মেদবহুল পেট? আসল কারণ কী

সংগৃহীত ছবি
আমাদের চারপাশের অনেক নারীই একটা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যান। তারা নিয়ম মেনে খাচ্ছেন, সারাদিন হাঁটাচলা বা কাজও করছেন, কিন্তু পেটের চর্বি কিছুতেই কমছে না। শরীরের অন্য জায়গা শুকিয়ে গেলেও মেদটা যেন শুধু পেটে গিয়েই জমা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জেদি ভুঁড়ির পেছনে আপনার অলসতা নয়, বরং শরীরের ভেতরের হরমোনের কারসাজি দায়ী। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. অঞ্জু ঘেই। তার মতে, আধুনিক জীবনযাপনের কারণে আমাদের হরমোনগুলো উল্টাপাল্টা আচরণ করছে, আর তার ফল ভোগ করছে আমাদের পেট।
পেটে জমে থাকা এই চর্বি বা ‘ভিসারাল ফ্যাট’ আপনার শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ঘিরে রাখে। সামান্য চর্বি দরকার হলেও, যখন এটি সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটি শরীরের ভেতরে বিষ ছড়াতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কোমরের মাপ প্রতি ৪ ইঞ্চি বাড়লে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১১ শতাংশ বেড়ে যায়। এ ছাড়া ডায়াবেটিস আর হার্টের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে কয়েক গুণ।
নারীদের জীবনচক্র হরমোনের জোয়ার-ভাটায় ভরা। মাসিকচক্র, পিসিওএস, মা হওয়ার সময়কাল বা মেনোপজ এসব সময়ে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আর এই হরমোনগুলোই ঠিক করে দেয় শরীরের চর্বি কোথায় গিয়ে জমা হবে। হরমোন যদি বিগড়ে যায়, তবে আপনি যতই কম খান না কেন, মেদ ঠিকই পেটে গিয়ে বাসা বাঁধবে।
আমাদের শরীরের ৫টি হরমোন এই মেদ জমানোর জন্য দায়ী:
ইনসুলিন
চিনি বা ময়দার তৈরি খাবার বারবার খেলে রক্তে ইনসুলিন বেড়ে যায়। এটি শরীরকে চর্বি পোড়াতে বাধা দেয়।
কর্টিসল
মানসিক চাপ বাড়লে এই হরমোনটা বেড়ে যায়। এটি শরীরকে সংকেত দেয় পেটে মেদ জমিয়ে রাখতে।
থাইরয়েড
এই হরমোন ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরের চর্বি পোড়ানোর কলকব্জা ঢিলে হয়ে যায়।
লেপটিন
পেট ভরে গেলে এই হরমোন মস্তিষ্ককে খাওয়ার ‘স্টপ’ সিগন্যাল দেয়। হরমোন বিগড়ে গেলে মস্তিষ্ক সেই সংকেত পায় না, ফলে আমরা বেশি খেয়ে ফেলি।
ইস্ট্রোজেন
বয়সের সঙ্গে এই হরমোন কমতে শুরু করলে শরীরের চর্বি উরু বা কোমরের নিচ থেকে সরে এসে সরাসরি পেটে জমা হয়।
আসলে আমাদের অনিয়মিত জীবনযাপনের হরমোন বিগড়ে দিচ্ছে। সারাদিন মানসিক চাপ, রাতে ঠিকমতো না ঘুমানো, বারবার মুখরোচক ভাজাপোড়া খাওয়া আর সারাক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করা এসব কারণেই শরীরে হরমোনের ব্যালেন্স নষ্ট হচ্ছে। ঘুমের অভাব আমাদের ক্ষুধার সিগন্যাল বাড়িয়ে দেয়, আর অলসভাবে বসে থাকা পেশীর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে চর্বি ক্ষয়ের বদলে জমতে থাকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আপনার পেটের মেদ আসলেই হরমোনজনিত কি না তা বুঝবেন কীভাবে? এক্ষেত্রে কয়েকটা লক্ষণ দেখলে সহজেই বুজতে পারবেন আসল কারণ:
* আপনার হাত-পা বেশ রোগা বা পাতলা, কিন্তু মেদ শুধু পেটে।
* ব্যায়াম বা ডায়েট করেও ওজন এক ইঞ্চিও কমছে না।
* সারাক্ষণ মিষ্টি জাতীয় খাবার বা চা-কফি খাওয়ার নেশা জাগে।
* সবসময় ক্লান্ত লাগে, ঠিকমতো ঘুম হয় না এবং খিটখিটে মেজাজ থাকে।
* প্রায়ই পেট ফুলে থাকা বা গ্যাস হওয়ার সমস্যায় ভোগেন।
অনেকেই বলেন ‘কম খান আর বেশি করে ঘাম ঝরান’। কিন্তু হরমোন যদি ঠিক না থাকে, তবে না খেয়ে থাকা বা জানপ্রাণ দিয়ে ব্যায়াম করা হিতে বিপরীত হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যায়াম শরীরে স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা মেদ কমানোর বদলে উল্টো বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই হরমোনের পরিবেশ ঠিক করাটা আগে জরুরি।
একটা সুস্থ লাইফস্টাইল পারে আপনার হরমোনকে হাতের মুঠোয় আনতে। সেক্ষেত্রে মানতে হবে কিছু নিয়ম:
সুষম খাবার: শুধু ডায়েট নয়, খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার রাখুন।
পেশী শক্ত করুন: শুধু হাঁটলে হবে না, হালকা ওজন নিয়ে ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করলে শরীরের মেটাবলিজম বাড়ে।
মানসিক শান্তি: মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান করুন বা নিজের শখের কাজ করুন। এতে কর্টিসল হরমোন নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
পর্যাপ্ত ঘুম: অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা শান্তির ঘুম হরমোন ঠিক রাখার সবথেকে বড় ওষুধ।
ডাক্তারি পরীক্ষা: খুব চেষ্টা করেও মেদ না কমলে থাইরয়েড বা পিসিওএস আছে কি না পরীক্ষা করিয়ে নিন। প্রয়োজনে আধুনিক ও নিরাপদ ট্রিটমেন্টের সহায়তা নিতে পারেন।
পরিশেষে মনে রাখবেন, পেটের মেদ জমার জন্য নিজেকে সারাক্ষণ দোষ দেবেন না। এটি আপনার লাইফস্টাইলের সঙ্গে হরমোনের যুদ্ধের ফল। সমাধান হলো হরমোনকে আপনার বন্ধু বানানো, শত্রু নয়। শরীরকে ভালোবাসা শুরু করুন, দেখবেন শরীর আপনার কথা শুনছে!

