সমর্থন চায় ৫৩ দেশের
- এলডিসি উত্তরণ পেছাতে তোড়জোড় বাংলাদেশের

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময়ও চাওয়া হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এত সহজেই যে হয়ে যাচ্ছে, তেমনটি নয়। এজন্য নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। উত্তরণ পেছানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল (ইকোসক)। এতে সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর মতামত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। তাই সমর্থন পেতে সদস্যভুক্ত ৫৩ দেশের দ্বারস্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এ প্রসঙ্গে ইআরডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, সময় পেছানোর বিষয়টি খুব সহজেই যে হয়ে যাবে, সেটি ভাবা যায় না। কেননা, এটি নির্ভর করছে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর। আমরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকেও অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে। দেখা যাক কী হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প কিছু নেই।
জানতে চাইলে ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি যাতে উত্তরণের সময় পেছানো যায়। এ বিষয়ে সব দিক থেকেই প্রচেষ্টা অব্যাহত। যদি ইকোসকের সদস্যদেশগুলোর সমর্থন পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা শুরু হয়েছে, তার ভালো জবাব দিতে পারবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আমরা তো আশাবাদী উত্তরণ সময় পেছাবে জাতিসংঘ। এখন দেখা যাক কী হয়।
ইআরডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ পেছানো সত্যিই জরুরি কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেছে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল ও ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর উচ্চপ্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস)। এ ছাড়া গত ২৯ এপ্রিল ইআরডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে সংস্থাটি। এভাবে চলছে একের পর এক বৈঠক।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের ইউএন-ওএইচআরএলএলএস সম্প্রতি একটি ‘ইনডিপেনডেন্ট গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালনা করেছে। এর প্রধান প্রধান দিকগুলো সংশ্লিষ্ট সবার সামনে উপস্থাপনের জন্য এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ যে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর আবেদন করেছে, সেটি নিয়ে কাজ করছে জাতিসংঘের এ কমিটি। তারা চূড়ান্ত সুপারিশ করবে ওপরের দিকে। এর আগে তাদের অ্যাসেসমেন্টে উঠে আসা বিষয়গুলো নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬-এর পরিবর্তে ২০২৯ সালে নির্ধারণের আবেদন করেছে। আবেদনে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
আবেদনে আরও বলা হয়, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রগতি হলেও একের পর এক সংকটের কারণে সেগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়কাল একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে।
দেশি সংকটের মধ্যে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া ইত্যাদি। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে, কভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও এর প্রভাবে জ্বালানি এবং খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম জাহাঙ্গীর আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, আগামী জুন মাসে ইকোসকের বৈঠক হতে পারে। তার আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) একটি স্বাধীন প্রতিবেদন তৈরি করবে। সে কাজটি তারা করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, যেসব দেশের দ্বারস্থ হচ্ছে বাংলাদেশ সেগুলোর মধ্যে আফ্রিকার ১৪টি দেশ, এশিয়ার ১১টি, ইন্টার্ন ইউরোপের ছয়টি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ১০টি এবং ওয়েস্টার্ন ইউরোপের রয়েছে ১৩টি দেশ।
বাংলাদেশ যেসব দেশে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে, সেগুলো হলো— আলজেরিয়া, আর্মেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, আজারবাইজান, বুরুন্ডি, কানাডা, শাদ, আইভরি কোস্ট, কেনিয়া, মৌরিতানিয়া, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, সিয়েরালিওন, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া ও জাম্বিয়া। এ ছাড়া চীন, ভারত, জাপান, লেবানন, নেপাল, পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। আরও আছে রাশিয়া, ইউক্রেন, রাশিয়ান ফেডারেশন, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ইউকে ও ইউএসএ।
সূত্র জানায়, এলডিসি উত্তরণ পেছানোর দাবি ছিল ব্যবসায়ীদের। অন্তর্বর্তী সরকার এ পেছানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। কেননা তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক সরকার এসে সিদ্ধান্ত নেবে। বিএনপি সরকার গঠনের পর এই দাবি আরও জোরালো হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জাতিসংঘের কাছে আবেদন করে।






