যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে ইউরোপ

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি ছাড়া ইউরোপের রূপ কেমন হবে? ইউরোপীয়দের এখন থেকেই এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর আটলান্টিক জোট বা ন্যাটো শেষ করতে চান। তিনি সেই পথেই এগোচ্ছেন। এখন শুধু দেখার বিষয়— তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটো থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেবেন, নাকি শুধুই অবজ্ঞা আর অবহেলা দিয়ে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেবেন।
যাই হোক না কেন, এই জোটের ভাঙন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ন্যাটোর মতো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ব্যবস্থা সাধারণত একদিনে বা একটি মাত্র পদক্ষেপে ভেঙে পড়ে না। বরং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বা বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর যে মূল অঙ্গীকার, সেই বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হলে তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তই ইউরোপে একটি 'অখণ্ড ইউনিয়ন' গড়ার পরিবেশ তৈরি করেছিল। মহাদেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির কারণেই জার্মানির পুনর্মিলন এবং ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছিল
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ঠিক সেটিই ঘটছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তার চাপিয়ে দেওয়া বিপর্যয়কর যুদ্ধে ইউরোপীয়রা যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় এই দূরত্ব বেড়েছে আরও। এদিকে রিপাবলিকান পার্টি নিজেদের মার্কিন প্রতিরক্ষার শক্তিশালী রক্ষক দাবি করলেও, দলের কোনো বড় নেতা ট্রাম্পের করা এই অপূরণীয় ক্ষতির বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি।
স্নায়ুযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল এক চূড়ান্ত নির্ধারক শক্তি। দেশটির ছত্রচ্ছায়ই সেই শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়েছিল, যা অর্থনৈতিক সংহতি এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প এবং তার ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (মাগা)’ আন্দোলনের কাছে মূল্য নেই এই ইতিহাসের। এক ধরনের অসংলগ্ন কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি গভীর বিদ্বেষ পোষণ করেন তারা। ইউরোপকে সেই আত্মঘাতী জাতীয়তাবাদের যুগে ফিরিয়ে নিতে যেন বদ্ধপরিকর।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় রঙ্গমঞ্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ই হিটলারের উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল
এটি একটি বিপজ্জনক ও ভুল লক্ষ্য। কারণ এতে সফল হলে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন নিজেই অনেক বেশি দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এমন যুক্তির কোনো মূল্য নেই। হাঙ্গেরিতে অনুগত মিত্র ভিক্টর অরবানের নির্বাচনী পরাজয়ের পর ইউরোপীয়দের নিজেদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে চাইবেন ট্রাম্প।
গত আট দশকের মধ্যে এই প্রথম ইউরোপ নিজেকে সম্পূর্ণ একা দেখতে পাবে। ইউরোপীয়দের এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে। নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। এটি শুনতে খুব সাধারণ কথা মনে হতে পারে, যদি না ইউরোপের রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা আমরা মাথায় রাখি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় রঙ্গমঞ্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ই হিটলারের উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল। যদি সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলো আন্তঃযুদ্ধের সময়গুলোতে থাকত, তবে জার্মানির সেই প্রতিশোধপরায়ণ চরমপন্থা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো।
ইউরোপের নেতৃত্ব কে দেবে— এই প্রশ্নে জার্মানি ও ফ্রান্সের কোনো বিকল্প নেই। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী এই দুই দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রজন্ম যুদ্ধ থেকে এই শিক্ষাই নিয়েছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তা প্রয়োগ করেছিল। ইউরোপে শক্তিশালী মার্কিন উপস্থিতি বজায় রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান। এর উদ্দেশ্য শুধু বার্লিনে দাঁড়িয়ে থাকা স্টালিনের লাল ফৌজের হুমকি মোকাবিলা করাই ছিল না, বরং জার্মানির প্রতিশোধপরায়ণতা নিয়ে ইউরোপীয়দের ভয় দূর করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য।
ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তই ইউরোপে একটি 'অখণ্ড ইউনিয়ন' গড়ার পরিবেশ তৈরি করেছিল। মহাদেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির কারণেই জার্মানির পুনর্মিলন এবং ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া আজকের ইউরোপ কখনোই এভাবে গড়ে উঠত না।
তাহলে ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্রহীন ভবিষ্যৎ কী বয়ে আনবে? ওয়াশিংটন ছাড়া ইউরোপ কি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ঐক্য বজায় রাখতে পারবে? একসময় এই মহাদেশে একক আধিপত্য বিস্তার করা পরাশক্তি জার্মানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় অনেক কঠিন প্রশ্ন রেখেছে।
জার্মানির বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি ফ্রান্স ও অন্যদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই নতুন ভূমিকা পালন করতে পারবে? কট্টর ডানপন্থি দল 'অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড'-এর উত্থান প্রমাণ করে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এই পথ পরিবর্তনের সুযোগের জানালা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যে অভিভাবকত্ব ছিল, ট্রাম্পের অধীনে তার অবসান ঘটেছে। এটি আর ফিরে আসবে না। ইউরোপকে এখন নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে হবে
ইউরোপের নেতৃত্ব কে দেবে— এই প্রশ্নে জার্মানি ও ফ্রান্সের কোনো বিকল্প নেই। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী এই দুই দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। ইউরোপীয়রা আর শুধু ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের আশায় বসে থাকতে পারে না।
অবাক লাগে এই ভেবে যে, মার্কিনিরা কি বুঝতে পারছে তারা নিজেদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কূটনৈতিক সাফল্যকেই ধ্বংস করছে? সেই সঙ্গে তারা মার্কিন শক্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তিকেও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। কোনো কৌশলগত অংশীদার ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজের মতো চলবে আর তার কোনো মাশুল দিতে হবে না— এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
দুর্ভাগ্যবশত, এই পথ পরিবর্তনের সুযোগের জানালা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যে অভিভাবকত্ব ছিল, ট্রাম্পের অধীনে তার অবসান ঘটেছে। এটি আর ফিরে আসবে না। ইউরোপকে এখন নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে হবে। যখনই এই ‘মাগা’ জ্বর ছাড়বে তখন আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের সম্পর্ক তথা পশ্চিমা বিশ্বের ধারণাকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। এত অনিশ্চয়তার মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট— নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র আলাদা থাকার চেয়ে একসঙ্গেই বেশি শক্তিশালী।
লেখক : জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস চ্যান্সেলর

