয়ে তাদের জমিতে ঢুকেছিল। কার্ল তাকে পাহাড়ের দিকে চলে যেতে বলেছিলেন। অন্য এক প্রতিবেশী পুলিশে খবর দিলে ঘাতক লোকটা ভেবেছিল কার্লই হয়তো পুলিশ ডেকেছেন। সেই ক্ষোভ থেকেই লোকটা পরে এসে কার্লকে খুন করে। অর্থাৎ এটি ছিল স্রেফ এক ভুল বোঝাবুঝির করুণ পরিণতি।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে গবেষক মিক ওয়েস্ট বলেন, আমেরিকায় প্রায় ৭ লাখ মানুষ গোপনীয় সব বৈজ্ঞানিক কাজে যুক্ত আছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২২ মাসে এদের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু বা ৭০ জন খুন হওয়ার কথা। সেই হিসেবে ১০ জনের ঘটনা কোনো অস্বাভাবিক প্যাটার্ন নয়। অর্থাৎ মৃত্যুগুলো সত্যি হলেও এর পেছনে কোনো অদৃশ্য যোগসূত্র নেই।
নিখোঁজ অন্য ব্যক্তিদের পরিবারও জানিয়েছে যে, তাদের প্রিয়জনরা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে হয়তো নিজেরাই দূরে চলে গেছেন। যেমন লস আলামোস ল্যাবের প্রশাসনিক সহকারী মেলিসা ক্যাসিয়াসের পরিবার বলছে, তিনি হয়তো কোথাও আত্মগোপন করে আছেন। অন্য এক বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তিনি তার বাবা-মায়ের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং পরে জলাশয়ে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
সব ঘটনার পেছনেই পুলিশ বা পরিবার কোনো না কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু অনলাইন দুনিয়ার গুজব থামছে না। লুইস গ্রিলমেয়ার আক্ষেপ করে জানান, যারা এই জল্পনা ছড়াচ্ছে তারা মৃত ব্যক্তিদের সম্মানের হানি করছে। অনেক পরিবার তো যন্ত্রণায় মিডিয়ার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে।
সব শেষে, লুইস চান মানুষ যেন তার স্বামীকে কেবল বিজ্ঞানী হিসেবে নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখে। কার্ল গ্রিলমেয়ার ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজের ছোট বিমান নিয়ে আকাশে উড়তে ভালোবাসতেন এবং বিনা পয়সায় অন্যদেরও ওড়াতেন। এমনকি বড় বড় গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লেও তিনি কখনো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করতেন না। তার সহজ-সরল আর আদর্শবান জীবনটাই ছিল তার সবথেকে বড় পরিচয়।

